ফিরতে পারেনি কেন? হারা প্রশ্ন করল।
সেটাই তো মিস্ট্রি– ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল জিকো, হয়তো বাইরের জঙ্গল থেকে কোনও অ্যানিম্যাল এসে তাকে অ্যাটাক করেছে..।
এই জঙ্গলে আবার কী অ্যানিম্যাল থাকবে? মউলি প্রশ্ন তুলল ও এখানে নিশ্চয়ই বাঘ টাগ নেই…।
বাঘ না থাকুক, হায়েনা থাকতে পারে। একটু ভেবে জিকো আবার বলল, কিংবা ধরো নেকড়ে। এনিওয়ে, পসিলি কোনও অ্যানিম্যাল লোকটাকে অ্যাটাক করে মেরে ফেলেছে। তারপর…।
শান্তনু জিকোকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ওসব ছাড়। মোদ্দা কথা, লোকটা উধাও হয়ে ভালোই হয়েছে। বাড়িটায় আমরা শেলটার পেয়েছি। ও থাকলে হয়তো আমাদের গ্রুপটাকে ঢুকতেই দিত না। শুধু চেক করে দেখ বাড়িটা হন্টেড কিনা।
শানের মুখের সামনে বুড়ো আঙুল নেড়ে ঠাট্টা করে মউলি বলল, এখন আর কোনও চয়েস নেই, শান। এটা আমাদের ওনলি শেলটার।
শান মউলির দিকে কটমটিয়ে তাকাল।
জিকো থুতনিতে হাত বুলিয়ে বলল, একটা কথা মনে হচ্ছে। এ-বাড়ির মালিক নিশ্চয়ই পিকিউলিয়ার টাইপের। এইরকম ফাঁকা একটা জায়গায় বাড়ি করেছে। সেখানে ব্যাপক খরচ করে পোল বসিয়ে ইলেকট্রিক কানেকশান নিয়েছে। ডিপ টিউবওয়েল আর পাম্প বসিয়েছে…কারণ, আমি দেখেছি, ছাদে জলের ট্যাঙ্ক রয়েছে–বাথরুমে কল দিয়ে ফাইন জল পড়ছে…।
এ থেকে কী প্রমাণ হয়? জিকোর কথার মাঝে টনি প্রশ্ন তুলল।
প্রমাণ হয় এটাই যে, এত ট্রাবল আর পয়সা খরচ করে যখন কেউ একটা থাকার জায়গা তৈরি করে তখন তার একটা মেগা পারপাস থাকবে। সো, সেই মানুষটা নিজের ইচ্ছেয় ভ্যানিশ হবে না।
সে তো নেকড়ের ইচ্ছেয় ভ্যানিশ হয়েছে। মউলি ফুট কাটল।
এই মন্তব্যে হারা, টুনি আর শান হেসে উঠল।
জিকো খেপে গিয়ে হাত নেড়ে বলল, হাসি নয়, ব্যাপারটা সিরিয়াস। গেস করার চেষ্টা করো হোয়াট ইজ দ্যাট মেগা পারপাস…।
টনি হাত নেড়ে জিকোকে বাদা দিল ও ফরগেট অ্যাবাউট পারপাস। লোকটা সায়েন্টিস্ট ছিল। হয়তো খানিকটা পাগল ছিল, কিংবা হয়তো এখানে একটা টুরিস্ট স্পট ডেভেলাপ করতে এসেছিল…সো হোয়াট? টু হেল উইথ হিজ ব্লাডি পারপাস। আমরা এখানে থাকছি–তো হইচই করে থাকব, হুল্লোড় করে কাটাব। মোট কথা, এখন এই বাড়িটা আমাদের–ও. কে.?
অফ কোর্স! বলে মউলি এগিয়ে এসে টনির সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল।
জিকো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে। রাতে আমরা কে কোন ঘরে থাকব শুনে নাও। তারপর কিছু একটা খাওয়ার ব্যবস্থা করো..আমার পেটে আগুন জ্বলছে।
ওরা আলোচনা শুরু করল। মউলি আর টুনি প্যাকেট খুলে প্রত্যেকের হাতে একটা করে কেক ধরিয়ে দিল। টনি তিন বোতল জল বের করে সবার সামনে রাখল। শান্তনু গান ধরল ও শ্রাবণ তুমি বাজনা বাজাও পাগলাঝোরা হয়ে…।
বাইরে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ হচ্ছিল। কিন্তু বেশ বোঝা যাচ্ছিল, শব্দের তেজ আগের চেয়ে কমে এসেছে।
.
০৩.
দোতলায় টনি আর শানের ঘরের দরজায় পাগলের মতো ধাক্কা দিচ্ছিল হারা। আর একইসঙ্গে ওদের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকছিল ও শান! টনি! শিগগির ওঠ! শান! এই শান! টনি।
হারার ধাক্কায় পুরোনো দরজাটা এমনভাবে থরথর করে কাঁপছিল যেন এক্ষুনি ভেঙে পড়বে।
হারার মুখ-চোখ ভয়ে পালটে গেছে। মনে হচ্ছে, ওকে কোনও প্রেতাত্মা তাড়া করেছে, আর ও প্রাণের ভয়ে আতঙ্কে ছুটে এসেছে টনিদের দরজায়।
আরও কয়েকটা জবর ধাক্কার পর দরজা খুলে দিল টনি। চোখে চশমা নেই। মাথার চুল এলোমেলো। কপালে বিরক্তির ভাঁজ।
চোখ ডলতে ডলতে টনি জিগ্যেস করল, কী হয়েছে? এই মাঝরাতে চিল্লিয়ে কঁচা ঘুম চটকালি কেন?
হারা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, জিকো নেই।
নেই মানে?
নেই মানে নেই–ওকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।
দরজার ধাক্কায় ঘুম না ভাঙলেও ওদের কথাবার্তার সঙ্গে শান্তনুর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ও এসে দাঁড়াল টনির পিছনে। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি, পায়ে পাজামা।
করিডরের বাবের আলোয় হারাকে বেশ বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। ও এমনিতে মোটেই ভিতু নয় কিন্তু এখন যে-কোনও কারণে হোক ভয় পেয়েছে।
শান জিগ্যেস করল, কটা বাজে?
সাড়ে চারটে মতন– হারা বলল, এখন কী হবে?
টনি ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। একটু পরেই চশমা চোখে দিয়ে ফিরে এল। তারপর শান্তনু আর টনি ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। ওদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
মউলিদের ডাকব! টনি শান্তনুর কাছে জানতে চাইল।
শান্তনু হাত নেড়ে বলল, একদম না। ওরা এসব শুনলে ভয়ে হয়তো কান্নাকাটি শুরু করে দেবে।
অবশ্য মউলি শক্ত ধাতের মেয়ে। ও হয়তো সিনক্রিয়েট করবে না। কিন্তু টুনটুনিকে ভরসা নেই। ভাবল টনি।
শান হারার হাত চেপে ধরে জিগ্যেস করল, কেসটা এজ্যাকুলি কী হয়েছে খুলে বল দেখি।
হারা হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে শুরু করল।
রাত তখন কটা হবে কে জানে! হঠাৎই একটা শব্দে হারার ঘুম ভেঙে যায়। বৃষ্টি ধরে গিয়েছিল বলে হারা আর জিকো একটা জানলা খুলে শুয়েছিল। হারার মনে হয়, জানলা দিয়েই শব্দটা আসছে। তাই ও বিছানা ছেড়ে উঠে জানলা দিয়ে বাইরে উঁকি মারে।
আকাশে চাঁদ ছিল না। তার ওপর আকাশ ছিল ঘোলাটে, আর টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। তাই বাইরে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পায়নি হারা। শুধু দূরের জঙ্গলটাকে ঘোর কালো ছায়ার মতো দেখিয়েছে। তবে শব্দটা আলতোভাবে হলেও শোনা যাচ্ছিল।
