শান আর মউলির দিকে একপলক তাকিয়ে হারা ছুটল বাড়ির দিকে। ভেজা ঘাস-জমিতে ছপছপ শব্দ হল।
বাইরে কোথাও অ্যাডভেঞ্চারে বেরোলে জিকো সবসময় ওর শখের একটা হান্টিং নাইফ সঙ্গে নিত। এবারেও সেটা নিতে ভোলেনি।
ঘর থেকে ছুরিটা নিয়ে আসার সময়ে হারার মনে হল, রাতে বেরোনোর সময় জিকো যদি ছুরিটা সঙ্গে নিয়ে বেরোত তা হলে বোধহয়…।
সদর দরজায় হারাকে দাঁড় করিয়ে টুনটুনি প্রশ্নে-প্রশ্নে ওকে জ্বালিয়ে মারছিল। জিকোর আংটির কথা শুনে ও কেঁদে ফেলল।
হারা ওর পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা দিল। বলল, আমরা এখনও সার্চ করে যাব। হয়তো দেখব জিকো স্লাইটলি উন্ডেড হয়ে জঙ্গলে পড়ে আছে। লেট আস হোপ…।
হারা দৌড়ে চলে এল মউলিদের কাছে।
ওরা আবার শুরু করল ওদের খোঁজ।
খুঁজতে খুঁজতে ঘাস আর আগাছার এলাকা ছাড়িয়ে ঢুকে পড়ল জঙ্গলের মধ্যে। হারার হাতে বাগিয়ে ধরা হান্টিং নাইফ। ওর দুপাশে টনি আর শান্তনু। পিছনে মউলি।
কিন্তু বহু খোঁজ করেও ওরা কিছু পেল না। হতাশ হয়ে বেরিয়ে এল জঙ্গল থেকে। ওদের পিছন থেকে ভেসে আসছিল নাম-না-জানা পাখির ডাক।
শান হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছছিল বারবার।
মউলি বড়-বড় শ্বাস ফেলছিল। ওর মুখ থমথমে। ভয়ের চোখে বারবার এপাশ-ওপাশ দেখছিল।
হারার কপালে ভাঁজ। ওর চোখ হায়েনা কিংবা নেকড়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।
টনি চোখা নজরে ঘাসের দিকে তাকিয়ে অনুসন্ধানের কাজ চালাচ্ছিল। ওর মন বলছিল জিকোর আরও কোনও চিহ্ন কোথাও না-কোথাও অবশ্যই পাওয়া যাবে।
শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল।
লম্বা-লম্বা ঘাসের ফাঁকে জিকোর ছিন্নভিন্ন গেঞ্জি আর পাজামা পাওয়া গেল। ছেঁড়া পোশাকগুলো এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। রক্তে, জলে, কাদায় মাখামাখি।
পোশাকগুলো শুধু যে শতছিন্ন তাই নয়–সেগুলোর গায়ে রক্তের ছাপ। আর সেই পোশাক থেকে আঁশটে গন্ধ বেরোচ্ছে।
ওরা চারজন ভীষণ ভয় পেল। শান পোশাকগুলো বুকে জড়িয়ে ডুকরে উঠল।
মউলি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল ভেজা জমিতে।
হারা বিভ্রান্তের মতো স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে।
আর টনি শানকে জাপটে ধরে ওর গায়ে মাথা এলিয়ে দিয়েছে। ওর চোখের কোণে জল।
কিছুক্ষণ পর নিজেদের সামলে নিয়ে ওরা বাড়ির দিকে ফিরে চলল। কিন্তু সংশয়ের খোঁচা থেকেই গেল। জিকোর যে সত্যি-সত্যি কী হয়েছে সেটা যেন ঠিক বুঝে ওঠা যাচ্ছিল না। ওরা সেই রহস্য নিয়েই আলোচনা করছিল। বুঝতে চাইছিল রহস্যের সমাধানটা। কিন্তু মাথা গুলিয়ে যাচ্ছিল।
.
০৪.
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর হারা একটা সিগারেট ধরিয়েছিল। ও মাঝে-মাঝে লুকিয়ে সিগারেট খায়। তবে এখন সিগারেট ধরিয়েছে জিকোর ব্যাপারটা সামলে নিয়ে সহজ হওয়ার জন্য।
ওকে সিগারেট ধরাতে দেখেই টুনি নাক কুঁচকে ওর কাছ থেকে দূরে সরে বসল।
শান বলল, হারা, তুই যে কেন জোর করে এই নেশাটা ডেভেলাপ করছিস কে জানে! সাধ করে ক্যানসারকে কেউ ইনভাইট করে না।
হারা সিগারেটে টান দিয়েই কয়েকবার কেশে উঠল। কাশি থামলে পর বলল, না রে, আমি নেশা ডেভেলাপ করব না। একটু প্র্যাকটিস করেই ছেড়ে দেব। জিকোর কিন্তু কাশি হত না…।
আবার ঘুরে ফিরে সেই জিকো!
আজ সকাল থেকে কতবার যে জিকোর নাম এসে পড়ল কথায় কথায়।
টনি বোধহয় বাথরুমে গিয়েছিল। ঘরে ঢুকেই শানকে জিগ্যেস করল, কী রে, কী ঠিক করলি? আমরা কি রওনা হচ্ছি, না থাকছি?
শান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে ইশারায় ওকে কাছে ডাকল ও আয়, বোস। সেটাই এখন ডিসকাস করব।
টনি এসে বসে পড়ল ওদের মাঝে।
শান একটু ভারী গলায় বলল, শোনেনা সবাই। যদি আমরা এখন রওনা দিই তা হলে রাত নটার মধ্যে কলকাতা পৌঁছে যাব। আর যদি জিকোর ব্যাপারটা নিয়ে আর একটু ইনভেস্টিগেট করে দেখতে চাই তা হলে আজ নয়, কাল সকালে স্টার্ট দিতে পারব।
টুনটুনি বলল, এখানে কোনও টাওয়ার নেই। মোবাইলে কলকাতার কানেকশান পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা পুলিশে…।
টনি ওর কথার ওপরে কথা বলে উঠল, হা, সেইজন্যেই আমরা পুলিশে কোনও খবর দিতে পারছি না। আর এখানে লোকাল থানা কোথায় কে জানে!
একটু থেমে টনি আবার বলল, জিকো যে… আর নেই…সেটা নিয়ে আমার কয়েকটা খটকা আছে–
মউলি বলল, আমারও। ও. কে., তুই আগে বল–।
টুনটুনি একটা কৌটো থেকে জোয়ান নিয়ে সবাইকে বিলি করছিল। ও বিড়বিড় করে বলল, যদি থেকে যেতে হয় তা হলে আজকের রাতটা কেয়ারফুল থাকতে হবে…।
মউলি অপছন্দের চোখে ওর দিকে একবার তাকাল শুধু।
টনি বলল, জিকোকে সাধারণ কোনও পশু মারেনি। কারণ, ওর ড্রেসের সঙ্গে ফ্লেশ বা বোনের কোনও টুকরো নেই। মাংস কিংবা হাড়ের টুকরো না থাকায় মনে হচ্ছে মুরগির পালক ছাড়ানোর মতো পশুটা যেন আগে থাবা দিয়ে জিকোর পাজামা আর গেঞ্জি ছাড়িয়েছে, তারপর রেলিশ করে ওকে সাবাড় করে দিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে..।
টনির কথা শুনে হারা ঘেন্নায় শিউরে উঠল। জানলার কাছে গিয়ে হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিল বাইরে। তারপর মাথার কদমছাঁট চুলে হাত বুলিয়ে জানলার পাশে হেলান দিয়ে উনি আর মউলির দিকে তাকিয়ে রইল।
মউলি টনির দিকে তর্জনী উঁচিয়ে বলে উঠল, ঠিক বলেছিস। তার মানে অ্যানিম্যালটা নিশ্চয়ই আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। তা ছাড়া ওয়ান মোর পয়েন্ট ও জিকোর আংটি পাওয়া গেল এক জায়গায়, আর ড্রেসগুলো পাওয়া গেল অন্তত বিশ-তিরিশ ফুট দূরে। এর মানে কী? আংটিটা জিকোর আঙুল থেকে খুলে পড়ল কেমন করে?
