কে নানাভাই? আমি জিগ্যেস করলাম।
আড়চোখে হাতঘড়ির দিকে একবার দেখলেন শর্মিলা। তারপর ঢোঁক গিলে বললেন, মিস্টার দত্তগুপ্তের এলাকাটা ওঁর দখলে। দত্তগুপ্ত মাসে-মাসে নানাভাইকে দশহাজার টাকা করে দিতেন।
নানাভাইয়ের কাছে আপনি কবে গিয়েছিলেন?
লাস্ট মান্থে।
তারপর?
নানাভাইকে আমি চিনতাম। দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটেই একবার আলাপ হয়েছিল। আমার কথা শুনে নানা বললেন, কোনও চিন্তা নেই। সব প্রবলেম সম্ভ হয়ে যাবে। তারপর…।
নানাভাইকে আপনি কোনও টাকা দিয়েছিলেন?
না, না! কোনও টাকা দিইনি।
নানাভাই কীভাবে প্রবলেম সলভ করবেন বলেছিলেন?
না বলেননি।
তা হলে কি নানাভাই সবচেয়ে সোজা-সরল পথে প্রবলেমটা সল্ভ করে দিয়েছেন! দত্তগুপ্তের মুখের ওপর বালিশ চাপা দিয়ে তারপর…।
হঠাৎই শর্মিলা বললেন, নানাভাই মহিলাদের খুব রেসপেক্ট করেন। আমার অবস্থায় কথা শুনে ছোট্ট করে শুধু বলেছিলেন, ম্যাডাম, আপনার কথা যদি সাচ্চা হয় তা হলে ওই বাস্টার্ডটার আমি কাম তামাম করে দেব। আর যদি খোঁজ নিয়ে দেখি আপনি মিথ্যে কথা বলেছেন, তা হলে আমার ছেলেরা আপনাকে পাবলিক প্লেসে বেইজ্জত করে ছাড়বে। তখন…তখন আমি কেঁদে নানাভাইয়ের পা জড়িয়ে ধরি…।
কিন্তু আপনি এটা খেয়াল করেছেন, দত্তগুপ্তকে মার্ডার করলে নানাভাইয়ের মান্থলি ইনকাম দশহাজার টাকা করে কমে যাবে।
হ্যাঁ জানি। সেইজন্যেই তো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না..দত্তগুপ্তকে কে মার্ডার করল…আপনি আমাকে ফর নাথিং সন্দেহ করছেন।
আমার মনের ভেতরে একটা ঘূর্ণি তৈরি হচ্ছিল। এ কোন জটে জড়িয়ে পড়লাম আমি! বর্ষার কথাটা মনে পড়ল? আমরা চুপচাপ থাকি না! আমাদের ঝামেলায় জড়ানোর কী দরকার!
আমি কি তা হলে ভুল করছি?
আপনি এখন কী করতে চান? শর্মিলার আচমকা প্রশ্নে আমি চমকে উঠলাম।
সত্যিই তো! এখন কী করব আমি? কেমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়লাম।
একটু পরেই মনে হল, পুলিশ বরং পুলিশের কাজ করুক। আমি আর বর্ষা চুপচাপ থাকি। যদি পুলিশ তদন্ত করতে করতে আমাকে কিংবা বর্ষাকে অ্যারেস্ট করে হ্যারাস করে, তখন না হয় কিছু একটা করা যাবে। দরকার হলে নানাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে বিপদের কথা বলব।
নানাভাইয়ের ফোন নাম্বারটা আমাকে দিতে পারেন?
কেন, কী করবেন? শর্মিলা যেন ভয় পেয়ে গেলেন।
ফোন নাম্বার নিয়ে লোকে কী করে–ফোন করে। আমিও তাই করব। নানাভাইয়ের ফোন নাম্বারটা আমাকে দিন। আমার শেষ কথাটায় একটু কড়া সুর ছিল।
শর্মিলা আমার চোখে কী যেন দেখলেন। তারপর তড়িঘড়ি উঠে গিয়ে একটা ডায়েরির পাতা উলটে নানাভাইয়ের ফোন নাম্বারটা আমাকে বললেন। আমি মোবাইল ফোনের বোতাম টিপে নাম্বারটা টেলিফোন ডিরেক্টরিতে ঢুকিয়ে নিলাম।
শর্মিলা তখন আমার মোবাইল নাম্বারটা চাইলেন। দিলাম। এবং ওঁর ফোন নাম্বারটাও মোবাইল ফোনে স্টোর করে নিলাম।
মিস্টার দত্তগুপ্ত মার্ডার হওয়ার পর আপনি নানাভাইয়ের সঙ্গে কোনওরকম যোগাযোগ করেননি?
না– শর্মিলা ইতস্তত করে জবাব দিলেন, পুলিশের অ্যাকটিভিটিটা একটু থিতিয়ে আসুক..তারপর হয়তো কনট্যাক্ট করব। শর্মিলা আবার হাতঘড়ি দেখলেন। কাতর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার উঠুন, প্লিজ। জনি এখুনি এসে পড়বে। তারপর…।
মোবাইল ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম, বললাম, ম্যাডাম, চলি। থ্যাঙ্ক য়ু ফর ইয়োর কোঅপারেশন।
শর্মিলা বোস ভদ্রতার হাসি হাসলেন, বললেন, আপনার খোঁজখবরে নতুন কোনও ডেভেলাপমেন্ট হলে আমাকে জানাবেন। দরকার হলেই বলবেন আমি সবসময় হেল্প করতে রাজি আছি।
ঠিক সেই মুহূর্তে একজন দশাসই চেহারার লোক হুট করে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতরে। তাকে দেখে শর্মিলার মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ওঁর ফরসা মুখ থেকে সমস্ত রক্ত কেউ যেন ব্লটিং পেপার দিয়ে শুষে নিল। একবার আমার দিকে, একবার আগন্তুকের দিকে সন্ত্রস্তভাবে তাকাতে লাগলেন। যেন এক্ষুনি কোনও বিপদ হতে পারে।
ঘরে যে ঢুকেছে তার হাবভাবে একটু মালিক-মালিক ছাপ রয়েছে। গায়ের রং রোদে পোড়া তামাটে। চৌকো মুখে অকালে ভাঁজ পড়েছে। কপালে কিছু বেশি। ছোট-ছোট চোখে ঘোলাটে ভাব। চোখের নীচে অ্যালকোহলের ব্যাগ। আর ঠোঁটে কালচে ছোপ। নাকটা পেশাদার বক্সারদের মতো চ্যাপটা। মাথার কালো কুচকুচে চুল তেল মেখে পেতে আঁচড়ানো।
বয়েস পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ হবে। পরনে ঘিয়ে রঙের হাওয়াই শার্ট আর নস্যি রঙের ফুলপ্যান্ট। জামাটা ঢোলা হলেও পেশি আর স্বাস্থ্য এখানে-সেখানে জানান দিচ্ছে।
আমার হাজব্যান্ড–জনি। মুখে চেষ্টা করে হাসি ফুটিয়ে শর্মিলা বললেন।
মুখটা চিনতে পারলাম। কারণ, দেওয়ালে টাঙানো একটা রঙিন ফটোগ্রাফে জনি ওর এক রোগাপটকা বন্ধুর সঙ্গে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আমি হেসে হাত বাড়ালাম জনির দিকে। জনি হাসল। ওর মুখের রুক্ষ সন্দিহান ছাপটা কেটে গেল। আমার সঙ্গে হাত মেলাল।
ওকে উইশ করে আমার পরিচয় দিলাম। তারপর আর কিছু বলার আগেই শর্মিলা বলে উঠলেন, মিস্টার মিত্র একটা অ্যাড ফিল্মে আমাকে দিয়ে কাজ করাতে চান। আজ বিকেলেই স্পেকট্রাম অ্যাড-এর অফিসে ওঁর সঙ্গে কনট্যাক্ট হয়েছে।
ইশারা থেকে বুঝে নেওয়া বুদ্ধিমান লোকের কাজ। তাই একগাল হেসে বললাম, আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যেই ওয়েট করছিলাম। ম্যাডাম বলছিলেন যে, আপনি এখুনি এসে পড়বেন…।
