ওর সুইচ অফ করে দিল কে? নানাভাই বিড়বিড় করে বললেন।
আমি ব্যাপারস্যাপার ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শর্মিলা আমাকে বলেছেন, পিনাকী দত্তগুপ্তের ব্যাপারটা নানা জানেন। হয়তো নানাই ওঁর কাম তামাম করে দিয়েছেন। অথচ দত্তগুপ্ত মার্ডার হলে নানার আয় মাসে-মাসে দশহাজার টাকা করে কমে যাবে। সবকিছু কেমন যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। নানাভাইয়ের কাছে শর্মিলার নাম বলাটা কি ঠিক হবে? নাকি…।
ঠিক আছে, মিত্তিরবাবু। এই মার্ডারের ব্যাপারটা আমি ইনভেস্টিগেট করে দেখছি। তবে আপনার কোনও ভয় নেই। আপনি ভদ্দরলোক–তার ওপর আবার কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। আমি কড়েয়া থানায় মেসেজ পাঠিয়ে দেব আপনাকে কেউ ট্রাবল দেবে না। হ্যাঁ, যা বলছিলাম…।
আমি নানার কথার প্রতিবাদ করে বলতে যাচ্ছিলাম যে, আমি ইঞ্জিনিয়ার নই নিতান্তই একজন ছাপোষা প্রোগ্রামার। কিন্তু নানাভাই একটানা কথা বলে যাচ্ছিলেন।
আমি আরও দুটো কম্পুটার কিনছি। এই তিনটে মেশিন এসি রুমে বসিয়ে দেব। আপনি এখন কত করে স্যালারি পান?
আমি বিরাট একটা ধাক্কা খেলাম। নানাভাই কোনদিকে এগোতে চাইছেন? কিন্তু পরিস্থিতি সুবিধের নয়। তাই মিনমিন করে জবাব দিলাম, সাড়ে দশহাজার মতো।
ব্যস! তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন নানাভাই ও এতে কোনও ভদ্দরলোকের মাস চলে! আপনি আমার কম্পুটার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যান। মান্থলি বিশহাজার পাবেন–উইথ পার্ক। কিঁউ?
অপমানে আমার মুখে কোনও কথা জোগাচ্ছিল না। ঠোঁটজোড়া যে থরথর করে কাঁপছে সেটা ভালো করেই টের পেলাম। কেন যে মরতে আমি এখানে এলাম! শরীরটা শক্ত করে আমি মাথা নীচু করে বসে রইলাম। বর্ষার কথা ভেবে নিজেকে শান্ত করতে চাইলাম।
নানাভাই মুচকি মুচকি হাসছিলেন। আড়চোখে সে হাসি আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, আর ভেতরে-ভেতরে জ্বলছিলাম।
হিকপিক কম্পিউটারের কাছ থেকে পায়ে-পায়ে এগিয়ে এল আমার কাছে। মা যেমন করে অভিমানী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় সেভাবে আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, নানাভাইয়ের আপনাকে পছন্দ হয়েছে। তাই এরকম দারুণ অফার দিয়েছেন। রাজি হো যা, লালটু, রাজি হো যা–।
আমার কান্না পেয়ে যাচ্ছিল। দু-গাল থেকে আগুনের হলকা ঠিকরে বেরোচ্ছিল। হে ভগবান! যদি তুমি সত্যিই থেকে থাকে, তা হলে আমাকে অপমান সহ্য করার শক্তি দাও। আর যদি না থেকে থাকে, তা হলে তো মিটেই গেল!
কা মিত্তিরবাবু, কুছ বোলিয়ে…। নানাভাইয়ের গলা পেলাম।
আরও কিছুক্ষণ সময় নেওয়ার পর মুখ তুললাম। আমার মুখ দেখে নানাভাইয়ের মুখটা একটু বদলে গেল। হিকপিক একটু সরে দাঁড়াল আমার কাছ থেকে।
দাঁতে দাঁত চেপে আমি বললাম, আমার নতুন চাকরির দরকার নেই, নানাভাই। পুরোনোটাতেই বেশ চলে যাচ্ছে।
আপনার তো গুসসা হয়ে গেল দেখছি।
আমি হিকপিকের দিকে একবার তাকিয়ে বললাম, আপনি যদি রাগ না করেন তা হলে কয়েকটা কথা বলি, নানাভাই…।
হাঁ, হাঁ বলুন, বলুন। হাত নেড়ে আমাকে উৎসাহ দিলেন নানা।
এই যে আপনার শাগরেদ হিকপিক ইশারায় হিকপিককে দেখালাম আমি ও ওর যা চেহারা তাতে ঝোড়ো বাতাসে রাস্তায় বেরোতে পারবে না–হাওয়ায় উড়ে যাবে। ওর বডি এত সরু যে, মেঝেতে কোনও ছায়া পড়বে না। ওর নাম হিকপিকের বদলে লিকপিক হলে মানানসই হত। তা সত্ত্বেও ওর কী সাহস দেখুন–। হাসলাম আমি ও তার কারণ ওর পেছনে আপনি আছেন– আমার পেছনে কেউ নেই। ওর পকেটে হয়তো আমর্স আছে–আমার নেই। খোদা মেহেরবান তো ঢুহা পহেলবান।
আমার কথায় হো-হো করে হেসে উঠলেন নানাভাই। গ্লাসের ওষুধটুকু এক ঝটকায় গলায় ঢেলে দিয়ে ঠোঁট চেটে নিয়ে মজা পাওয়া গলায় বললেন, মিত্তিরবাবু মরদ আছেন দেখছি। তো আমি যদি ওই শালা হিকপিকের পেছনে না থাকি, ওর পকেটে যদি কোনও আর্মস না থাকে, তা হলে আপনি কী করবেন?
আমি উঠে দাঁড়ালামঃ দেখিয়ে দেব যে, আমি লালটু নই। ওরকম তিন-চারটে হিকপিককে পালিশ করার হিম্মত রাখি।
হিকপিক আমার দিকে তেড়ে আসতে যাচ্ছিল, আমি হাত তুলে ওকে থামতে ইশারা করলাম, বললাম, এখনও থামো, নইলে দেরি হয়ে যাবে। তারপর নানাভাইয়ের দিকে ফিরে : আজ চলি, নানাভাই। আমার ব্যাপারটা একটু দেখবেন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আমি নানার তিনজন শাগরেদের ম্যাপই মাথায় টুকে নিয়েছিলাম। এই মুখগুলো কখন কোথায় কাজে লাগে কে জানে!
নানার টেবিলে রাখা মোবাইল ফোন বেজে উঠল।
হিকপিক আমার পাশে-পাশে দরজার দিকে এগোচ্ছিল। চাপা গলায় হিসহিস করে বলে উঠল, তেরা হিসাব ম্যায় ফিট কর দুঙ্গা।
আমার মাথার ভেতরে আগুন জ্বলে গেল। রাগে পাগল হয়ে আমি এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ালাম। খপ করে হিকপিকের চোয়াল চেপে ধরলাম ও অভি ওয়ক্ত হ্যায়, লালটু, সুধর যা।
কথাটা বলেই ওকে পেছনদিকে আলতো করে ঠেলে দিলাম। হিকপিক চার্লি চ্যাপলিনের মতো টাল খেতে-খেতে পেছিয়ে গেল।
নানা কিংবা তার অন্য শাগরেদরা একটি কথাও বলল না, জায়গা থেকেও নড়ল না। বরং মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।
বাইরে এসে রশিদকে পেলাম। ওকে ছোট্ট করে ধন্যবাদ জানিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটতে শুরু করলাম।
.
০৭.
রাতে বিছানায় শুয়ে-শুয়ে একটা জটিল অঙ্ক মেলাতে চেষ্টা করছিলাম।
নানাভাইয়ের টেবিলে আমি সিগারেটের প্যাকেট দেখেছি, চুরুট নয়। কিন্তু সেটাই কি শেষ কথা? পুলিশ মার্ডার ওয়েপনটা পেয়েছে কি না আমি জানি না–জানার কোনও উপায়ও নেই। যদি পেয়ে থাকে, তা হলে সেটা কি দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাট থেকে পাওয়া গেল, না কি অন্য কোথাও থেকে।
