টুনি উবু হয়ে বসে অবাক চোখে দেখছিল। কারণ, একসঙ্গে এতগুলো অচেনা গাছ ও কখনও দেখেনি। গাছের শখ মেটানোর টানে ও বেশ কয়েকটা বই কিনেছে–তাতে ছবিও আছে অনেক। কিন্তু সেই ছবিগুলোর একটাও এই গাছগুলোর সঙ্গে মিলছিল না।
ছাদের যেদিকটায় টবগুলো রাখা আছে সেদিকটা শ্যাওলা ঢাকা। টবগুলোও কালচে-সবুজ শ্যাওলায় মলিন। কিছু কিছু টব ফাটা, ভাঙাচোরা। ভাঙা টবের কয়েকটা গাছ হেলে গেছে। আবার কয়েকটা গাছ লতিয়ে বেরিয়ে এসেছে বাইরে।
মউলি বলল, কী রে, কয়েকটা গাছ নিয়ে যাবি নাকি?
টুনি ওর দিকে তাকিয়ে মলিন হাসল ও নিয়ে গেলে মন্দ হয় না। গাছগুলো বেশ রেয়ার– আগে কখনও দেখিনি।
শান ওদের কাছে এল। একটা গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওই গাছটা নিয়ে চল– ব্যাপক দেখতে।
শানের দেখানো গাছটার দিকে তাকাল টুনটুনি আর মউলি। ওদের কাছ থেকে তিনটে টবের পিছনে রয়েছে গাছটা। মাঝারি মাপের সবুজ পাতা। আর তারই ফাঁকে-ফাঁকে ফুটে রয়েছে লম্বা লম্বা সবুজ ফুল। ফুলের চারপাশে ছোট-ছোট হলুদ রোঁয়া। আর প্রতিটি ফুলের নীচের সুতোর মতো সরু কয়েকটা করে শুঁড় ঝুলছে।
গাছটা টুনির মনে ধরল। ও দুটো টবের ফাঁকে শ্যাওলা ধরা মেঝেতে বাঁহাতের ভর দিল। তারপর ডানহাতটা বাড়িয়ে দিল একটা সবুজ ফুলের দিকে।
সবুজ ফুল ওরা আগে কখনও দেখেনি। ফুলগুলো যেন সবুজ পাতার সঙ্গে মিশে গেছে। টুনি হাত বাড়িয়ে একটা ফুল ছিঁড়তে গিয়েছিল। কিন্তু ফুলের নীচে গাছটার গায়ে ওর আঙুলের ছোঁয়া লাগতেই একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল।
সুতোর মতো সরু চারটে শুঁড় চোখের পলকে টুনির আঙুল জড়িয়ে ধরল। পাকের পর পাক দিয়ে জড়িয়ে গেল লাটাইয়ের সুতোর মতো।
টুনি আঃ! শব্দ কর এক হ্যাঁচকা টানে হাতটাকে ফেরত নিয়ে এল। শুঁড়গুলো ছিঁড়ে এল গাছের কাণ্ড থেকে।
শান আর মউলি চমকে উঠল। মউলি টুনিকে জাপটে ধরে টেনে নিয়ে এল টবগুলোর কাছ থেকে।
শুঁড়গুলো তখনও টুনির ডানহাতের আঙুলে জড়িয়ে রয়েছে। আর সবুজ কেঁচোর মতো অল্প-অল্প নড়ছে।
টুনির গা ঘিনঘিন করে উঠল। ও হাতটা ঝাড়া দিতে লাগল বারবার। ওর গলা চিরে চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
শান চট করে চলে এল ওর কাছে। ওর পাশটিতে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। তারপর পোকামাকড় ঝেড়ে ফেলার ঢঙে টুনির আঙুল থেকে ছেঁড়া শুঁড়গুলো ছিটকে ফেলে দিল।
মেঝেতে পড়েও শুঁড়গুলো নড়তে লাগল। ওরা তিনজন তাড়াতাড়ি কয়েক হাত পিছিয়ে গেল।
যন্ত্রণায় আকুলিবিকুলি করা মিনি লাউডগা সাপের মতো সবুজ শুঁড়গুলো মোচড়াতে লাগল, পাক খেতে লাগল। যেন প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ছটফট করছে।
একটু পরেই শুঁড়গুলো স্থির হয়ে গেল।
টুনি ভয়ের গলায় বলে উঠল, এ কীরকম গাছ রে বাবা! হরিবল!
মউলি ওর আঙুলের ওপরে ঝুঁকে পড়ে বলল, তোর আঙুলে কিছু হয়নি তো!
না, সেরকম কিছু হয়নি–শুধু আঙুলগুলো একটু চুলকোচ্ছে। এই বলে ওড়না দিয়ে আঙুলগুলো ভালো করে ঘষে ঘষে মুছতে লাগল টুনি।
শান এদিক-ওদিক খুঁজে একটা শুকনো কাঠি জোগাড় করল। তারপর সেই কাঠিটা এগিয়ে ধরল সবুজ ফুলগুলোর সামনে। ফুলের গোড়ায় খোঁচা দিল।
কিন্তু কিছুই হল না।
এবারে শুঁড়ের গায়ে কাঠি ছোঁয়াল শান। কিন্তু শুঁড়গুলো মোটেই কাঠিটাকে জড়িয়ে ধরল ।
শান অবাক হয়ে বলল, স্ট্রেঞ্জ! টুনির আঙুলের বেলায় টেন্ট্যাক্সগুলো চিতাবাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অথচ এই কাঠিটার বেলায় কেমন কোল্ড…।
মউলি গাছটার দিকে তাকিয়ে ছিল। বলল, রিয়েলি স্ট্রেঞ্জ। অন্য গাছগুলো একটু নেড়েচেড়ে দেখবি নাকি?
কী দরকার? টুনি বলল।
শান কাঠিটা ছুঁড়ে ফেলে দিল ছাদের এককোণে। ছাদের পাঁচিলের কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে তাকাল নীচের দিকে।
ঘাসের কার্পেট ছন্নছাড়াভাবে ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। কোথাও ভয়ের কোনও নাম-গন্ধ নেই। এমনকী লম্বা-লম্বা ঘাস আর আগাছার মধ্যে অন্য কোনও অদ্ভুত গাছও চোখে পড়ছে না।
ছাদের ছোট্ট টবে যে-ভয়ংকর গাছ ওরা এইমাত্র আবিষ্কার করল, সেরকম কোনও শিকারি গাছ যদি লুকিয়ে থাকে ওই ঘাসজমিতে। কিংবা জঙ্গলের ভেতরে! হয়তো ওরা শিকারি পশুর মতো চলে বেড়ায়। শিকার দেখলেই অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
শান্তনু শিউরে উঠল। ওর কবি-মন কল্পনায় কল্পনায় অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
ও ফিরে তাকাল টুনি আর মউলির দিকে। মেজাজটা হালকা করার জন্য টুনিকে জিগ্যেস করল, কী রে, একটু আগে বলছিলি যে, ওই গাছের চারা নিয়ে যাবি নাকি কলকাতায়?
রক্ষে করো! প্রায় আঁতকে উঠে বলল টুনি, ওই রাক্ষুসে গাছ লাগালে আমার বাকি গাছ সব সাবাড় হয়ে যাবে।
এরপর ওরা দোতলার ঘরে গিয়ে ঢুকল। সকলের মন ভালো করার চেষ্টায় শান্তনু কয়েকটা কবিতা শোনাল। মউলি ওর স্কুলের ফেস্ট-এর গল্প শোনাল। আর টুনি শোনাল আমেরিকার গল্প। ওর কাকা সদ্য ফিরেছেন ও-দেশ থেকে। ওঁর কাছ থেকে শোনা গল্পগুলো দারুণ থ্রিলিং আর ইন্টারেস্টিং। কারণ, টুনির কাকা জিয়োলজিস্ট-ও-দেশে গিয়ে কয়েকটা অভিযান চালিয়েছেন।
কিন্তু ওদের গল্প মোটেই জমছিল না। জিকো বারবার এসে হাজির হচ্ছিল ওদের মাঝখানে। ওদের ডেকে বলছিল, কী রে, আমাকে খুঁজে বের করবি না?
ওদের গল্পের তাল কেটে যাচ্ছিল।
একটু পরেই ওদের সব গল্প কোনও ম্যাজিকে ফুরিয়ে গেল। ওর মাথা নীচু করে চুপচাপ বসে রইল।
