ওই হল– হারা মন্তব্য করল।
ল্যাবরেটরিটা অযত্ন আর অবহেলার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। ঘরে ছোট-ছোট দুটো জানলা। জানলা দিয়ে মেঘলা আলো এসে পড়েছে। ঘরের সিলিং-এ, র্যাকে, সর্বত্র ঝুল আর মাকড়সার জাল।
এরপর ওরা গেল দোতলায়।
সেখানেও ওই সর্বনাশা হাল।
বাড়িটা শুধু যে পুরোনো তা নয়। তৈরিও হয়েছে যেমন-তেমন করে, বদখত ভাবে। দেখে মনে হয়, রাজমিস্ত্রিদের মারাত্মক তাড়াহুড়ো ছিল। তাছাড়া প্ল্যানেরও কোনও মাথামুণ্ডু নেই। জানলাগুলো বেঢপ ছাঁদের। সিঁড়ির ধাপগুলো এক-একটা এক-এক মাপের। ওঠা-নামা করতে কষ্ট হয়।
বাড়ির আনাচে-কানাচে বাদুড় আরশোলা আর চামচিকে বাসা বেঁধেছে। সেইসঙ্গে ঝুল-কালি তো আছেই। দেওয়ালের বেশিরভাগ জায়গায় প্লাস্টার নেই। সিঁড়ির রেলিং কোথাও আছে কোথাও নেই।
বাড়িটায় দোতলায় ছাদে অসংখ্য মাটির টব। জলে-বাতাসে টবগুলোয় শ্যাওলা ধরে গেছে। কোনও-কোনও গাছ অযত্নে মরে গেছে। তবে বেশিরভাগই এখনও তাজা সবুজ।
টবের একটা গাছও ওরা চিনতে পারল না। তবে এটুকু খেয়াল করল যে, গাছগুলো অদ্ভুত ধরনের। উচ্চতায় বেঁটে-খাটো–অনেকটা বনসাইয়ের মতো। আর পাতাগুলো কারও সরু-সরু, আবার কারও-বা চওড়া।
বৃষ্টির ফোঁটার আঘাতে পাতাগুলো নড়ছিল। হঠাৎ করে মনে হচ্ছিল, পাতাগুলো বুঝি সাধারণ উদ্ভিদ নয়, প্রাণীর মতো জীবন্ত।
শান্তনু বলল, টুনি হলে দু-চারটে গাছ চিনতে পারত। ওর তো বাগান করার ম্যানিয়া আছে।
জিকো মন্তব্য করল, কিছু মাইন্ড করসি না, শান, বড়লোকের মেয়েদের ওরকম অনেক ম্যানিয়া থাকে।
শান কোনও উত্তর না দিয়ে গম্ভীর হয়ে রইল।
এর কারণটা হারা জানে। শান আর টুনির বন্ধুত্বটা বড্ড বেশি ক্লোজ। তা ছাড়া জিকো টুনিকে যে দারুণ পছন্দ করে এমন নয়।
প্রসঙ্গ পালটাতে হারা বলল, শোন, টুনি আর মউলিকে দোতলায় একটা ঘর ছেড়ে দে–।
শান বলল, তা হলে পাশের ঘরটায় আমি আর টনি থাকব।
হারা ওর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ও. কে.। আমি আর জিকো তা হলে একতলার পেছনের ঘটায় আস্তানা গাড়ছি..।
জিকো ঠোঁট উলটে কাঁধ ঝাঁকাল : ও. কে. উইথ মি।
তদন্ত আর তল্লাশি সেরে ওরা তিনজন নীচে নেমে এল। ততক্ষণে প্রথম ঘরটাকে টনি, মউলি আর টুনি সাফসুতরো করে দিব্যি গুছিয়ে ফেলেছে। মউলির কানে ওয়াকম্যানের হেডফোন, কোমরে ছোট্ট বিদেশি ওয়াকম্যান। ও গানের তালে-তালে শরীর দুলিয়ে নাচছে আর সুর মিলিয়ে গাইছে? কল হো না হো…।
ঘরে ঢুকেই হারা চেঁচিয়ে বলল, শোনো সবাই। গুড নিউজ। বাড়িটার মালিক আমরা। বাড়িতে আর কেউ নেই।
শান টনিকে বলল, তুই ঠিক ধরেছিস। এ-বাড়ির মালিক সায়েন্টিস্ট ছিল। একতলায় লাস্টের
ঘরটা ওর ল্যাবরেটরি ছিল। মনে হচ্ছে, লোকটা গাছপালা নিয়ে রিসার্চ করত।
টনি গম্ভীরভাবে বলল, হু। ল্যাবটা আমাকে একবার দেখতে হবে।
টুনটুনি মজা করে মন্তব্য করল, সে আর বলতে! মিনি সায়েন্টিস্ট বলে কথা!
টনি একবার টুনির দিকে তাকাল শুধু–কোনও কথা বলল না।
হারা, শান আর জিকো রুকস্যাক খুলে যার-যার শুকনো পোশাক বের করে নিল। বাকিদের দাঁড়া, ড্রেস চেঞ্জ করে আসছি বলে চলে গেল।
একটু পরে ওরা ফিরে এল।
জিকো জোরে জোরে হাততালি দিয়ে বলল, লি এভরিবডি। ব্যাক টু বিজনেস। নাচা গানা পরে হবে। অ্যাই, মউলি!
মউলি তখনও নাচ-গানে মশগুল ছিল। তাই ওকে আলতো করে ঠেলা মারল জিকো? আগে শোন, পরে নাচবি–।
মউলি থামল। কান থেকে হেড-ফোন খুলে নিয়ে হাত দিয়ে মাথার ভিজে চুল ঝাড়ল। ওর বয়কাট চুল বৃষ্টিতে ভিজে খোঁচা-খোঁচা হয়ে আছে।
বল, কী বলবি– জিকোর দিকে তাকিয়ে বলল ও।
জিকো বলল, আমরা ঠিকই গেস করেছি। দেয়ারস্ নোবডি ইন দ্য হাউস। তবে ইনভেস্টিগেট করে মনে হল, মাত্র একজনই থাকত এ-বাড়িতে…হোয়াট ডু ইউ সে, হারা?
হারা ঠোঁট কামড়াল। এক সেকেন্ড চিন্তা করে বলল, আমার তো সেটাই মনে হল। জামা, প্যান্ট, জুতো–যা-যা পেয়েছি সেগুলোর সাইজ চেক করে দেখি সব এক মাপের। একটাই লোক থাকত এখানে…।
হ্যাঁ জিকো সায় দিল : গ্রোন-আপ ম্যান। তবে সে সবকিছু ফেলে রেখে পালাল কেন সেটাই বুঝতে পারছি না…।
শান গালে হাত বোলাতে-বোলাতে বলল, হয়তো কোনও কিছু দেখে…ইয়ে…মানে, ভয়ে পালিয়েছে…।
মউলি জিগ্যেস করল, গোস্ট-টোস্ট কিছু? অর সামথিং লাইক দ্যাট…।
টুনটুনি আমতা-আমতা করে বলল, পালিয়েছে, নাকি মারা গেছে?
চোখের চশমাটা একটু টাইট করে বসিয়ে টনি বলল, মারা গেলে বডিটা গেল কোথায়? ওটা তো আর হেঁটে বা দৌড়ে পালাতে পারে না!
জিকো হাত নেড়ে বলল, সে যাই হোক, যে এখানে থাকত সে এখান থেকে চলে গেছে… পর রিজত্স আনোন…।
টনি মেঝেতে বসেছিল। হঠাৎই হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সামান্য খুঁড়িয়ে হেঁটে জিকোর কাছে এল।
ছোটবেলায় সাইকেল-ভ্যানের ধাক্কায় টনি চোট পেয়েছিল। তারপর থেকে ও একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে। ওর পা-টা পুরোপুরি সারেনি।
টনি বলল, জিকো, ডিডাকটিভ লজিক দিয়ে আরও একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে। লোকটা চলে গেছে রাতের বেলায় কারণ, কয়েকটা ঘরে আলো জ্বেলে রেখে গেছে। সে ভেবেছিল তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। তাই দরজা খোলা রেখে গিয়েছিল কিন্তু আর ফেরেনি…।
কিংবা ফিরতে পারেনি। টনির কথার পিঠে মন্তব্যটা জুড়ে দিল শান।
