মাথায় শতকরা নব্বই ভাগ মরুভূমি। মাথার পেছনদিকটায় আর কানের পাশে ছিটেফোঁটা মরূদ্যান। গায়ের রং কালো। বছর পঞ্চাশের থলথলে মুখ। ঠোঁটের ওপরে কাঁচাপাকা গোঁফ আর কাঁচাপাকা চাপদাড়ি। দাড়ির নীচেও চিবুকের ভাঁজ চোখে পড়ছে।
নানাভাইয়ের পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। গলায় পাহাড়ি কাঁকড়াবিছের লেজের মতো মোটা সোনার চেন। ডান হাতের ডুমো ডুমো আঙুলে চারটে পাথর বসানো ভারী সোনার আংটি। ডানহাতের কবজিতে সোনার রিস্ট ব্যান্ড।
নানাভাইয়ের সামনের টেবিলে দুটো মোবাইল ফোন পড়ে আছে। তার পাশে কাটগ্লাসের নকশা তোলা গ্লাসে নেশা টলটল। তার কাছাকাছি নেশার বোতল, সোডার বোতল, চিকেন পকোড়ার প্লেট, আর পাঁচশো পঞ্চান্ন সিগারেটের প্যাকেট।
টেবিলে আরও চোখে পড়ল একটা ডায়েরি, তিনটে পেন, আর ডানদিক ঘেঁষে একটা পারসোনাল কম্পিউটার।
ঘরের বাঁদিকের দেওয়ালে বসানো রয়েছে একটা এয়ারকুলার মেশিন। কিন্তু মেশিন বোধহয় খারাপ–তাই তিনটে সিলিং পাখা ঘুরছে।
নানাভাইয়ের টেবিলের এদিকটায় চারটে গদিমোড়া চেয়ার–গেস্টদের জন্যে। সেখানে মাঝারি চেহারার একজন বসে ছোলা বা বাদাম কিছু একটা চিবোচ্ছে। এ ছাড়া দরজার ডানদিকে লম্বা গদিওয়ালা বেঞ্চে দুজন লোক বসে রয়েছে। ওদের চেহারা আর হাবভাব স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে। ওরা নানাভাইয়ের ছেলে। ওদের মধ্যে একজনকে কেন জানি না, চেনা-চেনা মনে হল।
আমি ইতস্তত পায়ে এগিয়ে গেলাম নানাভাইয়ের টেবিলের কাছে। টের পেলাম নানার ছেলেদের একজন আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। নিশ্চয়ই তার ডান হাত পকেটে ঢোকানো এবং সতর্ক নজরে আমার গতিবিধি লক্ষ করছে।
আ-আমার নাম রীতেন মিত্র…।
মুক্তোর মতো ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে নানাভাই হাসলেন। ওঁর ফোলা ফোলা গাল আরও ফুলে উঠল। বললেন, আসুন, আসুন বসুন। রশিদ আপনার ব্যাপারে আমাকে বলছিল।
ওঁর কথায় সামান্য টান টের পাওয়া গেল।
আমি বসলাম। নিজের পরিচয় দিলাম। আতর আর মদের গন্ধ নাক অবশ করে দিচ্ছিল। কিন্তু সহ্য করা ছাড়া উপায় কী!
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পরে বললাম, নানাভাই, একটা প্রবলেমে পড়ে আপনার কাছে এসেছি।
প্রবলেমে না পড়লে আমার গরিবখানায় কেউ আসে না। হাসলেন নানা : বলুন, কী প্রবলেম?
আমি তখন পিনাকী দত্তগুপ্তের খুনের ব্যাপারটা বললাম। বললাম, পুলিশ আমাকে একবার ইন্টারোগেট করেছে–আবার করতে পারে। ওরা বোধহয় মার্ডারটার ব্যাপারে আমাকেই সন্দেহ করছে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ হয়তো আমাকেই অ্যারেস্ট করবে। তবে বর্ষা কিংবা শর্মিলা বোসের কথা বললাম না।
কড়েয়া থানার কে আপনাকে হ্যারাস করছে? মুখার্জিবাবু? দাসবাবু?
আমি তখন ভয় পেয়ে বললাম যে, না, এখনও ঠিক হ্যারাস করেনি। তবে আচমকা হয়তো অ্যারেস্ট করতে পারে। আমি একজন সাধারণ কম্পিউটার প্রোগ্রামার কারও সাতে-পাঁচে থাকি না। এসব ব্যাপার লোক-জানাজানি হলে আমি লজ্জায় কাউকে মুখ দেখাতে পারব না।
ইচ্ছে করেই নানাকে ইন্সপেক্টর বিশ্বাসের নাম বললাম না।
নানা গ্লাসে চুমুক দিলেন, চেয়ারের হাতলে বারকয়েক টোকা মারলেন। কী যেন চিন্তা করতে লাগলেন।
আমি আর থাকতে না পেরে মরিয়া হয়ে জিগ্যেস করলাম, নানাভাই, দত্তগুপ্তকে কি আপনি…মানে, আপনার কোনও লোক কি ইয়ে…মানে, মার্ডার করেছে?
নানাভাইয়ের চিন্তার ঘোর কেটে গেল। আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে গলা ফাটিয়ে হো-হো করে হেসে উঠলেন। দেখাদেখি ওঁর তিন শাগরেদও হাসতে শুরু করল।
আমি ফ্যালফেলে চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো বসে রইলাম। মনের মধ্যে অপমানবোধ খোঁচা মারছিল।
কিছুক্ষণ পর হাসির দমক কমলে, নানাভাই বললেন, আপ বড়া ভোলা সাদাসিধা আদমি হ্যায়, মিত্তিরবাবু। আমার এরিয়ায় বা ক্লায়েন্টদের কানেকশানে অন্য এরিয়ায় মাসে আমাকে দু-পাঁচ দশটা বডি ফেলতে হয়। কবে কোন বডি ফেলেছি তার ডিটেইল্স কি মুখে-মুখে বলা যায়! কী নাম বললেন যেন?
আমি পিনাকী দত্তগুপ্তের নাম-ঠিকানা আবার বললাম।
হিকপিক–।
এই বিচিত্র শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে-সঙ্গে পেছন থেকে চেনা-চেনা মনে হওয়া ছেলেটি ইয়েস বস বলে নানার টেবিলের কাছে এগিয়ে এল।
বুঝলাম, হিকপিক ওর নাম। আচার্য সুনীতিকুমার বেঁচে থাকলে এই নামের উৎপত্তি এবং ব্যুৎপত্তি নিয়ে হয়তো একটা নিষ্পত্তি করে ফেলতেন।
হিকপিক, জেরা দেখ তো, ইয়ে ডায়েরিমে ইয়া কম্পুটারমে উও পিনাকী দগুপ্তকা বডিকা হিসাব হ্যায় কি নহি…।
হিকপিক নানার টেবিল থেকে ডায়েরিটা হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। তারপর একমনে পাতা ওলটাতে লাগল।
আমি চুপ করে বসে রইলাম। মদের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে নানাভাই আমার পাশে বসা ছোলা-কিংবা-বাদাম-চিবোনো লোকটার সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।
হিকপিকের ডায়েরি দেখা শেষ হল। আপনমনেই এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে ও বলল, ডায়েরিমে তো নহি মিলা, বস। অব দেখতে হ্যায় কম্পুটারমে…।
হিকপিকের লিকপিকে রুক্ষ চেহারা দেখে ওকে ভিখিরি ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না। অথচ এই লোকটা লেখাপড়া জানে, কম্পিউটার অপারেট করতে পারে! আমি ওকে শ্রদ্ধা করতে শুরু করলাম।
কম্পিউটারে মিনিটখানেক বোতাম টেপাটিপির পর হিকপিক বলল, হমারা ক্লায়েন্ট থা, বস। মাহিনামে দশহাজার…।
