আমি মাথা ঝুঁকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলাম। তারপর বললাম, ম্যাডাম, আপনি আমাকে মিথ্যে কথা বলছেন কেন? দত্তগুপ্ত চুরুট খেতেন না–ক্লাসিক সিগারেট খেতেন। দত্তগুপ্ত যখন মার্ডার হন তখন আমি ওঁর ফ্ল্যাটে চুরুটের গন্ধ পেয়েছিলাম। নানাভাইও চুরুট খান না।…তা হলে কে চুরুট খায়? নিশ্চয়ই আপনি নন?
আমার ঠাট্টায় শর্মিলা হাসবেন কি না ভাবছিলেন। ঠিক তখনই একটা গর্জন শোনা গেল।
আমি চুরুট খাই। সো হোয়াট–সো ব্লাডি হোয়াট?
টের পাইনি কখন দরজায় জনি এসে দাঁড়িয়েছে। ওর হাতে সরু ধরনের একটা জ্বলন্ত চুরুট। পরনে গাঢ় ছাইরঙের বারমুডা আর সাদা পোলো নেক টি-শার্ট। টি-শার্টের বুকের ওপরে লেখা : দিস সিটি রান্স অন লাভ।
জনি চোখ ছোট করে আমাকে দেখছিল। দৃষ্টিটা এমন যেন যে-কোনও মুহূর্তে যে-কোনও কিছু করে বসতে পারে।
শর্মিলা ভয়ের চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বর্ষার মুখেও কখন যেন আশঙ্কার ছাপ পড়েছে।
আমি ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। চুরুটের গন্ধটা শুঁকে দেখার জন্যে জনির দিকে এক পা এগোলাম।
ঠিক তখনই দেওয়ালে টাঙানো ফটোতে আমি হিকপিককে দেখতে পেলাম। জনির পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে। এইজন্যেই হিকপিককে আমার চেনা-চেনা মনে হয়েছিল।
জনির চুরুটের গন্ধ নাকে আসতেই সব অঙ্ক মিলে গেল।
সো ইট ওয়াজ য়ু। জনির দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, মার্ডার ওয়েপনটা তুমি কোথায় লুকিয়ে রেখেছ?
উত্তরে জনি নোংরা খিস্তি করে উঠল। চুরুটটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমার তলপেটে লাথি চালাল।
বর্ষা ভয়ের চিৎকার করে উঠল। শর্মিলা জনি! বলে ডেকে উঠলেন।
আমি পলকে শরীরটা ঘুরিয়ে নিয়েছি বটে, তবে লাথিটা পুরোপুরি এড়াতে পারলাম না। ওটা আমার কোমরে এসে লাগল। আমি ছিটকে পড়ে গেলাম।
সামলে নিয়ে উঠে বসার আগেই জনি এগিয়ে এল আমার কাছে, কলার ধরে এক হ্যাঁচকা টানে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল। হিংস্র জন্তুর মতো দাঁত বের করে বলল, নোবডি মেসেস অ্যারাউন্ড উইথ মাই ওয়াইফ। দত্তগুপ্ত আমার ওয়াইফকে ব্ল্যাকমেল করতে চেয়েছিল। ওর হিসেব আমি চুকিয়ে দিয়েছি। এখন তুই আমার ওয়াইফকে লাফড়ায় জড়াতে চাইছিস!
জনি আমাকে দেওয়ালে ঠেসে ধরল। ওর ডানহাত আড়াআড়িভাবে চেপে বসল আমার গলায়। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, চোখের নজর ঝাপসা হয়ে এল। সেই ঝাপসা নজরেই আমি জনি আর হিকপিকের রঙিন ফটোটা দেখতে পাচ্ছিলাম।
আমার ভেতরে একটা পাগল করা রাগ টগবগ করে ফুটতে শুরু করল। কিন্তু জনি হিকপিক নয়। ওঁকে সামলাতে আমার মতো অন্তত দুজন লোক দরকার। এখন আর-একজন পাব কোথায়!
বর্ষা আর শর্মিলা জনির হাত ধরে টি-শার্ট ধরে যেমন-তেমনভাবে টানাটানি করছিল। ওকে ছাড়াতে চেষ্টা করছিল। আর একইসঙ্গে চিৎকার-চেঁচামেচি করছিল।
জনির কিন্তু কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। ও আমার মুখের কাছে মুখ এনে তোড়ে গালাগাল দিচ্ছিল। ওর থুতুর কণা বৃষ্টির মতো আমার মুখে ছড়িয়ে পড়ছিল।
ঠিক তখনই আমার খড়কুটো-আঁকড়ে ধরতে-চাওয়া হাত মোবাইল ফোনটা খুঁজে পেল।
এক মুহূর্তও দেরি না করে আমি মোবাইল ফোনটা হাতুড়ির মতো বসিয়ে দিলাম জনির বাঁকানের ওপরে।
গরম তেলে গোটা লঙ্কা ফেললে যেমন ফেটে যায় সেরকম একটা শব্দ হল। ফোনের খাটো অ্যানটেনাটা জনির কানের গর্তে ঢুকে গেল কি না কে জানে! তবে জনি হুড়মুড় করে খসে পড়ে গেল মেঝেতে। নিথড় হয়ে পড়ে রইল। ওর বাঁ কানের পাশ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল।
আমি মোবাইল ফোনটা আবার উঁচিয়ে ধরেছি দেখে শর্মিলা বুকফাটা চিৎকার করে ছুটে এসে আমাকে একেবারে জাপটে ধরলেন। হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মোবাইল ফোনটা আমার হাত থেকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন।
আমি শর্মিলাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ধীরে-ধীরে মেঝেতে বসে পড়লাম। ঘোলাটে চোখে বর্ষার দিকে তাকিয়ে হাঁফাতে লাগলাম। বর্ষা তখন ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
এর মধ্যেই আশপাশের দু-চারজন বাসিন্দা ঘরের দরজায় এসে ভিড় জমিয়ে ফেলেছে। আমি ইশারায় ওদের চলে যেতে বললাম। তাতে ওরা ইতস্তত করছে দেখে ধমকের গলায় বললাম, এসব ফ্যামিলি ম্যাটার। আপনারা চলে যান, প্লিজ।
এবার কাজ হল।
আমি গলায় হাত বোলাতে-বোলাতে উঠে দাঁড়ালাম। বর্ষা ছুটে এসে আমাকে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে আমি অন্যরকম হয়ে গেলাম। অনেক ভুলে যাওয়া কবিতার লাইন পলকে মনে পড়ে গেল।
শর্মিলা তখন জনির ওপরে ঝুঁকে পড়ে ওর মুখে জলের ছিটে দিচ্ছিলেন।
আমি বর্ষাকে বললাম, দরজাটা ভেজিয়ে দাও।
ও দরজা ভেজিয়ে দিতেই শর্মিলাকে বললাম, ম্যাডাম, জনিকে এখন একটু ঘুমোতে দিন। সেই ফাঁকে আপনাকে দুটো কথা বলে নিই…।
শর্মিলা আমার দিকে ঘুরে তাকালেন। আমার ডান হাতে ধরা অ্যানটেনা ভাঙা মোবাইল ফোনটার দিকে চোখ পড়তেই ওঁর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি জনির কাছ থেকে খানিকটা দূরে সরে গেলেন।
জনি আগে নানাভাইয়ের দলে ছিল? ঠান্ডা গলায় জানতে চাইলাম।
হ্যাঁ। ও-ই মিস্টার দত্তগুপ্তের কাছে মাসে-মাসে টাকা আনতে যেত। সেই থেকেই আমার সঙ্গে পরিচয়…তারপর ফ্রেন্ডশিপ…।
জনির রিভলবারটা এখন কোথায়?
ওটা জনির নয়– কাঁদতে কাঁদতে শর্মিলা বললেন, মিস্টার দত্তগুপ্তকে শায়েস্তা করার জন্যে রিভলভারটা ও হিকপিকের কাছ থেকে জোগাড় করেছিল। সেদিন ও আমার সঙ্গে পিনাকী দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল নেহাতই ওঁকে ভয় দেখাতে। শুরুতে কথাবার্তা বেশ ঠান্ডা মাথাতেই হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎই মিস্টার দত্তগুপ্ত আমার নামে একটা নোংরা কথা বলায় জনি রাগে ফেটে পড়ে। ওঁকে লেফট অ্যান্ড রাইট মারধর করে বিছানায় কাত করে দেয়। তারপর আমি কিছু করে ওঠার আগেই আচমকা ওর মুখে বালিশ চাপা দিয়ে গুলি করে দেয়।
