কীরকম টাইপের শব্দ? টনি জিগ্যেস করল।
কীরকম শব্দ? হারাকে একটু বিভ্রান্ত দেখাল। কিছুক্ষণ ভেবে ও আমতা-আমতা করে বলল, ভেজা মাটিতে চাবুক মারার মতন–তারপর পা ঘষে ঘষে যাওয়ার মতো আওয়াজ…।
হারার উত্তর শুনে এই বিপদেও হেসে ফেলল শান আর টনি।
শান বলল, ভেজা মাটিতে চাবুক মারার শব্দ মানে…।
না, মানে, ভেজা ঘাসের ওপরে সরু কিছু বারবার আছড়ে পড়লে যেমন শোনায়..ওইরকম টাইপের…।
টনি বলল, চল, নীচে চল।
ওরা বেখাপ্পা সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল।
শান বলল, তারপর কী হল বল…।
হারা হাত নেড়ে বলতে শুরু করল? .তারপর তো আমি শুয়ে পড়েছি। ঘুমে চোখ টেনে গেছে। আর কিছু টের পাইনি। অনেক পরে…কতক্ষণ অবশ্য জানি না…ঠান্ডায় ঘুম ভেঙে গেল। জেগে উঠেই টের পেলাম বেশ শীত শীত করছে। কোথা থেকে যেন ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে।
উঠে দেখি জিকো পাশে নেই… আর ঘরের দরজা খোলা। ব্যস, চোখের পলকে ঘুম উধাও। তখনই লক্ষ করলাম, দরজা দিয়ে হু-হু করে হাওয়া ঢুকছে।
লাফিয়ে উঠে ঘরের বাইরে এসে দেখি সদর দরজাটাও ভোলা। ছুটে গেলাম সেদিকে। ভাবলাম, জিকো বোধহয় কোনও কারণে বাইরে বেরিয়েছে। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে চারদিকে নজর চালিয়ে ওকে কোথাও দেখতে পেলাম না। তা ছাড়া ওই অন্ধকারে ভালো করে কিছু দেখার উপায় আছে! তো তখন আমি ওর নাম ধরে দু-চারবার ডাকলাম। কোনও সাড়া নেই। তারপরই আগের সেই পিকিউলিয়ার শব্দটা শুনতে পেলাম। ভাবলাম, সাপ-টাপ হতে পারে। তাই দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে তোদের ডাকতে গেছি…।
হারার কথা শুনতে-শুনতে ওরা নীচে নেমে এসেছিল। তারপর বারান্দার আলো জ্বেলে সোজা চলে গিয়েছিল সদর দরজার কাছে।
শান দরজাটা হাট করে খুলে দিল। বৃষ্টিভেজা বাতাস ছুটে এল ওদের দিকে।
বাইরেটা ঘোর অন্ধকার। এ সময়ে আকাশে যে সামান্য আলোর আভা থাকার কথা সেটা শুষে নিয়েছে জমাট কালো মেঘ। বাতাসে চঞ্চল দুরের গাছপালার শব্দ হালকাভাবে ভেসে আসছে। আর তাকে ছাপিয়ে ব্যাঙের ডাক।
শান বেশ কয়েকবার জিকো! জিকো। বলে ডাকল।
কিন্তু কেউ সাড়া দিল না।
ও তখন বলল, হারা, কুইক ছুট্টে একটা টর্চ নিয়ে আয়।
হারা ছুটল।
শান দরজার চৌকাঠ ছেড়ে নীচে নামতে যাচ্ছিল, পিছন থেকে টনি ওর পাজামা টেনে ধরল : না, বাইরে যাবি না!
শান ফিরে তাকাল টনির দিকে। আগামী দিনের বিজ্ঞানীর চোখে ভয়।
টনি বলল, দিনের আলো ফুটুক তারপর যা খোঁজ করবার করবি। এখন বাইরে যাওয়ার দরকার নেই।
শান দরজার বাইরে ভেজা ঘাস-জমির দিকে তাকাল। কল্পনায় যেন দেখতে পেল, সেই জল থইথই জমিতে অসংখ্য বিষধর সাপ কিলবিল করে বেড়াচ্ছে।
হারা টর্চ নিয়ে এল। শান টর্চটা নিয়ে তার আলো ছুঁড়ে দিল বাইরের অন্ধকারে।
বৃষ্টির জলে ভিজে নেয়ে একসা ঘাসের দল যেন ঘুম ভেঙে তাকাল ওদের দিকে। জায়গায় জায়গায় বৃষ্টির জল জমে পুঁচকে পুকুর। আর চারপাশ থেকে ভেসে আসছে ব্যাঙের কোরাস।
নেই। জিকো কোথাও নেই।
দরজা বন্ধ করে হারার ঘরে ফিরে এল ওরা তিনজন। ওদের মুখচোখ দেখলেই বোঝা যায়। অ্যাডভেঞ্চার করার খুশি-খুশি মেজাজটার বিশ্রীভাবে তাল কেটে গেছে।
মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ল টনি। হাতের কাছে রাখা প্লাস্টিকের বোতল থেকে ঢকঢক করে জল খেয়ে বলল, হারা, দিস ইজ টু মাচ। জিকোর মতো একটা হাট্টাকাট্টা ইয়াং ছেলে কখনও স্রেফ হাওয়ায় ভ্যানিশ হয়ে যেতে পারে?
ওর পাশে বসে পড়ে শান বলল, আকাশে আলো ফুটলেই আগে চেক করতে হবে ওর বাইকটা আছে কি না।
হারা বসল শানের পাশে। অবাক হয়ে জানতে চাইল, মাঝরাত্তিরে ও বাইক নিয়ে কোথায় যাবে?
সত্যিই তো! অজানা-অচেনা জায়গায় মাঝরাত্তিরে বাইক নিয়ে দোকানপাটের খোঁজে বেরোনোটা শুধু যে অবাস্তব তা-ই নয় হাস্যকরও।
ওরা মনের ভেতরে হাতড়াতে লাগল পাগলের মতো। জিকোর মুখটা ওদের চোখের সামনে ভাসতে লাগল।
লম্বা-লম্বা চুল। দারুণ চেহারা। ডানপিটে। আর হিন্দি ছবির পোকা ছিল জিকো। গানের তালে-তালে শরীর ঝাঁকিয়ে নাচতে পারত। কোনও একটা ব্যান্ডের সঙ্গে ট্রিল বাজাত। ওর হিরো হওয়ার শখ ছিল।
কয়েক মুহূর্ত পরেই শানের হঠাৎ মনে হল, জিকো সম্পর্কে সবকিছুই ও কেমন যেন পাস্ট টেন্স-এ ভাবছে ছিল, পারত, বাজাত।
শানের বুকের ভেতরটা হঠাৎই কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। কান্না পেয়ে গেল ওর। মনে পড়ল, গত সপ্তাহে ও যখন নতুন লেখা একটা কবিতা বন্ধুদের পড়ে শোনাচ্ছিল তখন জিকো আচমকা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, তোকে একটা কথা দিতে হবে, শান।
কী কথা?
তুই আমাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখবি।
উঁহু সম্ভব নয়। গম্ভীরভাবে বলেছিল শান্তনু।
কেন?
কেন জানো না? হেসে প্রশ্ন করেছিল, কাউকে নিয়ে কবি কবিতা লেখে সে মারা যাওয়ার পর। তুমি তো এখনও বিন্দাস হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ।
আর সবাই হেসে উঠেছিল এ-কথায়।
একটু পরে জিকো শানের বুকে একটা ঠোকা দিয়ে বলেছিল, তা হলে মরে গেলে লিখবি তো? কথা দে।
আগে মরো, ইয়ার–তারপর দাখো কী ফাটাফাটি কবিতা লিখি…।
সবাই হেসে উঠেছিল আবার।
সেই কথাগুলো শান্তনুর মনে পড়ছিল। জিকো যেন ওর কানের পাশে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলছে, কী রে শান, এবার কবিতা লেখ। তুই তো কথা দিয়েছিলি, বস্।
শান্তনু হঠাৎই কেঁদে ফেলল। চোখে হাত চাপা দিল ও।
