.
০৫.
টনি আর হারা একতলার ঘরে বসে জিকোর কথা আলোচনা করছিল। ফুটবল, ক্রিকেট, পড়াশোনা আর বেড়ানো নিয়ে যত সব পুরোনো স্মৃতিকথা। যেসব কথা বহুদিন মনে পড়েনি সেসব কথাও আজ স্পষ্ট মনে পড়ে যাচ্ছে। যেন কেউ স্মৃতিকথার বাক্সের ঢাকনা খুলে ফেলেছে একটানে।
কথা বলতে-বলতে জানলার কাছে গেল টনি। বাইরে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর হারার দিকে ফিরে বলল, কাল রাতের ওই পিকিউলিয়ার সাউন্ডটা আর-একবার ডেসক্রাইব করতো।
হারা শব্দটার চরিত্র সাধ্যমতো বর্ণনা করার চেষ্টা করল।
টনিও খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করল। বারবার জানতে চাইল, শব্দ ছাড়া আর কোনও অদ্ভুত ব্যাপার ও টের পেয়েছে কি না। উত্তরে হারা মাথা নেড়ে না বলল বটে, কিন্তু ওর মধ্যে একটা দোনামনা ভাব ছিল।
সেটা লক্ষ করে টনি আবার ওকে চাপ দিল। বলল, ভালো করে ভেবে বল। এর ওপর আমাদের বাঁচা-মরা ডিপেন্ড করছে।
হারা তখন আমতা-আমতা করে বলল, বলছি কিন্তু ব্যাপারটা আমার মনের ভুলও হতে পারে। আমি..মানে…ঠিক শিয়ের না…কিন্তু…
ওসব ইয়ে ছেড়ে বলে ফেল…।
শব্দের সঙ্গে-সঙ্গে পারফিউমের মতো একটা গন্ধ পেয়েছিলাম খুব হালকা মিষ্টি গন্ধ। গন্ধটা পেয়ে বেশ অবাক লেগেছিল।
কেন?
কারণ, মউলি বা টুনি ওই পারফিউম লাগায় না। ওদেরটা অন্যরকম…।
তারপর?
তারপর আর কী! আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল–শুয়ে পড়েছি।
এরপর টনি ভাবতে বসল। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ ধরে ভেবেও কোনও কুল পেল না।
ঘরের একপাশে বেঢপ মাপের টেবিল। টেবিলে কাগজের গাদা। তার পাশে একটা কলমদানিতে তিনটে বলপয়েন্ট পেন।
টেবিলের ঠিক পাশেই বিশাল আলমারিটা। বই আর কাগজপত্রে ঠাসা। আলমারির পাল্লার কাচগুলো ময়লা পড়ে ঘোলাটে হয়ে গেছে। দুটো পাল্লায় পুরোনো আমলের দুটো পিতলের কড়া লাগানো।
বাড়িওয়ালার জিনিসপত্রের সঙ্গে ওদের মালপত্র রেখে বসবার ঘরটা এখন একেবারে গোডাউনের চেহারা নিয়েছে।
আলমারি আর টেবিলের কাগজপত্র-বইয়ের দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিল টনি। আচমকা ও বলে উঠল, অ্যাই হারা, চল তো, ওই পেপার্সগুলো ঘেঁটে দেখি–যদি কোনও ক্ল পাওয়া যায়…।
টনির প্রস্তাবে হারা তেমন উৎসাহ পেল না। এখন আবার ওই কাগজপত্রের ধুলো আর ময়লা ঘাঁটতে হবে!
কিন্তু টনিকে থামায় কে! আগামী দিনের বিজ্ঞানী বলে কথা! ও চট করে চলে গেল টেবিলের কাছে। একপাশে পড়ে থাকা হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারটা টেবিলের কাছে টেনে নিয়ে বসে পড়ল। মাইনাস পাওয়ারের চশমাটা চোখ থেকে খুলে হারার দিকে ফিরে ওকে ইশারায় ডাকল টনি? কীরে, আয়।
হারা অনিচ্ছায় পা ফেলে ধীরে-ধীরে এগিয়ে এল টনির কাছে।
টনি ততক্ষণে চশমাটা টেবিলের একপাশে রেখে কাগজপত্রের একটা গোছা সামনে টেনে নিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করেছে।
কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে টনি আর হারার মাথায় কিছু ঢুকছিল না। কারণ, বেশিরভাগ পৃষ্ঠাতেই দুর্বোধ্য সব জটিল অঙ্ক কষা। আর কোনও-কোনও পৃষ্ঠায় নানান রাসায়নিক যৌগের নাম আর তাদের নিয়ে সমীকরণ।
টনি আর হারা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল আর একে-একে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উলটে যেতে লাগল।
হঠাৎই একটা পৃষ্ঠায় পৌঁছে টনি দেখল আর অঙ্ক বা রাসায়নিক সমীকরণ নয়, বরং ইংরেজিতে কত কী লেখা রয়েছে। তার মধ্যে প্লান্ট গ্রুপিং হেডিংটা টনির চোখ টানল। তার নীচে এক দুই-তিন-চার করে নম্বর দিয়ে কতকগুলি শব্দ লেখাঃ
1. Serracenia
2. Nepenthes
3. Darlingtonia
4. Drosera
5. Pinguicula
6. Utricularia
7. Diomea
8. X (?)
আট নম্বরে লেখা X এবং তার পাশে জিজ্ঞাসার চিহ্নটা দেখে টনির ভুরু কুঁচকে গেল।
আরও কয়েক পৃষ্ঠা ঘেঁটে দেখার পর টনির মনে হল ভদ্রলোক গাছপালা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। দোতলার ছাদে যে অতগুলো টব আর তাতে অতরকম গাছ–এখন মনে হচ্ছে ওটা স্রেফ শখের বাগান নয়, একতলার ল্যাবরেটরির একটা অংশ।
আরও কাগজপত্র ঘেঁটে টনি বেশ কিছু গাছের ছবি দেখতে পেল, তার সঙ্গে কয়েকটা ফুলের ছবি। সব ছবিই হাতে আঁকা। আর ছবির নানা অংশের দিকে তীরচিহ্ন দিয়ে নানান মন্তব্য লেখা।
বেশ কয়েক বান্ডিল কাগজ হাতড়ে দেখার পর আলমারি থেকে কয়েকটা বই নামিয়ে নিল টনি। ও আর হারা হাত দিয়ে চাপড় মেরে বইগুলোর ধুলো ঝাড়ল। তারপর একে-একে বইগুলো দেখতে লাগল।
বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় বইয়ের মালিকের নাম লেখা : সোমেশ চ্যাটার্জি। হাতের লেখা দেখে বোঝা গেল, হাতে লেখা কাগজপত্রগুলো ওঁরই। সুতরাং আন্দাজ করা যায় তিনিই এ-বাড়ির মালিক।
বইগুলো সবই গাছপালা নিয়ে। কারণ, বইগুলোর নাম সেরকমই। যেমন, একটার নাম প্লান্ট লোকোমোশান, আর-একটা বইয়ের নাম কার্নিভোরাস প্লান্ট, এ ছাড়া প্লান্ট রিপ্রোডাটিভ সিস্টেম আর ডাইজেস্টিভ এনজাইমস ইন প্লান্টস নামেও দুটো বই রয়েছে।
হারা বলল, টনি, বোঝা যাচ্ছে, এই সোমেশ চ্যাটার্জি ভদ্রলোক ছিলেন বোটানিস্ট। গাছপালা নিয়ে ছিল ওঁর যত কারবার। ওঁর ল্যাবরেটরিটা দেখেও সেরকম ইমপ্রেশান হয়।
টনি হারার কথায় ছোট্ট করে হু বলল। ওকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল, ওর মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরছে।
ও হঠাৎ হারার দিকে তাকাল, বলল, কার্নিভোরাস প্লান্টস মানে জানিস?
হারা মাথা নাড়ল? না জানি না।
