হারা আর টনি কাছে এসে ওর পিঠে হাত রাখল। অন্তরের আবেগে ফুঁপিয়ে উঠল শান্তনু। ওর শরীরটা ফুলে-ফুলে উঠতে লাগল।
ভাঙা গলায় ও বলল, জিকো আর নেই…।
টনি আর হারা ধমক দিয়ে ওকে চুপ করিয়ে দিল। বলল, আলো ফুটলেই জিকোর আসল খোঁজ শুরু হবে।
.
সকাল হল বটে, তবু সেটাকে রাতের চেয়েও অন্ধকার মনে হল শান্তনুর। ও যখন নিজের কবিতাকে নিজের তৈরি সুরে গানের মতো গাইত তখন জিকো তাল ঠুকত। কখনও ওর আঙুল চলত কোনও বাড়ির জানলার পাল্লায়, কখনও টিফিন ক্যারিয়ারের ওপর বাজাত, আবার কখনও বা স্রেফ কিছু খুচরো পয়সা মুঠো করে তাল ঠুকত।
সেই বাজনা বাজানো হিরো হতে চাওয়া ডাকাবুকো ছেলেটাকে এখন খুঁজতে বেরোতে হবে।
বৃষ্টি আর নেই, যদিও আকাশ ঘোলাটে। সেই ঘোলাটে পরদার পিছনে স্তিমিত সূর্যকে মরা চাঁদের মতো নিস্তেজ দেখাচ্ছে। প্রকৃতির সব জায়গাতেই বৃষ্টির ভেজা সিলমোহরের ছাপ।
ওরা পাঁচজন আর সময় নষ্ট করেনি। জিকোর খোঁজে উতলা হয়ে উঠেছে। টুনি দরজার চৌকাঠ ছেড়ে মাঠে নামেনি। তবে বাকি চরাজন বেরিয়ে পড়েছে বাইরে।
প্রথমেই ওরা গেল বাইকগুলোর কাছে।
বাইক তিনটে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। কাল রাতে ওরা হয়তো অনেক কিছু দেখেছে, কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারছে না।
বর্ষার জলছবি চোখ টানার মতো। যেদিকে চোখ যায় ঘন সবুজ। হালকা বাতাস বইছে। বাতাসে ভেসে আসছে বুলবুলির শিস। এ ছাড়া চারদিক নিস্তব্ধ সুন্দর।
জলময় ঘাস-জমিতে ছপাৎ-ছপাৎ করে পা ফেলে ওরা জিকোর উধাও হওয়ার রহস্যটা বুঝতে চাইল।
শান বলল, বাইক যখন নেয়নি তখন ও বেশি দূর যেতে পারেনি…।
কিন্তু ও মাঝরাতে হঠাৎ দরজা খুলে বাইরে বেরোল কেন? হারা জিগ্যেস করল।
তারপর আপনমনেই কিছুক্ষণ কী ভেবে বলে উঠল, ও আমার মতো ওই শব্দ শুনে জেগে ওঠেনি তো?
টনি লম্বা-লম্বা ঘাসের ডগা সরিয়ে মাটির কাছে কী দেখছিল। হারার কথায় মুখ তুলে তাকাল : আমিও সেটাই ভাবছিলাম। ওই চাবুকের মতো শব্দে ওর হয়তো ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তারপর কিউরিয়োসিটিতে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়েছে বাইরে।
তারপর? শান্তনু জানতে চাইল।
টনি আর কোনও উত্তর দিতে পারল না। কেমন বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হল, কী একটা ও বলতে চায় কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছে।
মউলি কোমরে দু-হাত রেখে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর সবুজ সালোয়ার অনেকটা করে গোটানো। বাঁ-হাতের পাঁচ আঙুলে পাঁচ রঙের নেলপালিশ। হঠাৎ করে মনে হয় নানা রঙের ফুল ফুটে আছে।
ও ভুরু উঁচিয়ে বলল, তারপর কী হল সেই স্টোরিটাই তো আমরা বুঝতে চাইছি।
টনি একটু আমতা-আমতা করে বলল, সেই লোকটার কথা মনে পড়ছে–এই বাড়িটার যে মালিক আঙুল তুলে বেঢপ বাড়িটায় দিকে দেখাল টনি? সেই লোকটাও বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আর ফিরে আসেনি। আলো জ্বেলে দরজা হাট করে খুলে রেখে সে চলে গিয়েছিল। ঠিক এই মোমেন্টে আমরা পাঁচজন ভ্যানিশ হয়ে গেলে যে সিচুয়েশান হবে।
ওরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বোধহয় টনির কথাটা নাড়া দিয়ে গেল সবাইকে।
শান বলল, জিকো হায়েনা আর নেকড়ের কথা বলছিল…।
ওরা তাকাল দুরের গাছপালার দিকে। কাল রাতে ওই ঘন সবুজের আড়াল থেকে হঠাৎই কি বেরিয়ে এসেছিল কোনও হায়েনা কিংবা নেকড়ে? তারপর নিরস্ত্র জিকোকে আক্রমণ করেছে?
কিন্তু জিকো তো লড়াই না করে হার মানার পাত্র নয়!
দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে টুনটুনি চিৎকার করে জানতে চাইল, কী রে, কিছু পেলি?
ওরা চারজনেই টুনির দিকে তাকিয়ে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল।
শান হঠাৎই হারার দিকে তাকিয়ে বলল, হয়েনা বা নেকড়ে না হয়ে অন্য কিছুও হতে পারে…।
অন্য কিছু মানে?
একটু ইতস্তত করে শান জবাব দিল, ভূত-টুত..মানে, নিশির ডাকে এরকম…।
মউলি খিলখিল করে হেসে একেবারে যেন গড়িয়ে পড়ল। তারপর হাসির দমক সামলে বলল, বোগাস!
শান আহত গলায় বলল, হেসে উড়িয়ে দিলেই হল! জিকোর ভ্যানিশ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটাও তা হলে বোগাস! তুই ওকে আমাদের সামনে হাজির কর দেখি!
ঠিক তখনই টনি ঘাসের আড়াল থেকে কী একটা খুঁজে বের করে হাতে তুলে নিল।
জিনিসটা আকাশের ঘোলাটে আলোতেও চকচক করে উঠল।
শান আর মউলি প্রায় একইসঙ্গে বলে উঠল, জিকোর আংটি!
আংটিটা ওদের সকলের চেনা। হোয়াইট মেটালের তৈরি ডিজাইন করা একটা চওড়া রিং। জিকোর ডানহাতের বুড়ো আঙুলে ওটা ছিল।
আংটিটা দেখেই ওরা চারজন কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল। ওদের মনে হল, জিকোকে আর কখনও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আংটিটা ঘিরে ভিড় করল ওরা। ওটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল।
হঠাৎই শ্বাস টানল মউলি। আংটির গায়ে কীসের দাগ? রক্ত মনে হচ্ছে।
এই দেখ, আংটির গায়ে ব্লাড-স্টেইন লেগে আছে! মউলি বলল।
সঙ্গে-সঙ্গে বাকি তিনজন ঝুঁকে পড়ল আংটিটার ওপরে। ওটা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। দেখল রক্তের ছিটে লেগে আছে আংটির বাইরে-ভেতরে দু-দিকেই। আংটিটা জিকোর হাত থেকে খুললই বা কে, আর ওটার ভেতর দিকে রক্তের দাগ লাগলই বা কেমন করে?
শান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কাঁপা গলায় বলে উঠল, জিকো আর নেই…। তারপর মাথা নীচু করে চোখ ঢাকল হাতে।
হারা বলল, জিকোর কথাই তা হলে সত্যি হল…।
টনি চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, চল, আর একটু খুঁজে দেখি। হারা, তুই জিকোর হান্টিং নাইফটা নিয়ে আয়।
