মাংসাশী গাছ।
তো?
না, ভাবছি এর সঙ্গে জিকোর ভ্যানিশ হওয়ার কোনও কানেকশান আছে কি না।
তুই কি বলতে চাস গাছ জিকোকে খেয়ে ফেলেছে? তা হলে ওকে খেয়ে গাছটা গেল কোথায়? জঙ্গলে পালিয়ে গেছে? নাকি ওই ঘাসগুলোই তোর মাংসাশী গাছ? হাত নেড়ে পাত্তা না দেওয়ার একটা ভঙ্গি করল হারা।
হারার কথায় যুক্তি ছিল। তাই দমে গেল টনি। কিন্তু সন্দেহের একটা কাটা ওর মনের ভেতরে খচখচ করতে লাগল।
ও সোমেশবাবুর কাগজপত্রগুলো আবার ঠিকঠাক করে গুছিয়ে রাখল। পরে সময় করে ও সোমেশবাবুর বাকি জিনিসপত্র ঘেঁটে দেখবে। যদি নতুন কোনও তথ্য পাওয়া যায়। কারণ, পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে আর কাউকে কিছু বলাটা ঠিক হবে না। তাই টনি হারাকে বলল, শোন, আমার এই আইডিয়ার কথা কাউকে এখন বলার দরকার নেই। বললে ওরা সবাই মিলে আমাকে চাটবে। আমি আরও একটু ইনভেস্টিগেট করে দেখি, তারপর…।
হারা ভালোমানুষের মতো ঘাড় নাড়ল। তারপর জানলার কাছে এসে নিরীহ ঘাসগুলোর দিকে চেয়ে রইল।
ওরা কি কখনও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে?
অন্য সময় হলে এ প্রশ্নের উত্তরে হারা হেসে উঠত। কিন্তু এখন হাসতে পারল না। টনির কথাগুলো ওর মনটাকে দুলিয়ে দিতে চাইছে।
.
ঘুম ভাঙতেই সুন্দর গন্ধটা মউলির নাকে ঢুকে পড়ল।
মউলি পারফিউম চর্চা করে বটে, কিন্তু এর আগে এত মিষ্টি মন-টানা গন্ধ কখনও ওর নাকে আসেনি। বড়-বড় শ্বাস টেনে গন্ধটাকে বুকের ভেতরে মিশিয়ে নিতে চাইল ও। মনে হল, এই গন্ধটা ওর প্রাণ ভরিয়ে দিচ্ছে।
ঘর গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। শুধু একটা খোলা জানলা দিয়ে ছায়াঅন্ধকার আকাশ দেখা যাচ্ছে। সারাদিনে আজ তেমন বৃষ্টি হয়নি। শুধু সন্ধের পর আধঘণ্টা মতন ঝিরঝিরিয়ে জল পড়েছে আকাশ থেকে।
ভালো করে কান পাতল মউলি। কোনও শব্দ কি শোনা যাচ্ছে?
নাঃ কোনও শব্দ কানে আসছে না। শুধু টুনটুনির শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। অথচ আগের দিন রাতে হারা কেমন যেন চাবুক মারার মতো শব্দ শুনেছে। যত্তসব আজগুবি ব্যাপার!
বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল মউলি। কিছুতেই আর ঘুম আসতে চাইছে না। মাথার ছোট ছোট চুলে বারকয়েক হাত চালিয়ে ও চলে এল দরজার কাছে।
এর মধ্যে অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছিল। তাই ঘুমন্ত টুনটুনির দিকে তাকিয়ে ওর ছোট্ট শরীরের আবছা হাইলাইট দেখা গেল। ও জেগে থাকলে মউলিকে কিছুতেই ঘরের বাইরে বেরোতে দিত না। মেয়েটা যা ভিতু! দড়িকে সবসময় সাপ বলে ভুল করে।
দরজা খুলে বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল মউলি। গন্ধটা যেন আরও তীব্র হয়েছে। কেমন যেন নেশার মতো টানছে। মউলির মনে হল গন্ধটা যেন ছাদের দিক থেকে আসছে। ছাদে যাওয়ার দরজাটা বন্ধ থাকলেও তার পাশের জানলাটা খোলা। হয়তো সেখান দিয়েই ঢুকে পড়েছে এই পাগল করা গন্ধটা।
ছাদের দিকে এগিয়ে গেল মউলি। দরজাটা সহজ ভঙ্গিতে খুলে ফেলল। না, ওর এতটুকুও ভয় করল না। নিজের সাহস নিয়ে বেশ একটু অহংকার আছে মউলির। ও সাইকেল চালাতে পারে, নিয়ম করে জিমে যায়, সাঁতার কাটে। সুযোগ পেলে পাহাড়ে ওঠার তালিম নেওয়ার সাধ আছে। সব সময়েই ওর মনে হয়, ছেলেদের চেয়ে ও কম কীসে!
দরজাটা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস মউলির প্রাণ জুড়িয়ে দিল। তার সঙ্গে অপরূপ গন্ধটা আরও তেজি হয়ে ওকে প্রায় নেশা ধরিয়ে দিল।
আকাশের ঘষা চাপা আলো হালকাভাবে ছাদে ছড়িয়ে পড়েছে। টবের গাছগুলোকে গাঢ় ছায়া বলে মনে হচ্ছে। সেই আঁধারে তারার মতো কয়েক টুকরো আলো ঝিকমিক করছে।
মউলি নিজের চোখকে ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। গাছের পাতায় রাত্রিবেলা জোনাকির মতো আলো জ্বলছে! নাকি সত্যি-সত্যিই ওগুলো জোনাকি পোকা? কিন্তু জোনাকির আলো হলে সেগুলো নড়েচড়ে বেড়াত। এই আলোর ফুলকিগুলো স্থির।
দুপুরের সেই অদ্ভুত গাছটার কথা মনে পড়ল মউলির। যে-গাছটার শুঁড় টুনটুনির আঙুল জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু সে-গাছটা তো আছে ওই দক্ষিণ দিকের কোণে! এখন আলো জ্বলছে উত্তর দিকের একটা গাছে।
আশ্চর্য! গাছগুলো কী বিচিত্র! টনির কাছে মউলি শুনেছে, এই বাড়ির মালিক সোমেশ চ্যাটার্জি গাছপালা নিয়ে গবেষণা করতেন, তার মধ্যে নাকি কার্নিভোরাস প্লান্টও রয়েছে। টবের ওই ছোট ছোট গাছগুলো কোন জাতের কে জানে!
ফুরফুরে বাতাস মউলির মুখে-চোখে আরাম বুলিয়ে দিল। মউলি আকাশের দিখে মুখ তুলে লম্বা শ্বাস টানল। আর ঠিক তখনই নীচ থেকে সপাৎ-সপাৎ শব্দ ভেসে এল।
তাড়াতাড়ি ছাদের পাঁচিলের কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ল মউলি। তাকাল নীচের ঘাস-জমির দিকে। আর তাকিয়েই ভীষণ অবাক হয়ে গেল।
নীচের জমিতে কোথাও কোথাও যেন দেওয়ালি শুরু হয়েছে। নানান জায়গায় দেখা যাচ্ছে আলোর ফুলকি। সেগুলো স্থিরভাবে জ্বলে রয়েছে একই জায়গায়।
চাবুক মারার মতো শব্দটা মউলিকে অতটা টানেনি। ওকে টানছিল গন্ধটা, আর ওই অদ্ভুত আলো। নীচের জমি থেকেই গন্ধটা আসছে বলে ওর মনে হল। নাঃ, নীচে গিয়ে ব্যাপারটা একবার দেখা দরকার।
মউলি ছাদ থেকে চলে এল বারান্দায়। পা টিপে টিপে নীচে নামতে শুরু করল। ও জানে, হারা, টনি আর শান একতলার ঘরে জেগে বসে আছে। জানলা দিয়ে অতন্দ্র চোখে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। মউলিকে দেখতে পেলে কিছুতেই ওরা বাইরে যেতে দেবে না। আর নিজেরাও এত সাবধানী, কিংবা ভিতু, যে বাইরে পা ফেলবে না।
