এদিকে হারা এসে টুনি আর শানের সঙ্গে গোছানোর কাজে হাত লাগিয়েছে। ওরা ওদের মনে কাজ করছিল, আর টনি টনির মনে।
পাণ্ডুলিপিটাও তুলে নিল টনি। রাখল কাগজপত্রের সঙ্গে। তারপর আর কোনও দরকারি কাগজ আছে কি না সেটা ভালো করে দেখার জন্য টেবিলটাকে ও টেনে সরাল। হাট করে খুলে দিল আলমারির দরজা। দেখল, একেবারে নীচের তাকে বেশ কিছু কাগজের তাড়া রয়েছে।
নাকে হাত চাপা দিয়ে ধুলোমাখা কাগজপত্রগুলো ঘাঁটতে লাগল টনি। তার মধ্যে থেকে বেছে কয়েকটা কাগজের গোছা তুলে নিল।
ঠিক তখনই ওর চোখে পড়ল ডায়েরিটা।
গাঢ় বাদামি রেক্সিনে মোড়া বড় মাপের ডায়েরি। তার মলাটের কোনাগুলো ধাতুর পাতে বাঁধানো।
ডায়েরিটা সোমেশ চ্যাটার্জির–প্রথম পাতায় নাম লেখা আছে।
ওটা হাতে নিয়ে কয়েকটা পাতা ওলটাল টনি। দ্রুত চোখ বোলাতে লাগল। ওর চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
ডায়েরিটা পড়তে-পড়তেই ও আন্দাজে হাত বাড়াল চেয়ারের দিকে। চেয়ারটা খুঁজে পেয়ে তাতে বসে পড়ল। তারপর একমনে পাতার পর পাতা উলটে চলল।
টনির বিমূঢ় অবস্থাটা প্রথম খেয়াল করল হারা। ও টনির দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, কী রে, কী হল তোর? হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলি কেন?
টনি তাকাল হারাদের দিকে। ওর চোখে বিভ্রান্ত ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি।
হাতের কাজ ফেলে টুনি, হারা আর শান প্রায় ছুটে চলে এল টনির কাছে। তাকাল ওর হাতে ধরা ডায়েরিটার দিকে।
কী ব্যাপার বল তো? শান জিগ্যেস করল।
টনি আলতো গলায় বলল, এই ডায়েরিটার সোমেশ চ্যাটার্জি সব লিখে গেছেন। আমাদের এখনই এ-বাড়ি ছেড়ে পালাতে হবে। এই বাড়িটা একটা ফাঁদ। যদি আমরা এখানে আরও কদিন থেকে যাই, তা হলে আমরাও একে-একে জিকো আর মউলির মতো হারিয়ে যাব। সোমেশ চ্যাটার্জিও বোধহয় এইভাবে হারিয়ে গেছেন। কার্নিভোরাস প্লান্ট এক্স সবাইকে খতম করে দিয়েছে।
হারা ঝুঁকে পড়ল ডায়েরিটার ওপরে ও এসব কী বলছিস!
ঠিক বলছি। ডায়েরিটা পড়–সব কোশ্চেনের আনসার পেয়ে যাবি…।
ওরা তিনজন ঝুঁকে পড়ল টনির ঘাড়ের ওপরে। টনির বেছে দেওয়া জায়গাগুলো পড়তে লাগলঃ
অবশেষে আমার এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল হতে চলেছে। অন্তত আমার তাই মনে হচ্ছে। কার্নিভোরাস প্লান্টের একটা নতুন গণ বোধহয় আবিষ্কার করতে পেরেছি আমি–জেনাস এক্স। এই নতুন লতানে গাছটা মাপে বেশি বড় নয়, তবে এর শুঁড়গুলো সরু হলেও বেশ শক্ত। সহজে ছেঁড়া যায় না।
এই লতানে গাছটা মানুষের কী উপকারে লাগবে জানি না। তবে সব আবিষ্কার তো মানুষের উপকারের কথা ভেবে হয় না। আবিষ্কার হয়ে যায় সায়েন্টিস্টদের কৌতূহলের টানে। যেমন, মাংসাশী গাছ নিয়ে গবেষণা আমাকে চিরকাল টেনেছে। তাই এক্সকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমি চালিয়ে যাব।
আজ একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করলাম।
প্লান্ট এক্সটা বোধহয় সাবালক হয়ে উঠেছে। কারণ, আগে আমিই ওকে নিয়ম করে পোকামাকড় ধরে দিতাম। সেটা দেওয়ামাত্রই ও শুঁড় দিয়ে পোকাটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরত। তারপর সেটার প্রাণরস শুষে নিত। ওর শুঁড়ের মধ্যে ছোট-ছোট সাকার আছে–যেগুলো দিয়ে চোষা যায়। তা ছাড়া ওর শরীর থেকে যে-ডাইজেস্টিভ জুস বেরোয় সেটার অ্যাসিডিটি বেশি–পিএইচ ভ্যালু সাতের চেয়ে অনেক কম–প্রায় চারের কাছাকাছি। ফলে খুব তাড়াতাড়ি শিকারকে হজম করে ফেলতে পারে প্লান্ট এক্স।
কিন্তু আজ একটা পিকিউলিয়ার ব্যাপার দেখলাম।
একটা ছোট্ট প্রজাপতি উড়তে উড়তে গাছটার কাছে এসেছিল। লতানে গাছটার দুটো শুঁড় আচমকা উড়ন্ত প্রজাপতিটাকে বিদ্যুতের মতো ছোবল মারল। তারপর চোখের পলকে সাপটে ধরল ওটাকে। এবং সাকারগুলো তাদের কাজ শুরু করে দিল।
ঘটনাটা আমাকে অবাক করেছে। না, ওর শিকার ধরা নয়। বরং সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হল, এক্স বুঝল কেমন করে যে, প্রজাপতিটা উড়তে-উড়তে ওর নাগালের মধ্যে এসেছে!
যা ভেবেছিলাম তাই।
এক্স-এর মধ্যে ইনফ্রারেড ওয়েভ সেন্সর আছে–টিভির রিমোট সেন্সিং এর মতো। কোনও পোকামাকড় বা প্রজাপতি এক্স-এর কাছাকাছি এলে তাদের শরীরের তাপ-তরঙ্গ এক্স টের পায়। ওর শুঁড়ের গায়ে যে সূক্ষ্ম রোঁয়া আছে সেগুলো সেই অবলোহিত তরঙ্গ অনুভব করতে পারে। তারপর শুঁড়গুলো শিকার ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
শিকার ধরার এই মারমুখী ধরন দেখে এক্সকে মাংসাশী গাছ না বলে যোদ্ধা গাছ বা ওয়ারিয়র প্লান্ট বললেই বোধহয় বেশি মানায়। মাংসাশী গাছের ইতিহাসে এরকম হিংস্র গাছের কোনও নজির নেই।
আজ এক্স একটা চড়ুই পাখি ধরেছে।
পদ্ধতি সেই একই প্রজাপতিটার মতন। আচমকা ছোবল। জড়িয়ে ধরা। খতম।
ওর শুঁড়গুলো আগের চেয়ে মোটা হয়েছে। লম্বাও। এখন শুঁড়গুলোর ডায়ামিটার আড়াই মিলিমিটার। আর লেংথ তিন ফুট মতন।
একটু পরেই চড়ুই পাখিটার শুধু পালকগুলো পড়ে রইল। বাকিটা এক্স খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।
আমি ওকে এখনও স্টিমুল্যান্ট আর এক্সাইটার ইনজেক্ট করে যাচ্ছি। কেমিক্যালের মাধ্যমে নাইট্রোজেন ইত্যাদির জোগান দিয়ে যাচ্ছি। আমি চাই, এক্স রাতেও ওর অ্যাকটিভিটি বজায় রাখুক। কারণ, রাতে অ্যাকটিভ না হলে এক্স শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করতে পারবে না। আর যদি সত্যি-সত্যিই ও সেরকমভাবে অ্যাকটিভ হয় তা হলে ওকে রোখা মুশকিল হয়ে পড়বে।
