শান একপাশে চুপচাপ বসে জোয়ান চিবোচ্ছিল আর চোয়ালে আঙুল চালাচ্ছিল। ও শান্ত গলায় বলল, মউলি, তোর আর টনির কথার সঙ্গে আমি আরও কয়েকটা মিস্ট্রি অ্যাড করছি। আংটিটা যেই জিকোর আঙুল থেকে খুলে নিক না কেন এটা শিয়োর যে, জিকো তখন উল্ডেড– কারণ, আংটির গায়ে রক্তের ছিটে।…এরপর আসা যাক জামা কাপড়ে। ড্রেসগুলো রক্তে এমন মাখামাখি যে, স্পষ্ট বোঝা যায়, জিকো তখন সাংঘাতিক উন্ডেড–হয়তো বেঁচে ছিল না এমনও হতে পারে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মনোযোগী মুখগুলোকে দেখল শান। তারপর? এখন মিস্ত্রি হল, ঘাসে বা মাঠে কোথাও একফোঁটা রক্ত নেই কেন?
সবাই চুপ করে রইল।
একটু পরে হারা বলল, মে বি বৃষ্টির জলে সব ধুয়ে গেছে।
ধুয়ে যাবেটা কোথায়? গম্ভীর ভাবে জানতে চাইল টনি, আমি পা দিয়ে খুঁচিয়ে ঘাসের গোড়াগুলো ভালো করে দেখেছি। আংটির জায়গাতে কোনও রক্তের দাগ ছিল না, কিংবা জামাকাপড়ের আশেপাশেও কোনও দাগ-টাগ পাওয়া যায়নি। এই ব্যাপারটা দারুণ মিস্টিরিয়াস।
তা হলে কি আকাশপথে কোনও প্রাণী এসে জিকোকে অ্যাটাক করেছে? ওকে শূন্যে তুলে নিয়ে খতম করে তারপর রক্ত চুষে খেয়েছে? একেবারে ইংলিশ হরার মুভির মতো?
কথাগুলো বলেছে মউলি। হারা সঙ্গে-সঙ্গে ওকে হাত তুলে থামতে ইশারা করেছে। বলেছে, প্লিজ, মউলি–আমার ভালো লাগছে না। গা গুলিয়ে উঠছে।
মউলি সিরিয়াস গলায় বলল, আমি এসব বলছি এইজন্যে যে, এগুলো অ্যাবসোলিউটলি অ্যাবসার্ড। আর সেইজন্যেই আমার মনে হচ্ছে, মে বি জিকো ইজ স্টিল অ্যালাইভ। হয়তো উন্ডেড…কিন্তু বেঁচে আছে।
বাকি চারজনের মুখের দিকে তাকিয়ে মউলি বুঝতে পারল, ওরা ওর কথা বিশ্বাস করতে চাইছে, অথচ ওদের চোখে অবিশ্বাসের ছাপ ফুটে উঠেছে।
টনি হাত তুলে ইশারা করে সকলের মনোযোগ চাইল। তারপর ধীরে-ধীরে বলল, অনেক তো আলোচনা হল…এবার লাখ টাকার প্রশ্নটা করি। তোমরা কেউই এই প্রশ্নটা করোনি। অথচ এটাই সবচেয়ে ভাইটাল কোশ্চেন… একটু থামল টনি। চশমার কাচের আড়াল থেকে উৎসুকভাবে দেখল সবাইকে। তারপর নিজেই মুখ খুলল, বলতে পারো, জিকো চিৎকার করেনি কেন? কোনও জন্তু-জানোয়ার অ্যাটাক করলে সেটাই তো ছিল স্বাভাবিক।
ওরা সবাই চুপ।
সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটা এতক্ষণ কারও মনে আসেনি, সত্যিই তো, জিকো চিৎকার করেনি কেন? তা ছাড়া ধস্তাধস্তির কোনও শব্দও কেউ শুনতে পায়নি।
মউলি হঠাৎই বিষণ্ণ থমথমে ভাবটা কাটিয়ে একলাফে উঠে দাঁড়াল ৪ টনির কোশ্চেনটা আমার থিয়োরিকেই সাপোর্ট করছে। মানে, পুরো ব্যাপারটাই অ্যাবসোলিউটলি অ্যাবসার্ড। সো, লেট আস তোপ জিকো এখনও বেঁচে আছে। সুতরাং শান, উই আর স্টেয়িং টুডে-ও.কে.?
শান মাথা নেড়ে বলল, আমার তো সেটাই ইচ্ছে…।
টনি বলল, আমারও।
হারা ঠোঁট উলটে বলল, আমার কোনও আপত্তি নেই।
টুনটুনি করুণ চোখে চার বন্ধুর দিকে তাকাল। তারপর মিনমিন করে বলল, আমি একা আর কোথায় যাব।
শান বলল, ও. কে, তা হলে আজ আমরা থাকছি। কাল কলকাতা ফিরে যাচ্ছি। এই থাকার ব্যাপারে কয়েকটা পয়েন্ট সবাইকে বলে দিই। আমাদের হান্ড্রেড পারসেন্ট কেয়ারফুল থাকতে হবে। রাতে আমরা কেউই বাইরে বেরোব না কিছুতেই না। আর আমি, টনি আর হারা জানলা দিয়ে বাইরেটা ওয়াচ করব। দরকার হলে রাত জাগব। কী, টনি ঠিক আছে? হারা, ও.কে.?
টনি আর হারা মাথা নেড়ে সায় দিল।
শান বলল, তা ছাড়া দিনের বেলাতেও বাইরে না বেরোনোই ভালো। অ্যাজ সাচ বাইরে বেরোনোর তো কোনও দরকার নেই। স্টিল যদি কেউ বেরোয় তা হলে সবাইকে জানিয়ে বেরোবে।
এরপর ওদের জমায়েতটা ভেঙে গেল।
টুনি আর মউলি দোতলায় উঠে এল। ঘরে না ঢুকে ওরা ছাদে এসে দাঁড়াল। শান্তনুও কখন যেন এসে দাঁড়াল ওদের পাশে।
এখন দুপুর হলেও চারপাশটা শীতের শেষ বিকেলের মতো ঠান্ডা ধূসর। আকাশে ঘোলাটে মেঘ। মেঘ আর-একটু গাঢ় হলেই আবার বৃষ্টি নামতে পারে।
যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। গ্রাম যদি দূরে কোথাও থেকে থাকে তা হলে সবুজ তাকে আড়াল করে দিয়েছে।
প্রশান্ত ভেজা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে শান ভাবছিল প্রকৃতি সত্যিই রহস্যময়। কোথা থেকে আচমকা বৃষ্টি ঢেলে দিয়ে ওদের ছজনকে এক জটিল রহস্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তার মধ্যে একজন এখন আবার নেই।
ওরা যাচ্ছিল পত্রসায়রের দিকে। অথচ এখন পড়ে রইল পত্ৰসায়র–চলে এল অচেনা এক গ্রামে। এমন এক অদ্ভুত গ্রাম যেখানে একটি মাত্র বাড়ি। সেটাও আবার সিমেন্ট-বালি দিয়ে তৈরি।
বাড়িটা এত পুরোনো আর ভাঙাচোরা যে, আলো-টালো না থাকলে দিব্যি ভূতুড়ে বাড়ি বলে চালিয়ে দেওয়া যেত। বাড়িটার মালিকও বেশ অদ্ভুত। আলো জ্বেলে দরজা খুলে রেখে সে উধাও জিকোর মতো। কিন্তু সেটা হয়তো বিজ্ঞানীর খেয়াল। জিকোর মধ্যে তো সেরকম খামখেয়ালি ব্যাপার ছিল না!
শান এসব ভাবছিল আর জিকোর জন্য দুঃখ পাচ্ছিল। এরকম একটা জায়গায় কত কবিতার লাইন মনে আসার কথা, অথচ একটাও মনে আসছে না। তার বদলে একটা চাপা কষ্ট বুকের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
টুনি ঝুঁকে পড়ে টবের গাছগুলো দেখছিল। ও গাছের ভক্ত হলেও এই গাছগুলো ঠিক চিনে উঠতে পারছিল না। কোনও গাছই এক-দেড় ফুটের চেয়ে লম্বা নয়। তার মধ্যে কয়েকটা আবার লতানে গাছ। কোনও গাছের পাতা ছোট মাপের, কোনওটার-বা আবার বড়। এক-একটা গাছে ফুটে আছে ছোট-ছোট রঙিন ফুল।
