হারা এগিয়ে এসে ওদের পিঠে হাত রেখে বলল, তাছাড়া আমরা এখনও তো হান্ড্রেড পারসেন্ট শিয়োর নই যে, জিকো আর মউলি মারা গেছে।
টুনির চোখেও জল এসে গিয়েছিল। দোটানায় ওর মনটা দুলছিল। আজ যদি মউলির জায়গায় ওর কিছু একটা হত, আর বাকি বন্ধুরা পালিয়ে যেত, তা হলে টুনির কি সেটা ভালো লাগত? মোটেই না।
শান, টনি আর হারা টুনটুনির কাছে এসে মেঝেতে বসে পড়ল।
টনি হাত নেড়ে ওকে বোঝাতে চাইল, শোন, টুনি, এটা বোঝা গেছে যে, বাড়িটা পুরোপুরি সেফ। বাড়ির ভেতরে থাকলে কোনও ভয় নেই, রাইট?
টুনি মাথা নেড়ে সায় দিল, আলতো স্বরে বলল, রাইট।
সুতরাং, তুই কোনও অবস্থাতেই এ-বাড়ির বাইরে বেরোবি না। তা হলে তোর আর কোনও বিপদের ভয় নেই।
টনির এই যুক্তিটা শানের ভালো লাগল।
টনি আবার বলতে শুরু করল, আমার নেক্সট পয়েন্ট হল, দিনের আলোয় গোটা জায়গাটাই সেফ। মানে, বাইরে বেরোলে ওইরকম মিস্টিরিয়াস অ্যাটাকের কোনও ভয় নেই। কী রে, হারা, ঠিক বলছি? শান, তোর কী মনে হয়?
ওরা তিনজনেই বুঝল, টনির লজিকে কোনও ফাঁক নেই।
হারা বলল, ঠিক বলেছিস।
শান সায় দিয়ে মাথা নাড়ল, কারেক্ট।
তা হলে আমরা এমন কোনও হান্টিং অ্যানিম্যালের খোঁজ করব, যে শুধু অন্ধকারে অ্যাটিভ–!
সব হান্টিং অ্যানিম্যালই তো অন্ধকারে অ্যাকটিভ. টুনটুনি বাদ সাধল টনির নতুন যুক্তিতে।
টনি হেসে বলল, তুই যাদের কথা বলতে চাইছিস তারা দিনের বেলাতেও অ্যাটিভ। তা ছাড়া বাঘ, নেকড়ে বা হায়েনা রোজ একটা করে মানুষ মারে না। আরও একটা ব্যাপার আছে : এ-বাড়ি থেকে রাতে মানুষ বেরোতে পারে এই পসিবিলিটির কথা ভেবে এইসব জন্তু জানোয়ার কখনও জঙ্গল ছেড়ে ঘাস জমিতে এসে ওয়েট করবে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল টনি, হাতে হাত ঘসে বলল, আসলে আমি বলতে চাইছিলাম এমন একটা হান্টিং অ্যানিম্যালের কথা যে দিনের বেলায় পুরোপুরি ইনঅ্যাকটিভ বুঝেছিস?
এবার ওরা টনির কথাটা পুরোপুরি বুঝতে পারল।
সত্যিই তো, এর আগে তো ওরা যুক্তি সাজিয়ে ব্যাপারটাকে এমন করে ভাবেনি!
শান জিগ্যেস করল, এখন আমরা কী করব?
টনি বলল, একটা টেস্ট আপাতত ভেবেছি। দিনের বেলা এই টেস্টটা করা যাবে না– তাই রাতে করত হবে।
কী টেস্ট? হারা প্রশ্ন করল।
তুই আর শান একটা বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়। আশপাশের কোনও গ্রাম-টাম খুঁজে একটা মুরগি বা হাঁস কিনে নিয়ে আয়। রাতে ওটাকে বাইরে ছেড়ে দিয়ে দেখব কী হয়…।
একথা শুনে এ ওর মুখের দিকে তাকাল। তারপর শান ধীরে-ধীরে বলল, ও.কে.দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর আমি আর হারা বেরোচ্ছি। মনে হয়, হাঁস বা মুরগি পেয়ে যাব। না পেলে খরগোশ, পায়রা, বেড়ালছানা, যা তোক একটা কিছু নিয়ে আসব, তাই তো?
ইয়েস, টনি বলল, আর আমাকে সোমেশ চ্যাটার্জির বাকি পেপার্সগুলো স্টাডি করতে হবে– সেই সঙ্গে ল্যাবটাও–যদি কোনও ক্লু-টু পাওয়া যায়…।
টুনটুনি একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, ওপরের ঘরটায় একা-একা থাকতে আমার বাজে লাগে। মউলির মেমোরি খুব হন্ট করছে…।
শান ওকে বলল জিনিসপত্র নিয়ে নীচে ওদের ঘরে চলে আসতে। আজ রাতে আর ঘুমোনোর ব্যাপার নেই কারণ, রাতে অনেক কাজ।
শানের কথায় টুনি খানিকটা ভরসা পেল। ও শানকে সঙ্গে করে দোতলার রওনা হল। যেতে যেতে অনুযোগের সুরে ও বলছিল, মোবাইল ফোনে কোনও কানেকশান পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে কেন যে কোনও টাওয়ার নেই কে জানে!
.
আকাশ আজও মেঘলা। গোটা আকাশে কেউ যেন ছাই রঙের তুলি বুলিয়ে দিয়েছে। সেই ধূসর পটভূমিতে পায়চারি করছে আরও গাঢ় রঙের বাদল মেঘ।
জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল টনি। ভাবছিল, আজকের রাত আবার নতুন কোনও ঘটনা নিয়ে আসবে। ওরা চারজন যেন একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা। যে-বাসিন্দারা একে-একে উধাও হয়ে যাচ্ছে।
টুনির ঘটনা শোনার পর গতকালই ছাদের টবগুলোকে পরীক্ষা করেছে টনি। সেখানে ও সাতটা গাছ পেয়েছে যাদের মধ্যে লজ্জাবতী লতার ক্যারেকটার আছে। মানে, গাছের পাতা কিংবা ফুলে হাত দিলেই গাছটা নড়াচড়া করে রেসপন্ড করে। আজ রাতে গাছগুলোর ক্যারেকটার খুঁটিয়ে দেখবে টনি। বলা যায় না, হয়তো নতুন কোনও সূত্রের হদিস পাওয়া যেতে পারে।
টনির সামনে টেবিলে ছড়ানো সোমেশ চ্যাটার্জির কাগজপত্র। এগুলো নিয়ে ও পাগলের মতো পড়াশোনা করছে–যেন সামনে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা। একটা উত্তর ওকে খুঁজে বের করতেই হবে–আজ রাতের মধ্যেই।
যতই পড়ছে ততই যেন ব্যাপারগুলো মাথায় ঢুকছে টনির। কিন্তু ইংরেজিতে লেখা বলে বেশ কিছুটা অসুবিধে থেকেই যাচ্ছে।
হঠাৎই আলমারির একেবারে নীচের তাক থেকে একটা বড় বাঁধানো খাতা খুঁজে পেল টনি। খাতার বাঁধাইটা জীর্ণ হয়ে খুলে গেছে বলে খাতাটা লাল-সাদা সুতলি দিয়ে যোগচিহ্নের মতো করে বাঁধা। খাতার ধারগুলো পোকায় খেয়ে দিয়েছে।
ধুলো ঝেড়ে বাঁধন খুলতেই টনি বুঝতে পারল, খাতাটা আসলে একটা পাণ্ডুলিপি। মাংসাশী গাছ নামে বাংলায় একটা বই লিখতে শুরু করেছিলেন সোমেশবাবু।
লেখাটা খুব গোছানো নয়। খাপছাড়াভাবে নানান অংশ লিখে তারিখ দেওয়া। শেষ তারিখটা এক বছরেরও বেশ পুরোনো। সোমেশবাবু হয়তো ভেবেছিলেন, পরে মাঝের অংশগুলো লিখে পাণ্ডুলিপিটা সম্পূর্ণ করবেন, কিন্তু তার আর সময় পাননি।
