আমি শুরু থেকে অঙ্কটা ভাবছিলাম।
দত্তগুপ্ত হয়তো খারাপ কাজ করত, কিন্তু তাই বলে কি খুনি পার পেয়ে যাবে। তা ছাড়া আসল খুনির হদিস না পেলে হয়তো আমাকেই তার বদলে জেলে গিয়ে প্রক্সি দিতে হবে। বাপি আমাকে বেশিদিন কাছে পাননি, কিন্তু তারই মধ্যে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছিলেন। আমি যে এখন কী করি!
পিনাকী দত্তগুপ্ত, শর্মিলা বোস, ঘটনার দিন রাতে সিঁড়ি বেয়ে-ওঠা মোটা মতন সেই অবাঙালি ভদ্রলোক, নানাভাই, বর্ষা, এবং আমি। এই খুনের ব্যাপারে কারও গুরুত্বই কারও চেয়ে কম নয়। কিন্তু আমি কি মিথ্যে-মিথ্যে ভয় পাচ্ছি? এমন কি হতে পারে যে, সম্পূর্ণ অচেনা কেউ সম্পূর্ণ অজানা কোনও কারণে পিনাকী দত্তগুপ্তকে খুন করেছে! হতেও তো পারে।
বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। দীর্ঘশ্বাসকে বললাম, তোরা যত খুশি বুক ঠেলে লাইন দিয়ে পরপর বেরিয়ে আয়, কিন্তু আমার প্রবলেমটা সম্ভ করে দে।
বিছানায় উঠে বসে একটা সিগারেট ধরালাম।
সেই মুহূর্তেই মনে হল, কোথায় যেন একটা গরমিলের খোঁজ পেয়েছি আমি। কার একটা কথায় যেন আমার খটকা লেগেছিল। কে যেন বলল কথাটা! কে যেন…।
বহু চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না। কিন্তু আমার মন বলছিল, ওই কথাটা মনে পড়লেই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাব আমি।
রাতে বাড়ি ফিরতেই মিলি বলেছে আমার অফিস থেকে বর্ষা দাশগুপ্ত নামে একজন ফোন করেছিলেন। আমার মোবাইলে নাকি বহুবার চেষ্টা করেও লাইন পাননি।
অনেকসময় দেখেছি আকাশ মেঘলা থাকলে অথবা বৃষ্টি হলে মোবাইল ফোনের স্যাটেলাইট ঠিকমতো কাজ করে না। ফোনের ডিসপ্লেতে টাওয়ারের সিগনালটা কমজোরি হয়ে নেমে যায়। কাল হয়তো সেইজন্যেই বর্ষা লাইন পায়নি।
আজকের রাতটা খুব ঠান্ডা মাথায় আমাকে চিন্তা করতে হবে। অজস্র ভাঙা কাচ ছড়ানো পথে খুব সাবধানে পা ফেলে হাঁটতে হবে। তারপর গন্তব্যে পৌঁছনো যাবে।
তাই বর্ষাকে আর ফোন করিনি। অন্ধকার ঘরে শুয়ে-শুয়ে শুধু ভেবে চলেছি। অথচ তারই মধ্যে বর্ষার কথা মনে পড়ছিল।
এইভাবেই নানান কথা ভাবতে-ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি।
পরদিন ঘুম ভাঙল মায়ের ডাকাডাকিতে।
উঠেই দেখি ঘড়ির কাঁটা নয়ের ঘর পেরিয়ে গেছে।
মা বলল, কী রে, আজ অফিসে বেরোবি না?
না, শরীরটা ভালো নেই।
শরীরের আর দোষ কী! দিন-রাত্তির টো-টো করলে কখনও শরীর ভালো থাকে!
কাল বৃষ্টিতে ভিজে আমার একটু ঠান্ডামতন লেগে গিয়েছে। একটা নাক রাত থেকে বন্ধ হয়ে আছে, গা ম্যাজম্যাজ করছে।
মায়ের কথার স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে বিছানা ছেড়ে নামলাম। কলতলায় গিয়ে চোখেমুখে জল দিতে চোখ জ্বলতে লাগল।
ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে ফিরে আসতেই মিলি খবরের কাগজ আর চা দিয়ে গেল। খবরের কাগজে দত্তগুপ্তকে নিয়ে এ কদিন আর কোনও খবর ছাপা হয়নি–আজও কোনও খবর নেই।
চায়ের পর সিগারেট ধরিয়ে আরও আধঘণ্টা সময় কাটালাম। বিছানার ওপরে খবরের কাগজটা ভোলা ছিল। সেখানে একটা বড় মাপের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ছিল। সিগারেটের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে ওরা দাবি করছে যে, ওদের সিগারেটের তামাকটা খুব হালকাও নয়, খুব কড়াও নয়– ঠিক যেমনটি আপনি চান।
কাল থেকে মনে-না-পড়া কথাটা আমার মনে পড়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।
বর্ষাকে অফিসে ফোন করলাম।
ফোন ধরেই ও একলক্ষ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল আমার দিকে।
ওর প্রশ্নের জোয়ারে ডুবে যেতে-যেতে আমি বললাম, শরীরটা ভালো নেই। আমি আজ অফিসে যাব না। তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে। টেলিফোনে নয় সামনাসামনি কথা হওয়া দরকার। আজ সন্ধেবেলা ফ্রি আছ?
অফ কোর্স! সবকিছু জানার জন্যে ছটফট করছি।
সাড়ে ছটার সময়ে জগৎ সিনেমা হলের সামনে আসতে পারবে? আমি পাঁচ মিনিট আগে থেকেই তোমার জন্যে ওখানে ওয়েট করব। দেখা হলে সব বলব…।
ও.কে., রীতেনদা।
সি য়ু অ্যাট সিক্স থার্টি…।
ফোন শেষ করে ভাবতে বসলাম, বর্ষাকে কীভাবে সব বলব। সবকিছু কি ওকে বিশ্বাস করে বলা যায়? ওরও তো দত্তগুপ্তের সঙ্গে কোনও সমস্যা তৈরি হয়ে থাকতে পারে শর্মিলার মতন! তা হলে কতটুকু ওকে নিরাপদে বলা যায়?
এইসব উথালপাথাল ভাবনায় দুপুর প্রায় গড়িয়ে গেল। সেই সময়ে শর্মিলার ফোন এল।
কৌতূহল বড় বিচিত্র জিনিস–বিশেষ করে মেয়েদের।
মিস্টার মিত্র, শর্মিলা বোস বলছি।
হ্যাঁ–বলুন।
কাল নানাভাইয়ের ওখানে কী হল?
রশিদ আপনাকে বলেনি?
কয়েক সেকেন্ড ও-প্রান্ত চুপচাপ। তারপর ঘনিষ্ঠ অভিমানী গলায়ঃ বলতে না চান বলবেন না–এরকমভাবে ইনসাল্ট করার কী আছে!
শর্মিলা কি আমাকে নিয়ে অন্যরকম কিছু ভাবতে শুরু করেছেন। জনির সঙ্গে ওঁর বিয়ে হয়েছে মাত্র মাসছয়েক। এর মধ্যেই শেকল আলগা হয়ে পড়তে চাইছে! নাকি এটা ওঁর স্বভাব?
পরের দিকে শুধু লাস্ট লেভেলের কাজই করতাম। প্রথম-প্রথম অভাবের জন্যে…শেষ দিকে হয়তো স্বভাবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল..কে জানে! শর্মিলার কথাগুলো মনে পড়ে গেল আমার।
আমি বললাম, না, না, সেরকম কিছু নয়। ফোনে তো এত কথা বলা যায় না! সামনাসামনি দেখা হলে বলব।
এখনই আমার এখানে চলে আসুন না। বাড়িতে কেউ নেই–একা-একা ভীষণ বোর হচ্ছি। আপনার কথা শুনতে-শুনতে সময় কেটে যাবে…।
শর্মিলার স্বভাব দেখছি পিনাকী দত্তগুপ্তকে অমর করে রাখবে।
