না, ম্যাডাম–এখন একটা কাজে ফেঁসে গেছি। পরে সময়মতো গিয়ে আপনাকে বলে আসব।
ঠিক আছে আমার বাড়িতে আসতে হবে না। আমরা অন্য কোথাও মিট করতে পারি…।
এক্ষুনি তো সেটা করা যাবে না। পরে আপনার সঙ্গে ফোনে কথা বলে ঠিক করে নেব। ও হ্যাঁ, রশিদ আপনার কথামতো হেল্প করেছে। আর সংক্ষেপে এটুকু জেনে রাখুন, নানাভাইয়ের ওখানে গিয়ে খুব একটা কাজ হয়নি।
তার মানে!
তার মানে হল, এখনও আমি অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে আছি।
ফোন অফ করে দিলাম।
গতকালের মেঘলাভাবটা আকাশে থেকেই গিয়েছিল। বিকেল পাঁচটা থেকে বৃষ্টি শুরু হল।
.
প্রায় সাড়ে সাতটা নাগাদ আমি আর বর্ষা শর্মিলা বোসের দরজায় কড়া নাড়লাম। বৃষ্টি তখনও থামেনি।
বর্ষার সঙ্গে সময়মতোই আমি দেখা করেছি। আমার সর্দির ভাবটা বেড়েছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে কাশি। তাই ছাতা নিয়েই বেরিয়েছি।
ও সময়মতো হাজির হতেই ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
ছাতা থাকলেও ওর চুড়িদার বেশ খানিকটা ভিজে গেছে। পোশাকের পায়ের কাছে কাদার ছিটে। তবে মুখটা টলটল করছে।
ওকে দেখামাত্রই বুকের ভেতরে উলটোপালটা ব্যাপার শুরু হল।
রাজাবাজারের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে আমরা কথা বলছিলাম। প্রথমে খানিকটা অফিসের কথা হল। তারপর দত্তগুপ্ত, নানাভাই–এসব শুরু হল।
পথ চলতে-চলতে কথা বলা খুবই শক্ত ব্যাপার। তার ওপর রাস্তায় জল-কাদা, যানজট, আর মানুষের ভিড়। সায়েন্স কলেজ পেরিয়ে একটা ছোট রেস্তোরাঁয় আমরা বসলাম।
আমার কাছ থেকে নানাভাইয়ের ব্যাপারটা সংক্ষেপে শোনার পর বর্ষা বেশ হতাশ হল। খানিকটা ভয়ও পেয়ে গেল ও। পুলিশ যদি আবার হ্যারাস করে! ওকে বললাম যে, নানা আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন। বলেছেন যে, পুলিশ আমাকে আর বিরক্ত করবে না। তবে ওর কথা নানাকে বলিনি। যদি নিতান্ত দরকার হয়, তা হলে বলতে হবে।
বর্ষা বলল, না, না বলার দরকার নেই। ওর মুখটা কেমন কালো হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ কথা বলার পর ওকে বললাম, বর্ষা, তোমাকে এখন একজনের বাড়িতে নিয়ে যাব–যাবে?
চমকে উঠল বর্ষাঃ কার বাড়িতে!
শর্মিলা বোসের বাড়িতে। কাছেই গড়পাড়ে উনি থাকেন।
হঠাৎ ওঁর বাড়িতে কেন?
একটা ব্যাপারে আমার একটু খটকা লেগেছে। সেই ব্যাপারে একটু কথা বলতে যাব। তুমি সঙ্গে গেলে ভালো হয়। তা ছাড়া তুমি তো ওঁকে কখনও দ্যাখোনি। ওঁর সঙ্গে আলাপও হয়ে যাবে।
আমার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে।
তোমার কোনও ভয় নেই–আমি তো সঙ্গে আছি!
মাঝারি বৃষ্টির মধ্যেই আমরা রেস্তোরাঁ ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঠিক তখনই প্যান্টের পকেটে আমার মোবাইল ফোন বেজে উঠল।
বোতাম টিপে কথা বললাম।
আমার এল.আই.সি.-র এজেন্ট। উনি জানতে চাইছেন, গতবছরে আমি যে বলেছিলাম এ-বছর একটা জীবন সুরক্ষা পলিসি করাব, সেটা করাব কি না।
চমৎকার প্রশ্ন, এবং চমৎকার সময়ে! জীবন সুরক্ষা যদি আমার দরকার না হয়, তা হলে আর কার দরকার হবে।
ওঁকে বললাম, নিশ্চয়ই করাব। উনি যেন নেক্সট উইকে আমার অফিসে আসেন।
মিনিটদশেকের মধ্যেই আমরা শর্মিলা বোসের দরজায় পৌঁছে গেলাম।
দরজা খুলে আমাকে দেখেই তিনি ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেনঃ এ কী! আপনি! তারপর চাপা গলায় বললেন, জনি বাড়িতে আছে।
আমি হাসলাম। তারপর একটু পাশে সরে দাঁড়াতেই শর্মিলা আমার পেছনে দাঁড়ানো বর্ষাকে দেখতে পেলেন। দরজার কাছটায় আলো তেমন জোরালো নয়। কিন্তু ওদের দুজনের মুখ আমি স্পষ্টভাবেই দেখতে পাচ্ছিলাম।
না, ওরা একে অপরকে আগে কখনও দেখেনি।
আমি ভেজা ছাতাটা দরজায় পাশে রাখলাম। তারপর শর্মিলাকে একরকম পাশ কাটিয়েই ভেতরে ঢুকে গেলাম।
বর্ষাও দরজায় পাশে ছাতা রেখে বাধ্য মেয়ের মতো আমাকে অনুসরণ করল।
সামনের ঘরের দরজা খোলা ছিল। একটা মোড়া আর একটা এলোমেলোভাবে ভাঁজ করা খবরের কাগজ চোখে পড়ছিল।
ঘরে ঢোকার আগে আমি শর্মিলা আর বর্ষাকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। বললাম, ম্যাডাম, আপনার ঘাবড়ানোর কোনও কারণ নেই। বর্ষা আমার অফিস কোলিগ। তা ছাড়া দত্তগুপ্তের কাছে ও পার্ট টাইম কাজ করত…ফার্স্ট লেভেলের। দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ ওর ফোন নাম্বার পেয়েছে। হেসে বললাম, আমাদের তিনজনের একই প্রবলেম। সেই প্রবলেম সলভ করার জন্যেই আপনার কাছে এসেছি।
দেখে মনে হল, শর্মিলা খানিকটা যেন ধাতস্থ হলেন। একটু সময় নিয়ে বললেন, জনি পাশের ঘরে টিভি দেখছে।
জনির ইংরেজি গানের কলি আমার কানে আসছিল। বোধহয় এম টি ভি এনজয় চালিয়ে টিভির গানটাই মুখস্থ করছে।
ঘরটাকে চট করে একটু গুছিয়ে নিয়ে শর্মিলা আমাদের বসতে বললেন। সামান্য দূরে নিজেও বসলেন। ওঁর পরনে ম্যাক্সি। চুলের গোছা কপালে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে। হালকা পারফিউমের গন্ধ নাকে আসছে।
কাল নানাভাইয়ের ওখানে কী হল, মিস্টার মিত্র?
আমি হাত তুলে ওঁকে ইশারা করলামঃ পরে বলছি। আগে আপনি বলুন, দত্তগুপ্ত কি চুরুট খেতেন?
শর্মিলার ভুরু কুঁচকে গেল।
কাছেই কোথাও টিনের চালের ওপরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে রিমঝিম শব্দ হচ্ছিল। বৃষ্টির কেমন একটা গন্ধও নাকে আসছিল।
মাঝে-মাঝে মিস্টার দত্তগুপ্তকে যেন চুরুট খেতে দেখেছি। থেমে-থেমে বললেন শর্মিলা।
আগেও এই কথাই আমাকে তিনি বলেছিলেন।
বর্ষা সঙ্গে-সঙ্গে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, আমি ইশারায় ওকে থামিয়ে দিলাম। বর্ষা কী বলেছে আমার স্পষ্ট মনে আছে। দত্তগুপ্ত ক্লাসিক সিগারেট খেতেন।
