আমার কথা শেষ হতে-না-হতেই ঘরের দরজায় দেখা গেল সেই চাকরটিকে। কুণ্ঠিতস্বরে সে বলল, যদি এটা একবার দেখেন– বলে আমার দিকে একটুকরো কাগজ বাড়িয়ে ধরল।
উঠে গিয়ে আমি সেটা হাতে নিলাম। তাতে একটা ঠিকানা লেখা।
আমি চোখ তুলে সপ্রশ্ন দৃষ্টি মেলে তাকালাম ওর দিকে। ও জবাব দিল, ওই দাড়িওয়ালাবাবুর পকেট থেকে পড়েছিল এটা।
দাড়িওয়ালাবাবু মানে কিষাণ আপ্তে। কিন্তু এর অর্থ কী! জেড কি এই লোকটাকে পরীক্ষা করার জন্যে পকেট থেকে কাগজটা ইচ্ছে করেই ফেলেছেন? যাকগে, একবার শেষ চেষ্টা করব এই সূত্র ধরে। কিষাণ আপ্তের সঙ্গে কথা বলে এই ঠিকানায় একবার যাব। জানি কোনও লাভ হবে না, তবু– এই আশা নিয়ে সুচরিতাকে বসতে বলে জেড-এর সঙ্গে দেখা করার জন্যে উঠলাম।
নীচের ঘরে এসে তাঁকে দেখলাম। বসে-বসে মানেকজির সঙ্গে কথা বলছেন। আমি গিয়ে তাঁকে একপাশে ডাকলাম, বললাম, মিস্টার আপ্তে, আপনার পকেট থেকে কি এই কাগজটা পড়ে গিয়েছিল?
না তো! সবিস্ময়ে বললেন তিনি, কোথায় পেলেন এটা?
আমি তাকে সব খুলে বললাম।
সব শুনে তিনি বললেন, ওই চাকরটা নিশ্চয়ই কারও হয়ে কাজ করছে। দেখি, ব্যাটার মতলব কী!
আমি আর দেরি না করে কবুতরের বাইরে এসে ক্রসওয়ার্ডের সঙ্গে দেখা করে বললাম, ইন্সপেক্টর, আমি একটা সামান্য সূত্র পেয়েছি। সেটা নিয়েই একবার শেষ চেষ্টা করতে চাই বলে তাকে সব বললাম, ঠিকানাটাও দেখালাম। শেষে যাওয়ার সময় বললাম, আপনি কাইন্ডলি লক্ষ রাখবেন যে, কেউই যেন কবুতর ছেড়ে কোথাও না যান।
কবুতর ছেড়ে যাওয়ার সময় একবার পেছনদিকটায় উঁকি দিয়ে গেলাম। দেখলাম, কিরণ শর্মা তখনও গোলাপের বাগানে ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছেন। আমাকে দেখেই সাঁৎ করে সরে গেলেন।
আমি মনে-মনে একটু হেসে কবুতর ছেড়ে রওনা দিলাম। হতাশা আমার মন ছেয়ে ফেলেছিল।
.
পোড়ো বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ঠিকানাটা মিলিয়ে নিচ্ছিলাম। এই বাড়িটাই তো? ভাঙা নেমপ্লেট থেকে যতটুকু উদ্ধার করা গেল, তা খুবই সামান্য। তবু ঠিকানাটা মেলাতে অসুবিধে হল । বনজঙ্গলে ভরতি এই ভাঙা পোড়ো বাড়িতে আর যেই থাক, মানুষ বাস করে বলে মনে হল না।
পা টিপেটিপে ঢুকলাম বাড়ির চত্বরে। বেলা পড়ে এসেছিল। জায়গাটা ছায়া পড়ে অন্ধকার অন্ধকার হয়ে রয়েছে। ধীরে-ধীরে বাড়ির পেছনদিকে গিয়ে পৌঁছোলাম। ঝোপঝাড়ে ভরতি পেছনদিকটা। তারই মধ্যে কিছুক্ষণ লুকিয়ে রইলাম।
কিছুক্ষণ পরে নীচের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখি, সেখানে জনাসাতেক লোক বসে আছে। ঘরের দেওয়ালে একটা লাল পাঞ্জার ছাপ। এখানেও লাল পাঞ্জা!
লোকগুলোর আলোচনা থেকে বোঝা গেল যে, ওদের নেতা বা ওই ধরনের কেউ এখনও আসেননি। জানলা ছেড়ে সরে দাঁড়াতেই একজন লোককে হেঁটে যেতে দেখলাম। তার পেছনদিকটা দেখে খুব চেনা মনে হল। কিন্তু কে, তা কিছুতেই ধরতে পারলাম না। আমি তো ক্রসওয়ার্ডকে বারণ করে দিয়ে এসেছিলাম যে, কবুতর ছেড়ে কেউ যেন বেরোতে না পারে!
হঠাৎ মাথার ওপরের একটা জানলা থেকে ভেসে আসা গোঙানির শব্দ আমার কানে এল। সঙ্গে-সঙ্গে পুরোনো জীর্ণ পাইপ বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলাম। সবসময়ই ভয় হতে লাগল, পাইপটা যদি ভেঙে পড়ে, কিংবা কেউ যদি দেখে ফ্যালে!
শেষ পর্যন্ত জানলার কার্নিশে পৌঁছে জানলা ঠেলে ঘরে ঢুকলাম। অন্ধকার ঘরে আবছা আবছা চোখে পড়ল একটি লোককে। ঘরের এক কোনায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে।
কী করব ভাবছি–এমন সময় ঘরের আলো জ্বলে উঠল। আর আমার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে, তিনি কিরণ শর্মা।
আমি তাঁকে দেখে অবাক হয়ে বলে উঠলাম, তা হলে শেষ পর্যন্ত আপনিই নাটের গুরু?
কোনও জবাব না দিয়ে আমার দিকে ছপা এগিয়ে এলেন তিনি। তারপরই পকেট থেকে একটা গাঢ় নীলচে রঙের রিভলভার বের করে উঁচিয়ে ধরলেন আমার দিকে, তার মুখ ব্যঙ্গের হাসিতে বিকৃত হয়ে গেল…।
.
রাতে যখন কাঞ্চন ফিরল না, তখন খুবই মুষড়ে পড়ল সুচরিতা। কোত্থেকে কী হয়ে গেল। তাদের মধ্যেই একজন সমর বর্মন! কী সাঙ্ঘাতিক! তবে কাঞ্চন নিশ্চয়ই নয়। সত্যিই, কাঞ্চন ছেলেটা এমন দুরন্ত প্রকৃতিরদারুণ ছেলে। ওকে ছাড়া সুচরিতা নিজেকে ইদানিং ভাবতে পারে না। ও আসার পর থেকেই সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে আছে সুচরিতা।
ঠিক এমন সময় ঠক করে একটা আওয়াজ হল কাচের শার্সিতে। চকিতে জানলার দিকে ছুটে গেল সুচরিতা। জানলা খুলল–। নীচের সুরকি ঢালা পথে কেউ একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে।
সুচরিতা মুখ বাড়াতেই আর একটা সাদা রঙের কী ছিটকে এল ঘরের ভেতরে। নীচু হয়ে সেটা কুড়িয়ে নিল ও। কাগজে মোড়া একটা পাথর। কাগজটা খুলল..একী! এ যে কাঞ্চনের চিঠি। চিঠিতে লেখাঃ
সু,
ভীষণ বিপদ, শিগগির কবুতর ছেড়ে আমার লোকের সঙ্গে চলে এসো। অনেক কথা বলার আছে। আর, এদিকে কী হয়েছে জানো? কিরণ শর্মা হলেন…।
কাঞ্চন।
আর দেরি করল না সুচরিতা। চটপট তৈরি হয়ে নেমে এল নীচে। দেখল, লোকটি ওর পরিচিত। ওই লোকটিই কুমার রণজিতের চাকর ছিল।
সুচরিতা নেমে আসতেই সে চাপা গলায় বলল, তাড়াতাড়ি চলুন, বাবু আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।
ওরা দুজন দ্রুতপায়ে হাঁটতে শুরু করল।
সুচরিতা ভাবছিল–তা হলে কাঞ্চনের ধারণাই সত্যি হল। কিরণ শর্মাই আসল লোক।
কবুতরের বাইরে সুচরিতার গাড়ি ছাড়াও আর একটা কালো রঙের স্ট্যান্ডার্ড দাঁড়িয়েছিল। চাকরটার নির্দেশে সুচরিতা গিয়ে বসল সেই গাড়ির পিছনের সিটে। চাকরটা ওর পাশে এসে বসল।
