ভয়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। দিশেহারার মতো এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে থাকি। ওকে একরকম ধাক্কা দিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বের করে দিই। তারপর তাড়াহুড়ো করে দত্তগুপ্তের ঘর সার্চ করে আমার ফটোর খামটা খুঁজে বের করি। দত্তগুপ্তের লাইটার নিয়ে বাথরুমে চলে যাই–সেখানে খামটা পুড়িয়ে কমোডে ফেলে দিয়ে ফ্লাশ করে দিই। লাইটারটা শাড়ির আঁচলে মুছে দত্তগুপ্তের ঘরে সবে রেখেছি, তক্ষুনি ফ্ল্যাটের কলিংবেল বেজে উঠল। দরজা খুলে দেখি আপনি… কান্নার দমকে শর্মিলার গলা কেঁপে গেল, আপনাকে আমি চিনি না, ফ্ল্যাটে কেন এসেছেন তাও জানি না। কী বলব ভাবছি তখন আপনিই নিজে থেকে সব ইনফরমেশান জানিয়ে আমাকে হেল্প করলেন।
পিনাকী দত্তগুপ্ত খুব নোংরা লোক ছিল। বহু মেয়ের লাইফ ও শেষ করে দিয়েছে। অতগুলো লাইফের পাশে ওর একটা লাইফের কী দাম আছে, বলুন! জনি আমার জন্যে নানাভাইয়ের দল ছেড়ে দিয়েছিল। দল ছাড়তে চাইলে নানাভাই কাউকে আটকান না। শুধু কন্ডিশান হচ্ছে, সে যেন নানাভাইয়ের ডার্ক অ্যাক্টিভিটির ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে থাকে। তা হলে নানাভাই বা তার গ্যাঙের কেউ তার নামও কোনওদিন উচ্চারণ করবে না। কিন্তু কন্ডিশান ব্রেক করলেই সেই লোকটির গল্প শেষ। শর্মিলা কান্নায় ভেঙে পড়লেন? এবার তা হলে জনির গল্প শেষ…আমার গল্পও শেষ। বিশ্বাস করুন রীতেনবাবু, জনিকে আমি ভালোবাসি–ও-ও আমাকে ভীষণ ভালোবাসে।
আমার মুখে বোধহয় একটু অবিশ্বাসের ছায়া পড়েছিল। সেটা লক্ষ করে আমার পায়ের কাছে এসে একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন শর্মিলা। হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে জড়ানো গলায় বললেন, আপনার সঙ্গে যে ইনটিমেট কথাবার্তা বলেছি সেটা স্রেফ নিজেরা বাঁচার জন্যে। আমাদের এই নতুন সংসারকে বাঁচাতে আমি আরও পাঁচ-সাতজনের সঙ্গে শুতে রাজি আছি। কিন্তু আমি জনিকে ছেড়ে থাকতে পারব না…বিশ্বাস করুন…।
শর্মিলার পরের কথাগুলো কান্নায় জড়িয়ে গিয়ে আর বোঝা গেল না।
আমি একটু ইতস্তত করে ওঁকে ধরে তুললাম। অবাক চোখে দেখলাম ওঁর মুখের দিকে। ভালোবাসা, তোমার মধ্যে এমনকী আছে যে, বারবার তুমি জিতে যাও!
বর্ষার মুখের দিকে তাকালাম আমি। তারপর শর্মিলাকে বললাম, ম্যাডাম, পুলিশকে আমরা কিছু জানাব না–আপনাকে কথা দিলাম। পুলিশ যদি আমাকে হাজার প্রশ্ন করে তা হলেও ওদের আমি আপনার কথা বলব না। বলব না যে, আপনাকে আমি খুঁজে পেয়েছি।
শর্মিলা কাঁদতে কাঁদতে আমার হাত দুটো চেপে ধরলেন।
জনি ততক্ষণে সামান্য নড়তে শুরু করেছে।
আমি জনির দিকে ইশারা করে বললাম, ওকে একটু অ্যাটেন্ড করুন। পরে সব বুঝিয়ে বলবেন। আমরা এখন যাই…।
শর্মিল কৃতজ্ঞ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আমি আর বর্ষা ওঁর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। বৃষ্টি তখনও পড়ছে।
বর্ষাকে বাড়ি পৌঁছে দেব বলে একটা ট্রামে উঠলাম। একেবারে ফাঁকা ট্রাম। সামনের দিকের জোড়া সিটে পাশাপাশি বসলাম দুজনে।
বর্ষা আলতো সুরে জিগ্যেস করল, গলায় এখনও ব্যথা আছে?
আমি বললাম, না। যদিও গলাটা বেশ ব্যথা করছিল।
বর্ষা আড়ালে আমার হাত চেপে ধরল।
ট্রাম এন্টালি পৌঁছনো পর্যন্ত আমরা একটিও কথা বলিনি। শুধু বর্ষার হাতটা আমার হাতের মধ্যে ধরা ছিল।
ওকে বাড়ির দরজায় পৌঁছে দিয়ে চলে আসার সময় জিগ্যেস করলাম, বর্ষা, আমি কি এখনও স্রেফ একজন অস্কার নমিনি?
বর্ষা উত্তরে শুধু হাসল। কিন্তু হাসিটা এমন যে আমার ভীষণ বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করল।
রইল না আর কেউ
বৃষ্টির দু-চারটে ফোঁটা গায়ে পড়তেই শান্তনু চেঁচিয়ে উঠল, অ্যাই, বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু সামনের দুটো বাইক যেরকম আওয়াজ করে ছুটছিল তাতে শান্তনুর কথা কেউ শুনতে পেল বলে মনে হল না।
শান্তনু জোরে-জোরে কয়েকবার হর্ন দিল প্যাঁ–প্যাঁ–প্যাঁপ।
ওর বাইকের পিছনে বসা টুনটুনি চেঁচিয়ে বলল, হারা! জিকো! বাইক থামা–বৃষ্টি পড়ছে।
সামনের দুটো বাইক চালাচ্ছিল হারা আর জিকো। শান্তনুর হর্ন আর টুনটুনির মিহি গলা– দুটোই ওরা শুনতে পেল। তাই বাইকের গতি কমিয়ে পিছন ফিরে তাকাল দুজনে। দেখল টুনটুনি ছটফটে হাত নেড়ে বাইক থামাতে ইশারা করছে।
একটা বিরক্তির ভাব করে হারা বাইক নিয়ে গেল রাস্তার পাশে দাঁড় করাল। জিকোও বাইক সাইড করে হারার বাইকের পিছনে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর শান্তনু নিজের ক্যারিজমা সাবধানে চালিয়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল ওদের পাশে।
তিনটে মোটরবাইকের পিছনে বসে থাকা তিনজন টনি, মউলি আর টুনটুনি–নেমে দাঁড়াল রাস্তায়। ওদের পিঠে ঝোলানো রুকস্যাক ভারে ঝুলে পড়েছে নীচের দিকে।
আর তারপরই বৃষ্টি নিয়ে ওদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হল। এই বৃষ্টিতে বাইক চালিয়ে এগোনো ঠিক হবে, নাকি ওরা রাস্তার ধারে গাছের নীচে অপেক্ষা করবে–তারপর বৃষ্টি থামলে আবার বাইক নিয়ে রওনা হবে।
হারা আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল। বৃষ্টির ধরনটা কীরকম সেটা বোঝার জন্য হাত পাতল। মউলি সঙ্গে-সঙ্গে একটা পঞ্চাশ পয়সার কয়েন ওর হাতের চেটোয় দিয়ে ঠাট্টা করে বলল, এর বেশি পারব না–মাপ করো। তারপর বিরক্তভাবে বলল, :, কী না আমার বৃষ্টি তা আবার মাপতে বসেছে! সাধে কি বলে হারাধন!
হারা খেপে গিয়ে কয়েনটা ছুঁড়ে ফেলে দিল রাস্তায়। তারপর বলল, মউলি, লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি–আমার নাম হারা, হারাধন নয়। শান্তনু আর টুনটুনি ওরকম হইচই করল বলে বাইক থামিয়েছি। নইলে এ আর কী বৃষ্টি! ব্যাঙের ইয়ে। শুধু আকাশটা কালো বলে…।
