কিন্তু হারা কোনও জবাব দিচ্ছিল না।
ওরা কষ্ট করে এগোচ্ছিল বটে কিন্তু কোনও শেলটার চোখে পড়ছিল না। আকাশে বিদ্যুৎ, মেঘের ডাক আর বৃষ্টির তুমুল রাজ চলছিল। ওরা যেরকম ভিজে গিয়েছিল তাতে বৃষ্টি থেকে বাঁচার চেষ্টা করে আর কোনও লাভ ছিল না।
হঠাৎই হারা দেখতে পেল বাড়িটা। দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, শেলটার! শেলটার!
হারার বাইক সবার আগে ছিল। তাই বাড়িটা ও প্রথম দেখতে পেয়েছে।
গাঢ় কালো আকাশ আর গাছগাছালির পটভূমিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে বৃষ্টি-ঝাপসা একটা জীর্ণ মলিন দোতলা বাড়ি। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে, সিমেন্ট-বালির কুৎসিত ঢিবি একটা। কিন্তু কুৎসিত ঢিবির অন্য একটা আকর্ষণ ছিল–যেটা হারাদের সবচেয়ে অবাক করেছে।
কালচে ছায়াময় বাড়িটায় আলো জ্বলছে। বৃষ্টি ভেদ করেও সে-আলো স্পষ্ট চোখে পড়ছে।
হারার পরেই বাকি পাঁচজন বাড়িটা দেখতে পেল।
গাছপালা আর আগাছা শেষ হয়ে গেছে হঠাৎই। তারপর বিঘেখানেক ফাঁকা জায়গা। সেখানে স্রেফ ঘাস ছাড়া আর কোনও গাছের চিহ্নমাত্র নেই। মনে হতে পারে, কেউ যেন যত্ন নিয়ে ঘাসের চাষ করেছে। তবে এ কোনও শৌখিন ঘাস নয়–অতি সাধারণ ঘাস–মাঠে ঘাটে যে-ঘাস দেখা যায়।
বাড়িটা সেই ফাঁকা জমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে। ঝাপসা বিমূর্ত ছবির মতো।
আকাশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত বিদ্যুতের সাদা উজ্জ্বল আলো ঝলসে উঠল। ফ্ল্যাশবা জ্বেলে বাড়িটার যেন ফটো তুলল কেউ।
টনি শান্তনুকে ডেকে বলল, শান, ব্যাপক লাক আমাদের–ওই যে শেলটার!
শান্তনু চেঁচিয়ে গানের সুরে বলে উঠল, আমরা করব জয়…।
বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মোটরবাইকের গর্জন সঙ্গত করছিল আগে থেকেই। এবার তার সঙ্গে জুড়ে গেল ওদের ছজনের হুল্লোড়। শেলটার খুঁজে পাওয়ার আনন্দে ওরা মেতে উঠল পলকে। ফাঁকা জমিতে ওদের বাইক গতি বাড়িয়ে দিল।
একটু পরেই ওরা এসে পড়ল বাড়ির দরজায়। চারপাশের ঘাসজমি জলে জলাকার। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ব্যাঙের ডাক।
বাইকগুলো বাড়ির কাছ ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে সবাই নেমে পড়ল বাইক থেকে। মুখ-চোখের জল মুছতে মুছতে এগিয়ে গেল বাড়ির দরজার কাছে।
মউলি প্রথম খেয়াল করল ব্যাপারটা।
বাড়ির সদর দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। আর সেখানে যত রাজ্যের ধুলো আর মাকড়সার জাল। বাড়ির ভেতর থেকে ছিটকে আসা আলোয় মাকড়সার জালের সুতোগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
বাড়িটায় বোধহয় কেউ থাকে না। ওই দেখ, স্পাইডার্স ওয়েব–। মউলি দরজার জোড়ের কাছটায় আঙুল দেখিয়ে বলল।
হারা কখন যেন একটা টর্চ বের করে নিয়েছিল। মউলির কথায় ও টনি আর শানকে ঠেলে সরিয়ে দরজার কাছে এল। টর্চের আলো ফেলল দরজার ওপরে।
ঠিকই বলেছে মউলি। বাড়িটায় কেউ থাকে বলে মনে হচ্ছে না। অথচ কয়েকটা ঘরে আলো জ্বলছে।
কী অদ্ভুত ব্যাপার!
বিদ্যুতের আলো ঝলসে উঠল আবার। কড়কড় করে বাজ পড়ল কোথাও। টুনটুনি ভয়ে আঁতকে উঠে শানের জামা চেপে ধরল।
হারা দরজার আশেপাশে তাকিয়ে কলিংবেলের বোতাম খুঁজল–পেল না। তখন দরজার কড়া নাড়ল জোরে। চেঁচিয়ে ডেকে উঠল, কেউ আছেন?
কোনও উত্তর পাওয়া গেল না।
এইবার হারার পাশে এসে দাঁড়াল জিকো। দরজার কড়া ধরে এমনভাবে নাড়া দিল যে, মনে হল এই বুঝি কড়াটা উপড়ে চলে আসবে ওর হাতে।
কড়ার প্রচণ্ড খটাখট শব্দের পর ওরা কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল। কিন্তু কোনও উত্তর পাওয়া গেল না।
টুনটুনি জিকোর পাশ থেকে চাপা গলায় বলল, মনে হল বাড়িতে কেউ নেই…।
সঙ্গে-সঙ্গে জিকো ধুত্তেরি বলে শক্ত হাতের এক ধাক্কায় দরজার পাল্লা দুটো ঠাস করে খুলে দিল। তারপর ওরা ছজন হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল বাড়ির ভেতরে।
মেঝেতে জমে থাকা ধুলোর ওপরে ওদের এলোমেলো ভেজা পায়ের ছাপ পড়তে লাগল। ওদের কৌতূহলী চোখ এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে লাগল।
নাঃ, কেউ নেই।
টনি কেমন যেন ভিতু গলায় বলে উঠল, এ তো আজব বাড়ি দেখছি!
ঠিক তখনই চোখ ঝলসানো সাদা আলো কালো আকাশ চিরে দিল। তারপরই কানফাটানো শব্দে বাজ পড়ল।
.
০২.
আশ্রয় তো পাওয়া গেল। কিন্তু এ কেমন আশ্রয়! ফাঁকা মাঠের মাঝে একটা জীর্ণ বাড়ি। বাড়িতে কেউ নেই অথচ দরজা-জানলা খোলা…কয়েকটা ঘরে, বারান্দায় আলো জ্বলছে!
ওরা ছজন এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। চোখের ভাষায় অনেক প্রশ্ন। কিন্তু ওদের পা এগিয়ে যাচ্ছিল।
সদর দরজার পর একটা অলিন্দ। অলিন্দের শেষ প্রান্তে হলদেটে বা জ্বলছে। ওরা ভেজা গায়ের জল ঝাড়তে ঝাড়তে একটা খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল।
ঘরে টিউবলাইট জ্বলছে। একপলক দেখেই বোঝা যায়, ঘরটা এককালে বসবার ঘর ছিল। তবে এখন তার ধূলিমলিন হতমান অবস্থা। একটা সঁতসেঁতে গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে।
ঘরের দুটো জানলাই হাট করে খোলা। খোলা জানলা দিয়ে বৃষ্টির ছাট আসছে। বৃষ্টি আর বাতাসের তোড়ে একটা জানলার পাল্লা খটাখট শব্দে পাগলের মতো বাড়ি খাচ্ছে দেওয়ালে।
ব্যাপক বাড়ি মাইরি! মন্তব্য করল জিকো ও আলো-ফালো জ্বেলে বাড়ির লোকজন সব হাওয়া!
মউলি বলল, ধুলোর যা ক্যারেকটার দেখছি তাতে এ-বাড়ির লোকেরা অন্তত ছমাস আগে হাওয়া হয়েছে। এই শান, জানলা দুটো বন্ধ করে দে-জলের ছাট আসছে।
শান সঙ্গে সঙ্গে এগোল একটা খোলা জানলার দিকে। আর হারা অন্য জানলাটায় হাত লাগাল।
