ড্রাইভারের সিটে যে বসেছিল সে গাড়ি ছেড়ে দিল। লোকটির মুখ সুচরিতার চেনা মনে হচ্ছিল, কিন্তু পাশ থেকে দেখে ঠিক ঠাহর করতে পারছিল না।
হঠাৎই পিছনদিকে মুখ ফেরাল লোকটি।
সঙ্গে-সঙ্গে খুশির বন্যায় ছলকে উঠল সুচরিতার আনন্দ ও কাঞ্চন, তুমি!
কাঞ্চন কোনও জবাব না দিয়ে হু-হু করে গাড়ি ছোটাতে লাগল।
এ কী! কাঞ্চন, কী হয়েছে তোমার? কথা বলছ না কেন? ব্যাকুল স্বরে প্রশ্ন করল সুচরিতা।
কাঞ্চন এবারও কোনও জবাব দিল না। গাড়ি ছুটতে লাগল ঝড়ের গতিতে।
সামনের সিটের দিকে ঝুঁকে পড়ল সুচরিতা। খামচে ধরল কাঞ্চনের জামা। তারপর হিস্টিরিয়া রুগির মতো চেঁচিয়ে উঠল, কাঞ্চন, কী ব্যাপার? কথা বলছ না?
সুচরিতা, তুমি ভয় পেলে? গম্ভীর স্বরে জবাব এল।
গাড়ি তখন ঝড়ের বেগে উল্কার মতো ধেয়ে চলেছে অজানার দিকে..।
.
শেষ দৃশ্য! বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এতক্ষণ ঘটে যাওয়া কবুতর নাটকের এটাই শেষ দৃশ্য।
কবুতরের লাইব্রেরি-ঘর। সেখানে আজ প্রায় সবাই হাজির হয়েছেন। মানেকজি, প্রসাদজি, সর্বেশ্বর রায়, নরসিংহ চৌধুরী, কিষাণ আপ্তে, ক্রসওয়ার্ড, তরুণ সান্যাল। ঘরে অনুপস্থিত কিরণ শর্মা, কাঞ্চন মৈত্র, সুচরিতা চৌধুরী এবং বরাবরের মতোই নয়না কল্যাণী তিনি সম্ভবত মরফিনে আচ্ছন্ন।
জেন্টমেন, আজ সব রহস্যই আমাদের কাছে পরিষ্কার। সমর বর্মনকে আমি খুঁজে পেয়েছি। কিষাণ বলছিলেন, আপনারা শুনলে হয়তো অবাক হবেন যে, সেই দুর্ধর্ষ তস্কর সমর বর্মন আর কেউ নয়–শ্রীকাঞ্চন মৈত্র!
ঘরে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। হতবাক দৃষ্টি মেলে সবাই তাকিয়ে রয়েছেন কিষাণ আপ্তের দিকে। তিনি তখনও বলে চলেছেন, মিস্টার ক্রসবির সঙ্গে আলোচনা করে আমি সবই জানতে পারি। ভেবে দেখুন কাঞ্চন মৈত্রের কথা। এই দিল্লিতে আসার আগে ইনি কী করতেন? কোথায় ছিলেন? ..কিছুই আমরা জানি না। চিঠিগুলো হারিয়ে যাওয়া এবং ফিরে পাওয়ার ব্যাপারটা দেখুন কী হাস্যকর। আসলে চিঠিগুলো উনি ডিকোড করতে পারছিলেন না। তাই যেমন করে তোক ওগুলোকে আবিষ্কার করলেন–তাও আবার নিজের ড্রেসিং টেবিলেই যাতে আমাদের দিয়ে ওগুলো ডিকোড করিয়ে নেওয়া যায়। কুমার রণজিতের মৃত্যুর ব্যাপারে তাঁর কথাগুলো ভেবে দেখুন। তিনি আসলে পৌনে একটায় হাজির হতে চেয়েছিলেন কবুতরে। হয়তো লাইব্রেরিটা খুঁজে দেখার ইচ্ছে ছিল। কোনও শব্দ-টব্দ পেয়ে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন কুমার রণজিৎ। লাইব্রেরিতে গেলেন–সমর বর্মনকে চিনে ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গুলি করলেন শ্রীমৈত্র। তারপর আমাদের কাছে একটা বানানো গল্প ছেড়ে দিলেন। সুচরিতা চৌধুরীর সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে তাকেও দলে টানলেন। মনে রাখবেন, বেশিরভাগ ঘটনাই কাঞ্চনবাবুর নিজের স্টেটমেন্ট। লাল পাঞ্জা নামে আদৌ যে কোনও গ্যাং আছে। তা আমি বিশ্বাস করি না। এরপর মিস্টার মৈত্র রিভলবারটা শ্রীরায়ের সুটকেশে পাচার করে দিলেন। সুড়ঙ্গ পথে ঢুকে আমরা একটা খুপরি দেখতে পাই। তাতে কিছু না পাওয়ায় শ্রীমৈত্র অত্যন্ত ডিসহার্টেন্ড হয়েছিলেন।
কিন্তু সমর বর্মন সম্বন্ধে আমি যতদূর শুনেছি, সে কখনও মানুষ খুন করেনি, দ্বিধাগ্রস্তভাবে জানালেন ক্রসওয়ার্ড।
ঠিক কথা। কিন্তু তখনকার অবস্থাটা একবার চিন্তা করে দেখুন আপনারা। আমি গোপনে তাকে অনুসরণ করে অনেককিছুই জানতে পারি–।
কিন্তু তিনি এখন কোথায়? সর্বেশ্বর রায় প্রশ্ন করলেন।
যেখানেই থাকুন না কেন, আমাদের লোক তাকে খুঁজে বের করবেই। দৃঢ়কণ্ঠে জানালেন ক্রসওয়ার্ড।
ঠিক এই সময় সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঘরে ঢুকলেন কিরণ শর্মা, কাঞ্চন মৈত্র ও সুচরিতা চৌধুরী। সঙ্গে সঙ্গে ক্রসওয়ার্ড এগিয়ে গেলেন কাঞ্চনের দিকে।
.
হাতে হাতকড়া লাগানো অবস্থায় বিস্ময়-বিমূঢ় চোখে একবার তাকালাম সকলের দিকে। বিষণ্ণ হাসি হেসে সুচরিতার দিকে চেয়ে বললাম, সু, তুমিও কি এসব বিশ্বাস করো?
বিশ্বাস না করতে পারলেই খুশি হতাম… সুচরিতার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
আমি মিস্টার মৈত্রকে পরীক্ষা করার জন্যে তার অনুচরের–নেপালী চাকরটা, যে কুমারের সঙ্গে এখানে এসেছিল সামনে ইচ্ছে করেই বাজে ঠিকানা লেখা একটা কাগজ ফেলে দিই। পরে দেখলাম, কাঞ্চনবাবু আমাকে ওটা দেখিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করেন। কিন্তু এর মধ্যে আশ্চর্য কী জানেন! ওই কাগজটা আমি পেয়েছিলাম কাঞ্চনবাবুর ঘর থেকেই ব্যঙ্গের হাসি হেসে থামলেন কিষাণ আপ্তে।
দাঁতে দাঁত চেপে আগুনঝরা দৃষ্টি মেলে আমি এগিয়ে গেলাম ক্রসওয়ার্ডের দিকে। বললাম, মিস্টার ক্রসওয়ার্ড, প্লিজ, ফর হেভেন্স সেক–এই হাতকড়াটা কিছুক্ষণের জন্য খুলে দিন।
কী ভেবে ক্রসওয়ার্ড আমার অনুরোধ রাখলেন। আমি ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেলাম কিষাণ আপ্তের দিকে। তার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, মিস্টার জেড, আমার নামে কেউ মিথ্যে কথা বললে আমি একেবারে সহ্য করতে পারি না। সুরেন্দ্র পালিত তার স্মৃতিকথায় একটা কথা ঠিকই লিখেছিলেন–তা হল– বলে আমি জেডের কানের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম, মানুষ নিজের কান কখনও চেঞ্জ করতে পারে না। পরের মুহূর্তেই এক বিরাশি সিক্কার চড় মেরে তাঁকে মেঝেতে ফেলে দিয়ে বললাম, এটা আপনার মিথ্যে কথা বলার শাস্তি। ক্রসওয়ার্ডের দিকে ফিরে বললাম, ব্যস্ত হবেন না, ইন্সপেক্টর–এই হল আপনাদের ভাষায় দুর্ধর্ষ সমর বর্মন!
