হারা জেগেই ছিল। বলল, একটা গন্ধ পাচ্ছিস?
পাচ্ছি। ফিসফিস করে বলল শান।
হারা বলল, অ্যাই, টুনি ঘুমিয়ে পড়েছে।
শান বলল, ওকে আর ডাকিস না ঝামেলা বাড়বে।
গন্ধটা বাড়ছিল। সেই গন্ধে ওদের মেজাজটা দারুণ চনমনিয়ে উঠল। কিন্তু এতক্ষণ এই গন্ধটা ছিল কোথায়? তা হলে কি ওই ঘাসের আড়ালে নতুন কোনও ফুল ফুটেছে এই মাঝরাতে?
শান একটা ঘোরের মধ্যে উঠে দাঁড়াল। চৌকাঠ ডিঙিয়ে পা বাড়াতে গেল সামনে।
ধাক্কা মেরে ওকে পিছনে ঠেলে দিল টনিঃ কী করছিস পাগলের মতো! ফিসফিসে গলায় ও ধমকে উঠল।
হারা শানের হাত চেপে ধরল।
ওটা-ওটা কীসের গন্ধ? শান শিশুর মতো গলায় প্রশ্ন করল।
ওটা বিপদের গন্ধ। জবাব দিল টনি।
ঠিক তখনই ওর নজরে পড়ল, ঘাসের শিষের ফাঁকফোকর দিয়ে দু-একটা রঙিন আলোয় বিন্দু যেন দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টিতে বাতাসে ঘাসের শিষগুলো নড়ছে বলে থেকে-থেকেই আলোয় ফুটকিগুলো আড়াল হয়ে যাচ্ছে। তাই মনে হচ্ছে যেন জ্বলছে আর নিভছে।
আলোয় ফুটকিগুলো ঠিক যেন কলকাতায় রাস্তায় গেঁথে দেওয়া ডিভাইডারের আলোয় মতো। মিটমিট করছে।
টনি উঠে দাঁড়াল। বলল, তোরা চুপচাপ এখানে থাক, আমি দোতলার ছাদ থেকে কেসটা একবার ভালো করে দেখে আসি। ভুলেও জায়গা ছেড়ে নড়বি না। মনে রাখবি, জিকো আর মউলি কিন্তু ফেরেনি। আমি যাব আর আসব।
টনি টর্চ হাতে করে রওনা হল দোতলার সিঁড়ির দিকে।
ওর সামান্য গা-ছমছম করছিল, কিন্তু ও জানে, বাড়ির ভেতরের চেয়ে বাইরের ভয় অনেক বেশি।
দোতলার ছাদে এসে অবাক হয়ে গেল টনি। এখানেও সেই আলো!
ছাদের যেদিকটায় থরেথরে টব সাজানো সেদিকটায় জমাট অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যেই কয়েকটা আলোর বিন্দু তারার মতো মিটমিট করছে।
এ-দৃশ্য টনি আগে কখনও দেখেনি। তাই ও অবাক হয়ে রঙিন ফুটকিগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। ভাবছিল, কোন গাছটা এই দেওয়ালি উৎসব শুরু করেছে।
ঘোরলাগা গন্ধটা টনির নাকে এখনও আসছিল। গন্ধটা যেন ওকে আয়, আয় বলে টানছিল।
বোধহয় সেই টানেই ও ছাদের পাঁচিলের দিকে এগিয়ে গেল। কারণ, গন্ধের বেশিরভাগটাই সেদিক থেকে ঢেউয়ের মতো ভেসে আসছিল।
ছাদের পাঁচিলের ওপর দিকে ঝুঁকে পড়ল টনি। আর তখনই ও অসংখ্য আলোয় বিন্দু দেখতে পেল।
টনির ভেতরে একটা প্রবল কৌতূহল আর টান কাজ করতে শুরু করল। কী রয়েছে ওই ঘাস জমির মধ্যে?
অদ্ভুত এক তাড়াহুড়ো নিয়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে চলল টনি। তারপর সাবধানে পা ফেলে সিঁড়ি নামতে লাগল। এই দু-তিনদিনে বাড়ির বেখাপ্পা সিঁড়িগুলো ওর তেমন মুখস্থ হয়ে ওঠেনি।
একতলায় সদর দরজার কাছে যখন এল তখন ও সামান্য হাঁপাচ্ছে। দেখল টুনটুনি এর মধ্যে জেগে উঠেছে। ওকে দেখতে পেয়েই জিগ্যেস করল ওপর থেকে কী দেখলি?
ঘাসের ফাঁকে-ফাঁকে ছোট ছোট আলো জ্বলছে…অনেক আলো…ওইরকম…। আঙুল তুলে বাইরের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা কয়েকটা আলোর বিন্দুর দিকে দেখাল টনি।
হারা চাপা গলায় বলল, এদিকে কী ঝামেলা বল তো! শান বারবার বাইরে যেতে চাইছে…আমি কোনওরকমে ঠেকিয়ে রেখেছি…।
শান অনুযোগের সুরে বলল, কেন, বাইরে গিয়ে ব্যাপারটা ইনভেস্টিগেট করলে ক্ষতি কী?
টনি শান্ত গলায় বলল, তা হলে তুই হয়তো আর ফিরে আসবি না–জিকো আর মউলির মতো…।
শান সঙ্গে-সঙ্গে দমে গেল। ওর চেতনা বোধহয় ফিরে এল।
টনি ভাবল, এবারে মুরগিটাকে বাইরে ছুঁড়ে দিয়ে দেখা যাক কী হয়।
আর ঠিক তখনই বাইরে ঘাসের জটলা থেকে একটা চাপা সপসপ শব্দ ভেসে এল। হারার ভাষায় যে-শব্দ ভেজা মাটিতে চাবুক মারার মতন।
টনি আর দেরি করল না। হারাকে বলল, শিগগির মুরগিটাকে তুলে এনে ছুঁড়ে দে বাইরে!
টনি আন্দাজে ভর করে টর্চের আলো ফেলল মুরগিটার গায়ে। হারা চোখের নিমেষে মুরগিটার কাছে পৌঁছে গেল। এক ঝটকায় ওটাকে তুলে নিল। তারপর সদর দরজার কাছে এসে ওটাকে বাইরে ছুঁড়তে যাবে, অমনি টনি চেঁচিয়ে উঠল, বেশি দূরে ছুড়বি না। পাঁচ-ছহাতের মধ্যে…।
হারা মুরগিটাকে ছুঁড়ে দিল অন্ধকারের মধ্যে।
ডানা ঝাপটে কঁক কঁক করে ডেকে উঠল মুরগিটা। শুন্যে টাল খেয়ে ঘাসের মাঝে গিয়ে পড়ল।
আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল চূড়ান্ত ঝটাপটি–যেন হিংস্র মোরগ-লড়াই চলছে।
অদৃশ্য কোনও শত্রুর সঙ্গে প্রচণ্ড লড়াই করছিল মুরগিটা। অন্তত শব্দ শুনে তাই মনে হচ্ছিল।
টনি চেঁচিয়ে বলল, শান, শিগগিরই বাইরের লাইটটা জ্বেলে দে–।
শান একলাফে সুইচের কাছে গিয়ে বাইরের লাইট জ্বালার আগেই টনির টর্চের আলো গিয়ে পড়েছে মুরগিটার ওপরে।
সবুজ সাপের মতো ওগুলো কী কিলবিল করছে মুরগিটার গায়ে।
কেঁচোর মতো সরু অসংখ্য লাউডগা সাপ যেন ঘেঁকে ধরেছে অসহায় মুরগিটাকে। মুরগিটা কর্কশ গলায় প্রাণপণে চেঁচাচ্ছে।
টুনটুনি ভয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল।
দু-তিন সেকেন্ড পরেই জ্বলে উঠল বাইরের আলোটা। সঙ্গে-সঙ্গে কিলবিলে সাপগুলো মুরগিটাকে ছেড়ে লাটাইয়ের সুতো গোটানোর মতো সড়সড় করে ঢুকে গেল মাটির ভেতরে।
দড়ি টেনে মুরগিটাকে কাছে নিয়ে আয়– চেঁচিয়ে বলল টনি।
হারা সঙ্গে-সঙ্গে দড়ি ধরে টান মারল। ঘাসের শিষ নুইয়ে দিয়ে মুরগিটার কাহিল শরীর ওদের দিকে খানিকটা এগিয়ে এল। ফলে চলে এল আলোয় কাছাকাছি।
পারফিউমের গন্ধটা এখন আরও তীব্রভাবে নাকে আসছিল।
