শান্তনু আকাশের দিকে তাকাল। ভুরু কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলে আকাশটা বেশ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল।
আকাশে চাপ-চাপ ঘন কালো মেঘ। সেগুলো খুব ধীরে ধীরে ভেসে বেড়াচ্ছে, একে অপরের সঙ্গে জোড়া লেগে যাচ্ছে। যেখানটায় জোড়া এখনও লাগেনি সেই সামান্য ফাঁক দিয়ে উজ্জ্বল ঘোলাটে আকাশ দেখা যাচ্ছে।
বৃষ্টি যে পড়ছে তার ফোঁটাগুলো মাপে বেশ বড় হলেও সংখ্যায় কম। তাই রাস্তায় ফোঁটাগুলোর দাগ চিতল হরিণের গায়ের মতো দেখাচ্ছে। এই বৃষ্টিতে বাইক চালানো যায় না এমন নয়। কিন্তু শান্তনু একটু সাবধানী–তাছাড়া বাইক চালায়ও একটু ধীরেসুস্থে। এ নিয়ে হারা আর জিকো মাঝেমধ্যেই ওকে ঠাট্টা করে।
ওরা ছজন তিনটে বাইক নিয়ে অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়েছে–কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা গোছের অ্যাডভেঞ্চার। দরকারি জিনিসপত্র সব তিনটে রুকস্যাকে আর তিনটে বাইকের ডিকিতে ঠেসে নিয়ে ওরা ছজন মাঝে-মাঝেই এরকম বেরিয়ে পড়ে কখনও গরমের ছুটিতে, কখনও বা পুজোর ছুটিতে।
ওরা ছজন পাড়ায় তৈরি করেছে অভিযাত্রী ক্লাব। তার নামটা ভারী অদ্ভুত ও দেখব এবার জগৎটাকে। ওদের ক্লাবে আরও চার-পাঁচজন উৎসাহী ছেলেমেয়ে নাম লিখিয়েছে। সপ্তাহে একদিন করে ক্লাবে আসেন অভিজ্ঞ কোনও অভিযাত্রী। তিনি অভিযানের নানান বিষয় শেখান। আর রোজকার মাস্টারমশাই শিবেন্দ্র বিশ্বাস–শিবুদা। তিনি নাঘুন্টি, অন্নপূর্ণা, এরকম বেশ কয়েকটা অভিযানে গিয়েছিলেন। এখন শিবুদার বয়েস হয়েছে। কিন্তু পাড়ার এই ছেলেমেয়েগুলোকে অভিযানমুখী করে তোলার ব্যাপারে তার আগ্রহ কিছু কম নয়। এমনকী ক্লাবের নামটাও শিবুদারই দেওয়া।
শান্তনু আকাশ পরীক্ষা শেষ করে মুখ নামাল, গম্ভীর স্বরে বলল, হারা, মালি–কেস সুবিধের নয়। এ-বৃষ্টি বাড়বে।
শান্তনুর মতো টনিও আকাশ পরীক্ষা করছিল। ওর রোগা বেঁটেখাটো চেহারা, চোখে চশমা। কথাবার্তায় গম্ভীর ইনটেলেকচুয়াল ভাব। ও যে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানী হবে সেটা গোটা কলকাতার সবাই জানে। কারণ, ওই সর্বত্র এটা প্রচার করে বেড়ায়।
ও নানান কায়দায় ঝুঁকে পড়ে, লম্বা হয়ে, একচোখ বুজে আকাশটা পরীক্ষা করছিল।
হারা ওকে আওয়াজ দিল, কী সায়েন্টিস্ট, কী বুঝছ?
টনি আকাশের দিক থেকে চোখ নামাল। ওর শৌখিন চশমার কাঁচে জলের ফোঁটা গড়িয়ে নামছে।
ও সামান্য পা টেনে-টেনে হারাদের কাছে এগিয়ে এল। পিঠের রুকস্যাকটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঠিকঠাক করে নিল। হাইট কম হওয়ায় ওকে অনেকটা পিঠে-ব্যাগ স্কুলছাত্রের মতো লাগছিল।
কান খোল কর সুন লো, ভাইসব। মজার সুরে বলল টনি, প্রচণ্ড বৃষ্টি নামবে। ক্যাস অ্যান্ড ডগস। অ্যাট লিস্ট আমার তাই মনে হচ্ছে।
রিস্টওয়াচের দিকে চোখ রাখল হারা। সওয়া তিনটে।
একটা সাদা রঙের টাটা সুমো ঝড়ের বেগে ছুটে গেল রাস্তা দিয়ে। জলে ভেজা রাস্তায় চড়বড়-চড়বড় শব্দ হল।
ওরা ছজন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে জটলা করতে লাগল।
কী করা যায় এখন?
তর্কের ঝড় চলল তিন মিনিট কি চার মিনিট। তারও হয়তো বেশি চলত যদি না বৃষ্টির তেজ আচমকা বেড়ে উঠত।
গাছের ঘন পাতা ভেদ কর জলের ফোঁটা এখন নীচে পড়ছে। ওরা ভিজতে শুরু করেছে।
শান্তনু হাতের তালু দিয়ে বৃষ্টির জল আড়াল করে মাথা বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। নিজের কেঁকড়ানো চুলের বাহার নিয়ে ওর বেশ ম্যানিয়া আছে। তা নিয়ে টুনটুনি মাঝে-মাঝেই ওকে হেনস্থা করে। বলে, তুই চুলে কেয়োকার্পিন মাখ–তারপর বিনুনি করেনে।
শান্তনু মাথা নেড়ে বলল, না ভাই, আর পারা যাচ্ছে না–শেলটার খোঁজো কুইক।
জিকো বলল, এখানে কোথায় শেলটার পাবি? দুপাশে গাছপালা আর জঙ্গল…।
আকাশে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল, মেঘ ডাকল গুড়ুম-গুড়ুম। বৃষ্টির তোড় আরও বেড়ে গেল।
টনি হারার হাত ধরে টান মারল : অনেক হয়েছে, বস্–এবার চলো–মাথা গোঁজার একটা আস্তানা খুঁজি…।
হারা আর শান্তনু বাইকে উঠে পড়ল। ওদের পিছনে উঠে বসল টনি আর টুনটুনি। বাইকে স্টার্ট দিল ওরা।
তাই দেখে জিকো বলে উঠল, শিট।
ওর মুখ বেয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছিল। হাত বুলিয়ে জল মুছে নিয়ে ও বাইকে চড়ে বসল। মউলিকে ডাকল, কাম অন, মউলি, আমরা এখন শেলটারে বেড়াতে যাচ্ছি।
মউলি আর দেরি করল না। প্রায় লাফিয়ে বাইকের পিছনে উঠে বসল। নিয়ম করে জিম এ যায় বলে ওর মধ্যে একটা অ্যাথলিট ভাব আছে।
তিনটে বাইক আবার চলতে শুরু করল–তবে রাস্তা ধরে নয়, গাছপালার আড়াল ভেদ করে।
হারা, জিকো, মউলিরা প্রথম-প্রথম ছোট-ছোট দূরত্বে অভিযান চালিয়েছে। যেমন, ভোরবেলা বেরিয়ে রাতে ফিরে আসা। তারপর ধীরে-ধীরে ওদের অভিজ্ঞতাও বেড়েছে, সেইসঙ্গে দূরত্বও বেড়েছে। ওরা পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপ খুঁটিয়ে দেখে বইপত্র পড়ে এক-একটা নাম-না-শোনা জায়গা খুঁজে বের করে আর তারপর প্রবল উৎসাহে সেদিকে বাইক ছুটিয়ে দেয়। বাড়ির লোকেরা শুরুতে বিস্তর ঝামেলা করেছিল, কিন্তু ওদের জেদ আর উৎসাহের কাছে শেষ পর্যন্ত তারা হার মেনেছে। এবারে ওদের গন্তব্য ছিল পত্ৰসায়র। কিন্তু পথে এই বিপত্তি।
ওদের সামনে বড়-বড় গাছ, ছোট-বড় ঝোঁপ আর এবড়োখেবড়ো পথ। এই তিনের মোকাবিলা করে ওদের বাইক চলছিল। আকাশ আঁধার–তাই হেডলাইট জ্বালতে হয়েছে। শান্তনু, জিকো আর হারা চোয়াল শক্ত করে বাইক চালাচ্ছে। বাইকগুলো থেকে-থেকেই লাফিয়ে উঠছে, আবার নীচে পড়ছে। টুনটুনি, মউলি আর টনি হাতল আঁকড়ে ধরে বসে আছে। টনি তো বেশ ভয় পাচ্ছিল, ঝাঁকুনিতে বাইক থেকে না পড়ে যায়। বারবার হারাকে বলছিল, কেয়ারফুল, হারা…।
