প্রথম প্রশ্ন, ওরা রাতের আঁধারে বাইরে কেন বেরোল।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, বাইরে বেরোনোর পর কে কীভাবে ওদের আক্রমণ করল।
কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল টনি। একঘেয়েমি কাটাতে ও চলে এসেছিল দোতলার ছাদে। ওর পিছন পিছন টুনিও চলে এসেছিল দোতলায়। কারণ, হারা আর শান হাঁস মুরগির খোঁজে বেশ কিছুক্ষণ আগে বাইক নিয়ে বেরিয়েছে ফলে বাড়িতে এখন টনি ছাড়া ওর সঙ্গী আর কেউ নেই।
টুনির বারবারই মনে হচ্ছে, ওকে যেন কে পা টিপে টিপে অনুসরণ করছে। তাই ও সবসময় একটা আতঙ্কে সিঁটিয়ে আছে। টনি এ নিয়ে বেশ কয়েকবার ওকে ঠাট্টাও করেছে।
টনি উবু হয়ে বসে ছাদের টবগুলো খুঁটিয়ে দেখতে লাগল আবার। ওর ভুরু কুঁচকে গেছে। চোখের নজর তীক্ষ্ণ। জটিল কোনও প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছে প্রাণপণে।
টুনটুনি বারবারই ওকে জিগ্যেস করছিল, কীরে, কিছু পেলি?
উত্তরে টনি মাথা নাড়ছিল। আর মনে-মনে ভাবছিল, ওই ছোট-ছোট গাছগুলোর মধ্যে আসল উত্তরটা লুকিয়ে রয়েছে কি না।
একটু পরেই বাইকের শব্দ ওদের কানে এল।
টুনটুনি দৌড়ে গেল ছাদের পাঁচিলের কাছে। দেখল, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ঘাম-জমির ওপর দিয়ে ছুটে আসছে হারাদের মোটরবাইক। হারা চালাচ্ছে, আর শান পিছনে বসে আছে। ওর হাতে একটা মুরগি।
টনি উঠে এসেছিল পাঁচিলের কাছে। শানের হাতে মুরগিটা দেখতে পেল ও। সঙ্গে সঙ্গে ও আজ রাতের চরম পরীক্ষাটার কথা ভাবতে শুরু করল।
.
০৭.
ঘড়ির কাঁটা রাত দশটার ঘরে পৌঁছতেই ওরা চারজন তৈরি হয়ে নিল।
সন্ধের পর থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এখন বৃষ্টির তেজ না বাড়লেও বজ্রপাতের তেজ বেড়েছে। আকাশে ঝিলিক দিয়ে উঠছে সাদা তরোয়াল।
টনি, হারা, শান আর টুনি সাবধানী পা ফেলে-ফেলে এগিয়ে চলল সদর দরজার দিকে। ওদের সঙ্গে রয়েছে বেচারি নিরীহ মুরগিটা। কঁক কঁক শব্দ করছে।
মুরগিটার পায়ে একটা লম্বা দড়ি বাঁধা। দড়ির অন্য প্রান্তটা হারার হাতে। আর টনির হাতে টর্চ।
টনি সবাইকে হাত নেড়ে বোঝাচ্ছিল, ও ঠিক কী করতে চায়।
রাত আর-একটু বাড়লে আমরা মুরগিটাকে বাইরের ঘাসের মধ্যে ছেড়ে দেব। তারপর ওয়াচ রাখব, কেউ ওটাকে অ্যাটাক করে কি না। যেই অ্যাটাক করবে সঙ্গে-সঙ্গে আমরা বাইরে লাইটটা জ্বেলে দেব। আর অ্যাট দ্য সেম টাইম টর্চ মারব মুরগিটার গায়ে…তা হলেই সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে।
বাড়ির সদর দরজার বাইরে একটা ল্যাম্প হোলডার লাগানো ছিল, কিন্তু তাতে কোনও বাম্ব ছিল না। আজ বিকেলে দোতলার ঘর থেকে একটা বাম্ব খুলে নিয়েছে টনি। তারপর হারার কোলে উঠে অনেক কসরত করে সেই বাটা লাগিয়ে দিয়েছে সদর দরজার বাইরের হোলডারটায়। সুইচ অন-অফ করে দেখে নিয়েছে বাটা ঠিকমতো জ্বলছে নিভছে কিনা। বাটা জ্বলে উঠলে বাইরের ঘাস জমির অনেকটা জায়গায় আলো ছড়িয়ে পড়ছে যদিও সেই আলোর তেজ তেমন বেশি নয়।
ওরা সদর দরজার কাছে অলিন্দের মেঝেতে বসে পড়ল। সামনে টনি আর শান, পিছনে হারা আর টুনটুনি। মুরগিটা ওদের কাছ ঘেঁষে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। ওটার পায়ে বাঁধা দড়ির খোলা মাথাটা হারা বেঁধে দিয়েছে সদর দরজার একটা কড়ায়।
বাড়ির সব আলো ওরা আগেই নিভিয়ে দিয়েছিল। এখন টনির কথায় টুনটুনি উঠে গিয়ে অলিন্দের আলোটাও নিভিয়ে দিল।
ওদের চোখের সামনে হঠাৎ করে অন্ধকার নেমে এল। অন্ধকার হতেই মুরগিটা চুপ করে গেল।
টনি টর্চটা কয়েকবার জ্বেলে টেস্ট করে নিল।
তারপর শুরু হল অপেক্ষা।
টুনটুনি হারার জামা খামচে ধরে বসেছিল।
হারা ওকে বলল, এত ভয় পাওয়ার কী আছে বল তো!
টুনি বলল, ভয়ে নয়–এমনি।
হারা কোনও জবাব দিল না।
শান টনিকে জিগ্যেস করল, আমরা কতক্ষণ ওয়েট করব রে?
টনি বলল, সেটাই তো বোঝা মুশকিল। দেখা যাক সিচুয়েশান কী হয়…।
একটু পরেই অন্ধকারে ওদের চোখ সয়ে এল। বাইরের ঘাসের শিষ আবছা দেখা যাচ্ছিল। তার ওপরে ঝিরঝিরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দ পাচ্ছিল ওরা।
চারপাশ নিস্তব্ধ হওয়ায় ওদের কেমন যেন ভয়-ভয় করছিল। টুনটুনি তো একবার বলেই ফেলল, হুট করে বাঘ কিংবা নেকড়ে এসে পড়লে কী হবে?
টনি শান্ত গলায় বলল, টর্চের আলো ফেললেই ওরা ভয় পেয়ে থেমে যাবে। তখন চট করে দরজা বন্ধ করে দিলেই হবে।
শান টুনটুনিকে সাহস দিতে হালকা গলায় গান ধরল।
টনি আর হারা তাকিয়ে রইল বাইরের অন্ধকারের দিকে। কাল রাতের মতো আজ কিছুতেই ঘুমিয়ে পড়লে চলবে না। রাত যত গভীরই হোক, সজাগ থাকতে হবে।
সময় কাটানোর জন্য টনি হারাদের সোমেশ চ্যাটার্জির গবেষণার কথা বলছিল। বলছিল অদ্ভুত সব মাংসাশী গাছের কথা।
একসময় টনি ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তারপর ওরা চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগল।
একঘেয়েভাবে অপেক্ষা করতে করতে ঘড়ি দেখতেও ভুলে গেল ওরা। বারবার চোখ টেনে আসতে চাইল, কিন্তু জিকো আর মউলির কথা ভেবে ওরা ঘুম তাড়াল। কয়েকবার উঠে গিয়ে চোখে জল দিয়ে এল।
রাত তখন কত কে জানে! টনি চোখ পুরোপুরি আর খুলে রাখতে পারছিল না। হঠাৎই ওর নাকে একটা গন্ধ এল। মনে হল, নাম-না-জানা কোনও মিষ্টি পারফিউম যেন কেউ বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছে।
টনি নড়েচড়ে বসল। শান আর হারাকে ঠেলা মারল। ফিসফিসে গলায় ডাকল, অ্যাই, শান! হারা!
শানের একটু তন্দ্রা মতন এসে গিয়েছিল। টনির ধাক্কায় ও চটপট সোজা হয়ে বসল।
