টনি খাতাটা পড়তে শুরু করল। ওর চঞ্চল চোখ লাইনের পর লাইন ডিঙিয়ে খুব তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দরকারি জায়গায় চোখ পড়লেই ও থামছিল, ভালো করে পড়ে নিচ্ছিল সেই জায়গাগুলো।
…মাংসাশী গাছ পোকামাকড় বা ছোট-ছোট প্রাণী ধরে খায়, তবে অন্যান্য প্রাণীর মতো এরা শিকারকে সত্যি-সত্যি চিবিয়ে গিলে খায় না। বেশিরভাগ মাংসাশী গাছের ক্ষেত্রে একরকম রস নিঃসৃত হয়, যাকে পাঁচক রসের মতো ভাবা যেতে পারে। এই রস শিকারকে পচিয়ে-গলিয়ে দেয়। তারপর সেই গলিত পদার্থ গাছ শুষে নেয় নিজের শরীরে। কিছু কিছু মাংসাশী গাছে রস নিঃসরণের ব্যবস্থা নেই। ওরা শিকার ধরার পর তাকে পচানোর জন্য জীবাণুর ওপরে নির্ভর করে। অর্থাৎ শিকারকে মেরে ফেলার পর ওরা প্রাকৃতিক পচনের জন্য অপেক্ষা করে। তারপর সেই গলিত পদার্থ শরীরে শুষে নেয়।
….অন্যান্য সবুজ গাছপালার মতো মাংসাশী গাছও নিজের খাদ্য নিজের শরীরে তৈরি করে। কিন্তু এ ছাড়াও শিকার ধরে কেন তারা বাড়তি খাদ্য সংগ্রহ করে সে-বিষয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা স্পষ্ট নয়। তবে অনেক সময় দেখা গেছে, কিছু কিছু প্রজাতির মাংসাশী গাছ এমন মাটিতে জন্মায় যেখানে নাইট্রোজেন ও গাছের অন্যান্য প্রয়োজনীয় মৌলের ঘাটতি আছে। তারা শিকার ধরে খাদ্য সংগ্রহ করে এই অভাব মেটায়।
এরপর কয়েকটা পৃষ্ঠায় টনি দেখল, নানান প্রজাতির মাংসাশী গাছের কথা লেখা আছে। এই নামগুলো ও আগে একবার দেখেছিল। তবে এখানে X চিহ্ন দিয়ে কোনও গণের কথা বলা নেই।
গণের নামের পর বিভিন্ন প্রজাতির গাছের উদাহরণ দেওয়া আছে। যেমন, কলস উদ্ভিদ, সূর্যশিশির, ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ, ব্লাডারওয়র্ট ইত্যাদি।
পাতা ওলটাতে-ওলটাতে এক জায়গায় ওর নজরে পড়ল শিকার ধরার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন লেখক।
..পোকামাকড়দের কাছে টেনে এনে ফাঁদে ফেলার নানারকম পদ্ধতি আছে। যেমন, সারাসেনিয়া, নিপেনথেস বা ডার্লিংটোনিয়া গণের বিভিন্ন রকম কলস উদ্ভিদের ফাঁদ পাতার ঢং বিভিন্ন হলেও ওদের মূল নীতি একটাই ও মিষ্টি মধুর গন্ধ ছড়িয়ে ওরা পোকামাকড়কে পাতার কাছে টেনে নিয়ে আসে। কলসির ভেতরে পোকা একবার পড়ে গেলে সে তেলা দেওয়াল বেয়ে উঠে আর বাইরে বেরোতে পারে না। তা ছাড়া ওই দেওয়ালে নিম্নমুখী সূক্ষ্ম রোঁয়া থাকে। এর ফলে ফাঁদে পড়া পোকার বেরিয়ে আসা অসম্ভব।
সূর্যশিশিরের চামচের মতো বাঁকানো পাতায় থাকে অনেক শুঁড়। প্রতিটি শুঁড়ের ডগায় থাকে একফোঁটা করে আঠালো লালা। সূর্যের আলোয় এই লালা শিশিরবিন্দুর মতো চকচক করে। কোনও পোকা সূর্যশিশিরের পাতায় বসলেই ওই আঠায় জড়িয়ে পড়ে। আর সে বেরোতে পারে না।
বাটারওয়র্টের পাতার আকৃতি ডিমের মতো। রং হলদেটে সবুজ। এই পাতায় লালা মাখানো থাকে। কোনও পোকামাকড় একবার এই পাতায় বসলেই শেষ। সে ওই লালার আঠায় আটকে যায়, আর পাতাগুলো ভেতরদিকে গুটিয়ে গিয়ে তাকে বন্দি করে ফ্যালে। তখন আরও লালা বেরিয়ে আসে। তার একটু পরেই বেরিয়ে আসে পাঁচক রস।
মাংসাশী গাছ সাধারণত গন্ধ আর রং দিয়ে পোকামাকড়কে টানে। এ ছাড়া তাদের অন্য কোনও আকর্ষণ পদ্ধতি আছে কিনা তা নিয়ে আজও গবেষণা চলছে।
সবচেয়ে বড় মাপের মাংসাশী গাছ পাওয়া যায় নিপেনথেস গণে। এই গাছগুলো দশ/পনেরো মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এরা পোকামাকড় ছাড়াও বড় মাপের শিকার ধরতে পারে। যেমন, ব্যাং। আবার কখনও কখনও পাখি বা ইঁদুর ধরেছে বলেও শোনা গেছে।
অনেক গাছের ফাঁদ কাজ করে চোখের পলকে। সবচেয়ে তাড়াতাড়ি যারা শিকার ধরে তারা হল ইউট্রিকুলারিয়া গণের মাংসাশী গাছ। এরা জন্মায় জলের তলায়। এক সেকেন্ডের তিরিশ ভাগের একভাগ সময়ে তারা শিকারকে ভেতরে টেনে নেয়।
প্রায় ছশোর বেশি মাংসাশী গাছের প্রজাতি এবং উপ-প্রজাতির খোঁজ পাওয়া গেছে। আরও খোঁজ চলছে। তবে গত দু-দশক ধরে সারা পৃথিবী জুড়ে যে-যুগান্তকারী গবেষণা চলছে তা হল জিন মিশ্রণের সাহায্যে নতুন-নতুন ধরনের মাংসাশী গাছ তৈরি করে তাদের যুদ্ধের কাজে লাগানো। গোপনে শত্রুবিনাশ করার জন্য এ-ধরনের গাছ খুবই জরুরি। আমার ধারণা, সাধারণ গাছের সঙ্গে মাংসাশী গাছের জিন মিশ্রণ ঘটিয়ে অলৌকিক ফল পাওয়া সম্ভব। যদি সেরকম কোনও গাছ কখনও তৈরি করা সম্ভব হয়, তা হলে সে হবে যুদ্ধের অপরাজেয়। শত্রু বুঝতেই পারবে না আঘাত কোনদিক থেকে আসবে, কখন আসবে।
খাতার শেষদিকের পৃষ্ঠাগুলো পড়তে-পড়তে টনি বেশ অবাক হয়ে গেল। ওর মনে পড়ল, গবেষণার কাগজপত্রগুলো ঘাঁটতে গিয়ে ও জিন, ক্লোনিং এই শব্দগুলো পেয়েছিল। তা হলে কি সোমেশ চ্যাটার্জি নতুন ধরনের কোনও মাংসাশী গাছ তৈরির চেষ্টা করছিলেন? সেই অজানা গ্রুপের নাম দিয়েছিলেন X? চেষ্টা করতে করতে তিনি সত্যি-সত্যি সেরকম গাছ তৈরি করে ফেলেননি তো?
দোতলার ছাদের টবগুলোর কথা মনে পড়ল টনির। সেখানে এই নতুন গাছের নমুনা নেই। তো! কিন্তু নতুন গাছ যে, সেটাই বা টনি বুঝবে কেমন করে?
নানান চিন্তায় জড়িয়ে পড়ছিল টনি। সোমেশ চ্যাটার্জির পাণ্ডুলিপিটায় ও বারবার চোখ বোলাল। তারপর সব কাগজপত্র সরিয়ে রেখে চোখ বুজে চেয়ারে বসে রইল।
ও মনে-মনে জিকো আর মউলির কথা ভাবতে লাগল।
