জনি একটা মোড়া টেনে নিয়ে আমাদের কাছাকাছি বসে পড়ল। অনুরোধের সুরে বলল, অ্যাডের কাজ-টাজের খোঁজ পেলে ওকে দেবেন। ওর মধ্যে পার্টস আছে কিন্তু ভালো চান্স পায়নি। তবে যারাই ওকে দিয়ে কাজ করিয়েছে দে গট হুন্ড। হোয়াট ডু য়ু সে, হানি? জনি হো-হো করে হেসে উঠল।
হাসতে-হাসতে হঠাৎই ওর খেয়াল হল আমি দাঁড়িয়ে আছি। তাই বলল, আপনি বসুন — শর্মিলার দিকে ফিরে : ওঁকে চা-টা দিয়েছ?
শর্মিলা কিছু বলার আগেই আমি বললাম, আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে–আর বসব না। আজ চলি–পরে আবার দেখা হবে।
শর্মিলা আমাকে সদর পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।
হঠাৎই একটা কথা মনে পড়ায় ওঁকে জিগ্যেস করলাম, ম্যাডাম, দত্তগুপ্ত কি চুরুট খেতেন?
আচমকা এই ধরনের প্রশ্নে শর্মিলা কেমন যেন হকচকিয়ে গেলেন। তারপর একটু ভেবে বললেন, হ্যাঁ, মাঝে-মাঝে মিস্টার দত্তগুপ্তকে যেন চুরুট খেতে দেখেছি।
আমার কপালে ভাঁজ পড়ল। কী যে করি এখন! এভাবেই কি আমাকে আঁধারকানা হয়ে ঘুরে-ঘুরে মরতে হবে! বর্ষা যদি ফোন করে তা হলে ওর সঙ্গে একটু আলোচনা করে দেখি।
শর্মিলাদের ঘর থেকে আবছাভাবে ইংরেজি গানের কলি ভেসে আসছিল। জনি গান গাইছে। তারপরই নাম ধরে স্ত্রীকে ডাকল জনি। একবার। দুবার।
শর্মিলা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছলেন। তারপর ব্যস্তভাবে বললেন, যাই–পরে আপনাকে ফোন করব। আপনিও দরকার হলে ফোন করতে পারেন। দুপুরে করবেন–জনি তখন থাকবে না।
আবার রাস্তার আমার সঙ্গী হল। তবে সূর্যের পালা এখন শেষ। একটু পরেই চাঁদের পালা শুরু হবে।
.
০৬.
বাড়ি ফেরার পর আমার ঝোড়ো কাকের মতো চেহারা দেখে মা আঁতকে উঠল। কয়েক লাইন বকুনি দিয়ে তারপর গজগজ করতে করতে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল এনে দিল। প্রায় শাসনের সুরে বলল, এবার একটু বিশ্রাম কর। বাড়ি থেকে আর বেরোস না।
মা কথাগুলো না বললেও পারত। কারণ, আমার শরীর আর বইছিল না। নিজের ঘরে গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে ফুল স্পিডে পাখা চালিয়ে বিছানায় গা ঢেলে দিলাম। এলোমেলো চিন্তা মনের মধ্যে ঝড় তুলতে লাগল। তারই মধ্যে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
ঘুম ভাঙল মোবাইল ফোনের সুরেলা আওয়াজে।
ধড়মড় করে ঘুম ভেঙে উঠে দেখি ঘর অন্ধকার। মোবাইল ফোনটা টেবিলে রাখা ছিল। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে সেদিকে এগোতে এগোতেই ফোনের বাজনা বন্ধ হয়ে গেল। ইস, বোধহয় বর্ষার ফোন ছিল।
আলো জ্বেলে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে মিসড কল-এর লিস্টে ফোন নাম্বারটা দেখলাম। না, বর্ষার নাম্বার নয়। আমার চেনা অন্য কোনও নাম্বারও নয়।
এরপর সিগারেট, চা, আর দুশ্চিন্তা নিয়ে সময় কাটতে লাগল। একসময় আর পেরে না উঠে টেপ রেকর্ডারে গান চালিয়ে দিলাম। ধীরে-ধীরে দত্তগুপ্ত, শর্মিলা, জনি, নানাভাই, সবাই আবছা হয়ে আসতে লাগল।
কিন্তু বর্ষার ফোন এল না।
রাত প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ আর থাকতে না পেরে বর্ষাকে ফোন করলাম। বোধহয় ওর মা ধরলেন। ধরেই প্রশ্ন করলেন, কে বলছেন?
আমি নাম বললাম।
বর্ষা এখন নেই। একটু কাজে বেরিয়েছে। আপনি কাল সকাল আটটা নাগাদ ফোন করবেন– পেয়ে যাবেন।
ফোন শেষ হওয়ার পর বেশ ধন্দে পড়ে গেলাম। এত রাতে কোন কাজে বেরিয়েছে বর্ষা! দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে গিয়ে কোনও বিপদে পড়ল না তো! নাকি মিস রোজির বাড়িতে গেছে!
পরদিন অফিসে গিয়ে আমার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম।
অন্যান্য অস্কার নমিনিকে উপেক্ষা করে বর্ষা সরাসরি চলে এল আমার কাছে। ফ্যাকাসে মুখে বলল, রীতেনদা, কাল আপনি ফোন করেছিলেন? আমি তখন কড়েয়া থানায় গিয়েছিলাম।
শুনে আমার ফ্যাকাসে হওয়ার পালা।
থানায়! তার মানে!
ও নীচু গলায় সব বলল।
কড়েয়া থানা থেকে ওকে ডেকে পাঠিয়েছিল। পাড়ার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে ও থানায় দেখা করতে গিয়েছিল। বর্ষা জানত, সন্ধের পর কোনও মহিলাকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে থানায় ডেকে পাঠানো যায় না। কিন্তু কৌতূহল ওকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
সেখানে পুলিশকে ও যা বলার বলেছে। এও বলেছে, খুনের ব্যাপারে ও কিছু জানে না। পুলিশের ধারণা, দত্তগুপ্তকে কেউ বদলা নেওয়ার জন্যে খুন করেছে। কোনও মাফিয়া ডনও খুনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে।
আচ্ছা, বর্ষা, মিস্টার দত্তগুপ্ত কি চুরুট খেতেন?
আমার আচমকা প্রশ্নে ও থতোমতো খেয়ে গেল, বলল, না তো! উনি ক্লাসিক খেতেন। মিস রোজিকে একদিন আমার সামনেই প্যাকেট বের করে অফার করেছিলেন আমি দেখেছি।
আমার মনের ভেতরে ঝড় উঠল। হে নিয়তি, এ তোমার কেমন খেলা!
বর্ষা চাপা গলায় জিগ্যেস করল, আপনার ছুটোছুটির কী রেজাল্ট হল?
ছায়ার সাথে কুস্তি করে গাত্রে হল ব্যথা। হেসে বললাম, এখন নয়। এক্ষুনি পুরকায়স্থ তোমাকে তলব করে বসবে। চলো, আজ বাইরে লাঞ্চ করব। তখন সব বলব…।
বর্ষা ঘাড় কাত করল। ওর শ্যাম্পু করা চুল বিজ্ঞাপনের মতো দেখাল।
আমি মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখছিলাম, হঠাৎই দেখি প্রকাশ রায়চৌধুরী হিংস্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি বর্ষাকে বললাম, বর্ষা, এবার একটু প্রকাশের কাছে যাও–বৃষ্টি দাও। নইলে ওর চোখ মুখের যা হিংস্র অবস্থা দেখছি তাতে সামনে যাকে পাবে তাকেই কামড়ে দেবে।
এত সমস্যার মধ্যেও বর্ষা হাসল। হেসে সত্যি-সত্যিই চলে গেল প্রকাশের টেবিলের কাছে।
