আমি মাথা নীচু করে কাজে মন দিলাম। প্রেমে গদগদ হায়েনাকে কেমন দেখায় সেটা আমি আর দেখতে চাই না।
***
রশিদ আমাকে পথ দেখিয়ে নানাভাইয়ের আস্তানার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। ওর লম্বা-লম্বা চুল, ভাঙা গাল, লিকলিকে ঢ্যাঙা চেহারা দেখলে কে বলবে ও নানাভাইয়ের হিটম্যান–দু-চারটে খুন ওর কাছে কোনও ব্যাপার নয়!
টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। সঙ্গে ছাতা নেই। তাই দুজনেই অল্পবিস্তর ভিজতে ভিজতে কাদা-জল মাড়িয়ে একটা বস্তির সরু গলি ধরে এগোচ্ছিলাম। কলকাতার কোনও গলিতেই ভদ্রলোকের মতো আলো নেই। এখানেও তাই। কলকাতা চিরকালের জন্যে উন্নয়নশীল রয়ে গেল! সত্যি-সত্যি যদি কোনওদিন কলকাতার উন্নতি ঘটে যায়, তা হলে এখানে উন্নয়নশীল কাজকর্ম যেসব জনগণঅন্তপ্রাণ মহাজন করে থাকেন তাঁরা নিতান্ত বেকার হয়ে পড়বেন।
নানাভাইয়ের অট্টালিকার সামনে পৌঁছে বুকের ভেতরটা ভয়ে মুচড়ে উঠল। বেঘোরে প্রাণ দেওয়ার এই পদ্ধতিটাই যে কেন আমার সবচেয়ে পছন্দ হল কে জানে! ভয় তাড়াতে বর্ষার কথা ভাবতে শুরু করলাম।
পরশুদিন বর্ষার সঙ্গে বিস্তর আলোচনার পর মনে হল, নানাভাইয়ের সঙ্গে আমাকে যোগাযোগ করতে হবে। আমাকে পুলিশ হাজতে পুরে থার্ড ডিগ্রি দেওয়ার আগে আসল খুনিকে ধরা চাই। আর সেটা নিশ্চয়ই রীতেন মিত্রের কর্ম নয়! অতএব নানাভাই।
গতকাল শর্মিলাকে ফোন করেছিলাম। আমার নাম বলামাত্রই তিনি যে-ধরনের হাসি হাসলেন তাতে যে-কোনও লোকের মনে হতে পারে স্পেকট্রাম অ্যাড-এর সঞ্জিত করের ধারণাটাই ঠিক। আবার দত্তগুপ্ত বেঁচে থাকলে বলতেন, শর্মিলা বোস ফার্স্ট লেভেলের কাজ করছে।
কেমন আছেন, ম্যাডাম?
ভালোই। আপনি?
আপাতত ঠিক আছি–তবে আপনার হেল্প না পেলে আমার ফিউচার টেনস হতে পারে। আর তাই নিয়েই ভীষণ টেনশানে আছি।
বলুন, কী হেল্প করতে হবে।
নানাভাইকে একটু কনট্যাক্ট করতে চাই। আপনি ফোন নাম্বার দিয়েছেন ঠিকই তবে ডায়রেক্টলি ফোন করাটা বোধহয় ঠিক হবে না।
নানাভাইকে ফোন করে আপনি কী বলবেন?
আবার সেই একই প্রশ্ন! শর্মিলা কি চান না আমি নানাভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি? কিন্তু শর্মিলা তো এও জানেন, আমাকে হেল্প না করে ওঁর উপায় নেই। আমি পুলিশের ঝামেলায় জড়ালে উনিও রেহাই পাবেন না। তাতে হয়তো জনির সঙ্গে ওঁর প্রেমের বিয়েটা চটকে যাবে।
একটু হেসে বললাম, আমি মহিলা হলে কোনও প্রবলেম ছিল না। কারণ, আপনিই তো বলেছেন নানাভাই মহিলাদের খুব রেসপেক্ট করেন। কিন্তু পুরুষদের কী করেন? পিনাকী দত্তগুপ্তের মতো কাম তামাম করে দেন?
শর্মিলা কিশোরীর মতো হেসে উঠলেনঃ দত্তগুপ্তের সঙ্গে আপনার কোনও তুলনা চলে না। একটু থেমে আদুরে গলায় বললেন, আপনি দারুণ অ্যাট্রাকটিভ।
আমার হাত থেকে ফোনের রিসিভারটা আর-একটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল। আমাকে এইরকম ভালো-ভালো কথা বলার জন্যে শর্মিলা পরে হয়তো সেল ট্যাক্সসমেত বিল পাঠাবেন।
ম্যাডাম, প্লিজ। আমার অবস্থাটা একবার বুঝুন। নানাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার একটা ব্যবস্থা করে দিন।
শর্মিলা তখন আমাকে রশিদের কথা বলেন। ওর ফোন নাম্বার দেন। তারপর ও রশিদের সঙ্গে আমার আলাপ আছে। আমি ওকে ফোন করে আপনার কথা বলে দিচ্ছি। আপনি আধঘণ্টা পরে ওকে ফোন করুন। তবে খুব কেয়ারফুলি কথাবার্তা বলবেন। ও নানাভাইয়ের একনম্বর হিটম্যান।
যখন টেলিফোন ছাড়তে যাচ্ছি তখন শর্মিলা আবার জানতে চাইলেন, নানাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে আমি কী করব।
মনে-মনে ভীষণ বিরক্ত হলেও মিষ্টি গলায় উত্তর দিলাম, নানাভাই কেমন আছেন, তাঁর আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব কেমন আছে, সে-কথা জিগ্যেস করব। তারপর জানতে চাইব, দত্তগুপ্তকে মার্ডারের গুপ্তকথা। একটু হেসে যোগ করলামঃ পরে আপনাকে সব জানাব।
এবং রিসিভার নামিয়ে রাখলাম।
টিন ও টালির তৈরি খুপরি গোছের বেঁকাতেড়া ঘরগুলোর প্রায় গা ঘেঁষে জিরাফের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে নানাভাইয়ের প্রাসাদ। বস্তির কারুকার্যের পাশে শ্রাবস্তীর কারুকার্য বড়ই বেমানান ঠেকছিল।
কোলাপসিবল গেটের সামনে জোরালো আলো জ্বলছিল। ভেতরে একটা ঘরের খানিকটা অংশ চোখে পড়ছিল। লোকজনের চাপা কথাবার্তার আওয়াজ কানে আসছিল।
রশিদ পকেট থেকে একটা মোবাইল ফোন বের করে ডায়াল করল। চাপা গলায় কী সব কথা বলল। তারপর আমাকে হাত নেড়ে ইশারা করলঃ যাইয়ে, অন্দর যাইয়ে, ভঁয়ে তরফ কা বড়া কামরা। পহেলে আপনা নাম বনা–নানাভাই সমঝ জায়েঙ্গে।
রশিদের নির্দেশমতো ভেতরের দিকে পা বাড়ালাম। ভয়ে ঠকঠক করে পা কপার ব্যাপারটা যে নেহাতই কথার কথা নয় সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছিলাম। বেশ কষ্ট করে হাঁটি হাঁটি পা পা করে ডানদিকের একটা বড় ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
দরজায় গ্রিলের পাল্লা হাট করে খোলা। তারপর কাঠের পাল্লা। হয়তো বাড়তি নিরাপত্তার কথা ভেবেই এই ব্যবস্থা। যারা মানুষের কাছে ভয় ফিরি করে বেড়ায় তারাও তা হলে ভয় পায়!
ঘরের ভেতরে ঢুকতেই শৌখিন আতর আর মদের গন্ধ আমার নাকে ঝাপটা মারল। একেবারে পেছনের দেওয়াল ঘেঁষে কাঁচে ঢাকা বড়সড়ো এক্সিকিউটিভ টেবিল। তার ওপিঠে গদিমোড়া ঘূর্ণি চেয়ার। তাতে শরীর এলিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে যিনি আয়েসি ঢঙে বসে আছেন তিনিই বোধহয় নানাভাই।
