টনি আর হারা সামনে ঝুঁকে পড়ে মুরগিটাকে ভালো করে দেখল।
বেচারি এখনও বেঁচে আছে। থরথর করে কাঁপছে ওর দেহ। ওর সাদা আর হালকা বাদামি পালকে রক্ত লেগে আছে।
সরু-সরু সাপের মতো ওগুলো কী? টুনি কাঁপা গলায় জানতে চাইল। আঙুল তুলে দেখাল বাইরের ঘাসের দিকে।
টনি বলল, মনে হচ্ছে গাছ, মাংসাশী গাছ। ওরা…ওরা…ওদের গায়ে ছোট-ছোট রোঁয়া ছিল…।
গাছগুলো মাটির ভেতরে ঢুকে গেল কেন? হারা অবাক হয়ে জিগ্যেস করল।
জানি না…। টনি নিজেও এই ব্যাপারটা দেখে অবাক হয়েছিল। ও ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে ছিল মুরগিটার দিকে।
শান ভয় পাওয়া টুনিকে ভরসা দিচ্ছিল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। টনির উত্তর শুনে বলে উঠল, আর এক্সপেরিমেন্ট করে কাজ নেই। চল, দরজা বন্ধ করে ভেতরে চলে যাই। কাল সকাল হলেই…।
টনি আনমনাভাবে বলল, একমিনিট, শান, একমিনিট। একটা আইডিয়া এসেছে। এটাই লাস্ট এক্সপেরিমেন্ট প্লিজ।
কী এক্সপেরিমেন্ট? হারা জিগ্যেস করল।
শান বিরক্তির একটা শব্দ করল মুখে।
টনি বলল, কী এক্সপেরিমেন্ট এখনই দেখতে পাবি। শান, লাইটের সুইচটা তোকে আর-একবার অফ করতে হবে।
অন্ধকারেই ঠোঁট ওলটাল শান। তারপর হাত বাড়িয়ে বাইরের আলোয় সুইচটা অফ করে দিল।
টনি দরজার প্রায় চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছিল। শান বাইরের আলোটা নেভানোর সঙ্গে-সঙ্গে ও টর্চটা নিভিয়ে দিল।
আবার অন্ধকার নেমে এল।
কয়েক সেকেন্ড পরেই শোনা গেল সপসপ শব্দ। সেই সঙ্গে পারফিউমের মন কেড়ে নেওয়া গন্ধটা নেশা ধরিয়ে দিতে চাইল।
আর তখনই শোনা গেল মুরগিটার কঁক কঁক চাপা ডাক। সঙ্গে দুর্বলভাবে ডানা ঝাপটানোর শব্দ।
টনি টর্চ জ্বেলে আলো ফেলল মুরগিটার দিকে। চেঁচিয়ে শানকে বলল, শিগগির আলো জ্বেলে দে!
বাইরের আলোটা জ্বলে উঠতেই স্পষ্টভাবে সব দেখা গেল।
হিলহিলে সরু সাপগুলো আবার মুরগিটাকে সাপটে ধরেছে। কিন্তু আলো জ্বলে ওঠামাত্রই ওরা নিস্তেজ হয়ে গেল যেন। সড়সড় করে আবার ফিরে গেল মাটির ভেতরে।
হারা স্তম্ভিত হয়ে গেল। বিড়বিড় করে বলল, এসব কী অ্যাবসার্ড ব্যাপার দেখছি!
শান আর টুনি চলে যাচ্ছিল ভেতরে। টনি ওদের ডেকে থামাল। তারপর তিনজনকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে এক্সপেরিমেন্টটা আরও একবার চালাল-তবে অন্তত মিনিট দশেক পর।
এবারে আলো জ্বলতেই শুধু মুরগির রক্তমাখা পালক চোখে পড়ল–এখানে-সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু পালক ছাড়ানো মুরগিটার আর কোনও চিহ্ন নেই।
মউলি আর জিকোর কথা মনে পড়ল ওদের। রক্তমাখা জামাকাপড়, আংটি আর রিস্টব্যান্ড ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি।
ওদের গায়ে কাঁটা দিল।
খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে বাইরের বৃষ্টিভেজা ঘাস-জমির দিকে তাকিয়ে ওদের এই প্রথম বিশ্বাস হল, জিকো আর মউলি আর কখনও ফিরবে না।
ওদের বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। আলো নিভিয়ে দরজা বন্ধ করে ওরা চলে এল বাড়ির ভেতরে।
টনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লান্ত গলায় বলল, সাপের মতো ওই শুঁড়গুলো মানে, গাছগুলো, নকটার্নাল।
নকটার্নাল মানে? জানতে চাইল হারা।
নিশাচর। বলল, টনি, ওই গাছগুলো নকটার্নাল কার্নিভোরাস প্লান্ট। নিশাচর মাংসাশী গাছ।
একটু চুপ করে থেকে সকলের মনের ভাবনাটা মুখে উচ্চারণ করল টনি, জিকো আর মউলিকে হায়েনা, নেকড়ে কিংবা বাঘ নয়–এই ভয়ংকর গাছগুলোই শেষ করেছে…।
.
বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙল হারার।
খোলা জানলা দিয়ে তাকাল বাইরে। বৃষ্টি নেই, তবে আকাশ বিষণ্ণ।
পাশে তাকিয়ে দেখল শান আর টনি নেই। বোধহয় গোছগাছের জন্য আগেই উঠে পড়েছে। কারণ, আজ ওদের চলে যাওয়ার দিন।
হঠাৎই হারার কান্না পেয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ভার হয়ে গেল। মউলি আর জিকো আগেই চলে গেছে। ওদের সঙ্গে আর দেখা হবে না।
টুনটুনি চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকল। মুখ ভার। চোখ ভেজা।
হারা চুপচাপ ওকে দেখল। ও হঠাৎ যেন বড় হয়ে গেছে। সবকিছু বুঝতে শিখেছে।
কাল রাতে টনির ওই ভয়ংকর পরীক্ষার আগে পর্যন্ত ওদের মনে একটা আবছা বিশ্বাস ছিল, জিকো আর মউলি ফিরে আসবে। তাই দুঃখের অন্ধকারের মধ্যেও একবিন্দু আশার আলো ছিল।
এখন আলো নিভে গেছে।
টুনির হাত থেকে চায়ের কাপ নিল হারা। চুমুক দিল।
ঠিক তখনই ঘরে ঢুকল টনি আর শান। শানের হাতে একটা ছোট হাতব্যাগ।
টনি বলল, হারা, আধঘণ্টার মধ্যে রেডি হয়েনে। দেরি করলে বৃষ্টিতে ফেঁসে যেতে পারি। আমি আর শান চটপট সব গুছিয়ে নিচ্ছি–তুই আয়।
টনির কথায় প্রাণের ছোঁয়া ছিল না। ওর কথাগুলো অনেকটা যন্ত্রস্বরের মতো শোনাল।
হারা বলল, যা, যাচ্ছি– ।
বাইরের ঘরে এসে ছড়ানো জিনিসপত্রে আবার হাত লাগাল শান আর টনি। টুনটুনিও এসে ওদের সাহায্য করতে লাগল।
টনির হঠাৎ মনে হল, সোমেশ চ্যাটার্জির কাগজপত্রগুলো ও সঙ্গে নিয়ে যাবে। তাতে পুলিশি তদন্তের হয়তো সুবিধে হবে। এখানে কাগজপত্রগুলো ফেলে রেখে গেলে হারিয়ে যাওয়ার কিংবা নষ্ট হওয়ার ভয় থাকবে।
ও শানকে সেকথা বলতেই শান জোর গলায় সায় দিল : অফ কোর্স! এখানে ফেলে রেখে যাওয়ার রিস্ক নেওয়ার কোনও মানে হয় না।
সুতরাং টনি ওর কাজ শুরু করল।
পাশের ঘর থেকে সোমেশ চ্যাটার্জির বিছানার একটা চাদর নিয়ে এল টনি। সেটার ধুলো ঝেড়ে পেতে নিল মেঝেতে। তারপর গবেষণার কাগজপত্রের তাড়া একে-একে সাজিয়ে রাখতে লাগল চাদরের ওপরে।
