শান নীচু গলায় হারাকে বলল, বাড়িটা বোধহয় হন্টেড।
হারা ভূত-টুতে বিশ্বাস করে না। তাই তাচ্ছিল্যের একটা শব্দ করে বলল, ধুস!
ঘরে পুরোনো আমলের সব চেয়ার, টেবিল, আর একটা বেঢপ আলমারি। আলমারির দরজার ওপরের দিকের খানিকটা অংশ কাচের। সেই মলিন কাচের ভেতর দিয়ে ঠাসা কাগজপত্র আর বইয়ের গাদা চোখে পড়ছে। এ ছাড়া টেবিলেও বই আর কাগজপত্রের ডাঁই।
এসবের ওপরে চোখ বুলিয়ে টনি বলল, যারা থাকত তারা হেভি পড়ত। বোধহয় সায়েন্টিস্ট ফায়েন্টিস্ট হবে…।
হ্যাঁ, তোমারই মতন– হেসে বলল হারা।
জিকো চেঁচিয়ে উঠল, ও. কে., গাইড। এসব বাজে কথা পরে হবে–আগে কাজের কথা শোনো।
বাকি পাঁচজন নিজেদের গুঞ্জন থামিয়ে জিকোর দিকে তাকাল।
জিকো বলল, বাইরে বৃষ্টির যা অবস্থা তাতে মনে হচ্ছে আজকের রাতটা আমাদের এখানেই থাকতে হবে–এই শেলটারে।
টুনটুনি একটু ভিতু গলায় বলল, এখানে রাতে থাকতে হবে? এই ভূতুড়ে বাড়িতে? এখন তো সবে চারটে বাজে। বৃষ্টি থেমে গেলে..মানে, আকাশ ক্লিয়ার হয়ে গেলে…।
এক ধমকে ওকে থামিয়ে দিল জিকো।
তুই একটা ক্যাবলা, টুনি। ধর পাঁচটা কি সাড়ে পাঁচটায় বৃষ্টি ধরে গেল। তারপর বাইক নিয়ে বেরিয়ে আমরা কোথায় যাব? একটু পরেই সন্ধে হয়ে যাবে। তখন সেই আবার শেলটার খুঁজতে হবে। আমাদের রুটম্যাপ কী বলছে, শান?
ওরা অ্যাডভেঞ্চারে বেরোলে রুট-ম্যাপ স্টাডি করার দায়িত্ব শান্তনুর। ও কবিতা লেখে, দু-একটা কবিতা ছোট কাগজে ছাপাও হয়েছে। তারপর থেকে ও কবি কবি ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু কবি হলে কী হবে, রুট-ম্যাপ স্টাডির ব্যাপারে ও নাম্বার ওয়ান।
ও চটপট বলে উঠল, আমি অলরেডি ক্যালকুলেশান করেছি। জিকো ঠিকই বলছে, টুনি। আজ আমাদের এখানেই থেকে যেতে হবে। ভয় পাচ্ছিস কেন? জাস্ট একটা তো রাত!
শানের কথায় টুনি বোধহয় কিছুটা ভরসা পেল। ও কাঁচুমাচু হয়ে ওপর-নীচে মাথা নাড়ল।
জিকো বলল, আর কোনও কথা নয়। আমাদের ফার্স্ট কাজ হল বাইকের ডিকি থেকে মালপত্রগুলো নিয়ে আসা। হারা, শান–চল–চটপট কাজ সেরে নিই। এর মধ্যেই আমার আবার খিদে পাচ্ছে।
হারা আর শান জিকোর সঙ্গে দরজার দিকে এগোল। যেতে-যেতে হারা বলল, জিকো, তোর দেখছি ঘণ্টায়-ঘণ্টায় খিদে পায়–এটা কিন্তু বড় বাড়াবাড়ি…।
জিকো হারার চুল ধরে টেনে দিল : তুমিও কম কীসের, বস্–?
শান টুনিদের দিকে ফিরে বলল, তোরা এবার রুকস্যাকগুলো পিঠ থেকে নামা। এই ঘরেই সব গুছিয়ে রাখ–আমরা এক্ষুনি আসছি।
ওরা বেরিয়ে যেতেই টুনটুনি, মউলি আর টনি ঘরের এক কোণে গিয়ে ভেজা রুকস্যাক মেঝেতে নামাল। খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে নিয়ে রুকস্যাক খুলে জিনিসপত্র বের করে সাজিয়ে রাখতে লাগল।
হারা, শান আর জিকো একটু পরেই ফিরে এল। হাতে মালপত্র, গা থেকে জল ঝরছে। বৃষ্টির তেজ এখনও কমেনি।
ওরা জিনিসগুলো টনিদের সামনে নামিয়ে রাখল। জিকো বলল, তোরা এগুলো গুছিয়ে রাখ, আমরা ততক্ষণে বাড়িটা একবার ইন্সপেক্ট করে আসি। দেখে আসি বাড়ির ভূতুড়ে মালিক কোথাও গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে কি না। অচেনা লোকের বাড়িতে এভাবে আমরা হুট করে ঢুকে পড়লাম…পারমিশান না নিয়ে…।
শান বলল, থাক, থাক, ঢের হয়েছে–এবার চল, অ্যাডভেঞ্চারে বেরোই…।
ওরা তিনজন বাড়িটা ঘুরে দেখতে বেরোল।
পিছন থেকে মউলি আওয়াজ দিল, দেখিস, অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে আবার হারিয়ে যান না!
শান হেসে বলল, আমি হারিয়ে গেলে টুনি আমাকে খুঁজে বের করবে।
এ-কথায় হেসে উঠল সবাই। শান মউলিদের হাত নেড়ে টা-টা করে অলিন্দে বেড়িয়ে পড়ল।
ভেজা পোশাক ছাড়তে মউলি আর টুনটুনি শুকনো জামাকাপড় নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। টনিও নিজের পাজামা আর টি-শার্ট বের করে ভেজা পোশাক পালটাতে লাগল।
গোয়েন্দা পুলিশের মতো বাড়িটায় তন্নতন্ন করে চিরুনি তল্লাশি চালাল শান্তনুরা।
নাঃ, বাড়িতে সত্যিই কেউ নেই। তবে একসময় যে কেউ থাকত তার বেশ কিছু চিহ্ন পাওয়া গেল। ধুলোমাখা জামাকাপড়, চটি, চুতো, রান্নার বাসনপত্র, আরও কিছু টুকিটাকি ছড়িয়ে রয়েছে। বাড়ির এখানে-সেখানে।
বাড়িটায় মোট পাঁচটা ঘর–একতলায় তিনটে, আর দোতলায় দুটো। এ ছাড়া একতলায় রান্নাঘর আর বাথরুম, দোতলায় শুধু একচিলতে বাথরুম। দোতলায় ঘর দুটোর সামনে বেশ খানিকটা খোলা ছাদ। ছাদে ছোট-ছোট টবে অনেক গাছ।
প্রথমে একতলাটা ঘুরে দেখল ওরা।
দ্বিতীয় ঘরটা প্রথম ঘরটার মতো। কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং। ঘরটা মাপে ছোট কিন্তু অগোছালো। ঘরে এলোমেলোভাবে ছড়ানো জিনিসপত্র দেখে বোঝা যায় ঘরটা কাজ-চালানো গোছের ল্যাবরেটরি। ঘরের আসবাব বলতে একটা প্রকাণ্ড মাপের কাঠের টেবিল। তার ওপরে পড়ে আছে বেশ কয়েকটা টেস্টটিউব, কাচের বোতল, বকযন্ত্র, স্ট্যান্ড, হিটার, আরও সব টুকিটাকি। একটা র্যাকে বেশ কয়েকটা কেমিক্যালের বোতল আর ছোট-ছোট মাটির টব। টবে কয়েকটা গাছ। গাছগুলো শুকিয়ে গেছে।
শান, জিকো আর হারা অনেকক্ষণ ধরে ঘরটাকে খুঁটিয়ে দেখল। তারপর শান বলল, টনি ঠিকই গেস করেছে। লোকটা সায়েন্টিস্ট ছিল।
কীসের সায়েন্টিস্ট? গাছপালার? হারা জিগ্যেস করল।
জিকো হারার মাথায় একটা চাটি মেরে বলল, গাছপালার সায়েন্টিস্ট কী রে! বল বোটানিস্ট।
