একতলায় নেমে এসে হালকা পা ফেলে বারান্দা পেরোল মউলি। তারপর আস্তে করে খুলে ফেলল সদর দরজা।
সদর দরজার দাঁড়িয়ে আলোর বিন্দুগুলো দেখতে পেল না মউলি। ঘাসের শিষের আড়ালে ওগুলো ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। একতলার ঘরের জানলা থেকে শান কিংবা টুনিরা ওই আলো দেখতে পেয়েছে কিনা কে জানে! তবে আলো দেখতে না পেলেও গন্ধটা পাওয়ার কথা অবশ্যই।
কিন্তু মউলি জানত না যে, তখন হারা, টনি বা শান কেউই জেগে নেই। ওরা পালা করে বাইরের মাঠের দিকে চোখ রাখছিল। এখন ছিল শানের পালা। কিন্তু শান নিজের অজান্তেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।
সুতরাং মউলি যখন সদর দরজা খুলে ঘাস জমিতে পা দিল তখন কোনও সাক্ষী ছিল না।
মউলিকে গন্ধটা টানছিল অনেকটা নিশির ডাকের মতো। সেই ডাকে ও ভুলে গেল জিকোর কথা। তাছাড়া সাহসের অহঙ্কার ওকে বাড়ির ভেতরে ধরে রাখতে পারল না।
বাইরে হাওয়া বইছিল। মউলির নাইটি অবাধ্য হয়ে উড়ছিল। সেটা সামলাতে-সামলাতে সামনের দিকে এগোচ্ছিল ও। কোথায় ওই আলোর ফুলকিগুলো?
বেশিক্ষণ ওকে খুঁজতে হল না। হঠাৎই ও ভীষণভাবে চমকে উঠল। ওর সারা শরীর পলকে অবশ হয়ে গেল।
কে যেন ঝাঁপিয়ে পড়েছে ওর ওপরে। কী অমানুষিক তার শক্তি!
মউলির শরীরটা লাট খেয়ে পড়ে গেল ঘাসের ওপরে। যন্ত্রণায় ও শিউরে উঠল। ধারালো নখে কেউ যেন চিরে ফালাফালা করে ফেলছে ওর দেহ। ওঃ!
মউলি চিৎকার করতে চাইল। কিন্তু চিৎকার করার জন্য হাঁ করতেই একটা নরম থাবা যেন এঁটে বসল ওর মুখের ওপরে।
অন্ধকারের মধ্যে ওকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চলল কেউ। ওকে নিয়ে খেলা করতে লাগল। একইসঙ্গে ওর রক্তাক্ত পোশাকগুলো কলার খোসার মতো ছাড়িয়ে নিতে চাইছিল।
মৃত্যুর মুহূর্তে মউলির ভীষণ ইচ্ছে করছিল এই শিকারিকে একবার দ্যাখে।
কিন্তু শিকারির বোধহয় দেখা দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না। তাই অন্ধকার যেন সত্যি-সত্যিই মউলিকে গ্রাস করল।
.
০৬.
হিস্টিরিয়ার রুগির মতো চিৎকার করছিল টুনটুনি। সে-চিৎকার কিছুতেই থামছিল না।
হারা, শান আর টনি সাধ্যমতো ওকে থামাতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু পারছিল না। চোখ বড় বড় করে হাত-পা ছুঁড়ে পাগলের মতো চিৎকার করছিল ও, এ-বাড়িতে আমি আর একটা সেকেন্ডও থাকব না। আমাকে তোরা এক্ষুনি কলকাতায় নিয়ে চল।
সকালে টুনটুনিই প্রথম দ্যাখে যে, মউলি নেই। তারপর জিকোর মতো ওর খোঁজ শুরু হয়– টয়লেটে, ছাদে, একতলায়, সিঁড়ির নীচে কিন্তু কোথাও ওকে পাওয়া যায়নি।
তখন হারা, টনি আর শান্তনু বাইরে বেরিয়ে মউলিকে খোঁজার কথা বলে। কিন্তু টুনি বাড়িতে একা থাকতে চায়নি। তাই শান আর বেরোয়নি বাড়ি থেকে। হারা আর টনি কাজে নেমে পড়েছে।
কোথা থেকে একটা লাঠি জোগাড় করেছিল টনি। আর হারা নিয়েছিল জিকোর হান্টিং নাইফ। এই দুটো অস্ত্র হাতে নিয়ে ওরা দুজনে বেরিয়ে পড়েছিল ঘাস-জমিতে।
তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওরা মউলিকে পায়নি। তবে জিকোর মতোই মউলির চিহ্ন পেয়েছে।
পাওয়া গেছে ওর রক্তাক্ত পোশাক, আংটি আর একটা রিস্ট ব্যান্ড। এদিক-সেদিকে ছড়িয়ে পড়ে ছিল।
সেগুলো হাতে নিয়ে হারা আর টনি বাড়িতে ঢুকতেই টুনির চিৎকার শুরু হয়ে গেছে। শান, হারা, টনি, কেউই আর চোখের জল রুখতে পারেনি। মউলি এত হাসিখুশি, উচ্ছল ছিল যে, ওর চলে যাওয়াটা সবাইকেই ধাক্কা দিয়েছে। তাছাড়া পাহারা দিতে বসে ঘুমিয়ে পড়ার ব্যাপারটা টনি, হারা আর শানকে অপরাধী করে রেখেছিল।
শান চোখের জল মুছে বলল, এইভাবে কি আমরা একে একে সবাই উধাও হয়ে যাব?
হারা চোয়াল শক্ত করে বলল, কিছুতেই না। ওদের আমরা খুঁজে বের করব। ফিরিয়ে আনব।
টনি সজল চোখে মাথা নাড়ল, বলল, না রে, ওদের বোধহয় আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তবে একটু চেষ্টা করলে মিস্ট্রিটা হয়তো সম্ভ করা যাবে। তাতে সুবিধে এই, ইন ফিউচার আর কেউ এভাবে…।
শান বলল, তুই মিস্ট্রি সলভ কর। আমি এ-বাড়িতে আর থাকতে চাই না। বাড়িটা অপয়া আমি আর টুনি বেরিয়ে পড়ছি। যদি আমরা কাল চলে যেতাম তা হলে এখন মউলি আমাদের সঙ্গে থাকত।
টনি ওর জায়গা ছেড়ে উঠে এল শানের কাছে। ওর চোখে চোখ রেখে বলল, চমৎকার। বন্ধুর উপযুক্ত কথাই বটে! ও. কে., একটা প্রশ্নের জবাব দে দেখি। মউলির বাড়িতে গিয়ে তুই কোন মুখে আঙ্কল আর আন্টির সামনে দাঁড়াবি? যখন ওঁরা জিগ্যেস করবেন, মউলি কোথায়, তখন কী উত্তর দিবি? জিকোর বাড়িতে গিয়েও বা তুই কী উত্তর দিবি? এবার ব্যঙ্গের খোঁচায় ধারালো হল টনির গলা, বলবি যে ওরা জঙ্গলে উধাও হয়ে গেছে, তাই আমরা ভয়ে পালিয়ে এসেছি। ডরপোক কঁহাকা!
এখানে আরও একটা রাত থেকে লাইফ রিস্ক কে নেবে? শান ঝঝিয়ে উঠল, তুই নিবি?
নেব। ঠান্ডা গলায় বলল টনি, কারণ, জিকো আর মলির যদি আমাদের ওপর কোনও দাবি থেকে থাকে তো সেটা হল, টু ফাইন্ড আউট হু ডিড ইট। নিজের বিবেককে জিগ্যেস করে দেখ, শান–এটা ওদের পাওনা। আজ জিকোর বদলে যদি তোর কিছু একটা হত, তা হলে কি আমরা চটজলদি পালিয়ে যেতাম? বুকে হাত রেখে বল তো, সেটা তোর ভালো লাগত?
কথা বলতে বলতে টনির চোখে জল এসে গিয়েছিল। মউলি আর জিকোর মুখটা ভেসে উঠছিল বারবার।
শান থমথমে আবেগে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ। হঠাৎই ও টনিকে জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল, বলল, তুই ঠিক বলেছিস। কাপুরুষ হলে আমাদের চলবে না।
