ক্রসওয়ার্ডও দেখলেন কাগজটা। কিন্তু কিছু বুঝলেন বলে মনে হল না।
এসবই সমর বর্মনের কারসাজি, দৃঢ়কণ্ঠে বলে উঠলেন জেড? তাকে একবার হাতের মুঠোয় যদি পাই…।
আমি যাচ্ছি–একটু কাজ আছে। বলে সঙ্গে-সঙ্গে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন শর্মা। আমরা অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম তার চলার পথের দিকে।
কিছুক্ষণ পরে নিস্তব্ধতা ভাঙলাম আমি, মিস্টার আপ্তে, এই কিরণ শর্মা যদি কুমার রণজিৎকে খুন করে থাকেন, তা হলে আমি বিন্দুমাত্রও আশ্চর্য হব না।
দুজন অফিসিয়াল হাঁ করে চেয়ে রইলেন আমার মুখের দিকে। সুচরিতা আপনমনেই নখ খুঁটতে থাকল।
.
ওপরে উঠে প্রথম ঘরটায় উঁকি মেরে দেখি শ্রীসর্বেশ্বর রায় গোছগাছ শুরু করে দিয়েছেন। আমি পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরে গেলাম। ঘরে ঢুকতেই দেখি একজন চাকরগোছের লোক বসে রয়েছে। আমি তাকে দেখে অবাক হলাম। এ যে কুমার রণজিতের নেপালি চাকরটা!
আমাকে দেখেই লোকটি হাউহাউ করে কেঁদে উঠে বলল, বাবু, আমার সাহেবকে যে খুন করেছে তাকে আমি শেষ করব। আপনি আমাকে আপনার সঙ্গে নিন–আমি আপনার কেনা হয়ে থাকব। বলতে-বলতে লোকটি কোমর থেকে হঠাৎই একটা বাঁকানো ছোরা বের করল। ওর মুখ জিঘাংসায় বিকৃত হয়ে উঠল।
আমি ভাবলাম, লোকটি আমাকেই খুনি ভাবছে না তো! হয়তো আমার বিশ্বাসভাজন হয়ে তারপর আমাকেই খুন করতে চায়।
মুখে বললাম, ঠিক আছে। তোমার কোনও চিন্তা নেই। পুলিশ কুমারের হত্যাকারীকে ধরে ফাঁসিতে ঝোলাবেই।
জানি না, সে আমার কথা কতটুকু বিশ্বাস করল। কিন্তু ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আপনার যে-কোনও কাজে দরকার হলেই আমাকে বলবেন। আপনার জন্যে জান হাসিল।
ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
আমি হাঁফ ছেড়ে উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। তারপর এসে দাঁড়ালাম জানলায় কাছে। এই জানলা দিয়ে কবুতরের পেছনদিকটা চোখে পড়ে। ও কী! কিরণ শর্মা না? পেছনদিকের গোলাপ বাগানে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ব্যাপার কী জানার জন্যে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আমি রওনা দিলাম বাগানের উদ্দেশে।
বাগানে গিয়ে হাজির হতেই সেখান থেকে দ্রুতপায়ে প্রস্থান করলেন শ্রীশর্মা। ফিরে আসতে যাব, হঠাৎই দেখি কিষাণ আপ্তে দৌড়ে আসছেন আমার দিকে।
আমি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলাম। প্রশ্ন করলাম, কী হয়েছে, মিস্টার আপ্তে?
হাঁফাতে-হাঁফাতে জবাব দিলেন তিনি, পেয়েছি! এতদিন পরে পাওয়া গেছে রিভলভারটা। চলুন, দেখবেন চলুন।
আমি আর কোনও কথা না বলে দ্রুত তাঁর সঙ্গে রওনা হলাম।
কিছুক্ষণ পরে দুজনে এসে হাজির হলাম কবুতরের গেটের সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রীনরসিংহ, সর্বেশ্বর রায়, ক্রসওয়ার্ড, আর সুচরিতা। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম মানেকজি ও প্রসাজি হন্তদন্ত হয়ে আসছেন। আর পেছনে ও কে! তরুণী কথাটা যাকে হুবহু মানায় সেইরকম একজন। নয়না কল্যাণী! নাঃ, রূপ আছে মেয়েটার! চোখে সানগ্লাস, ঠোঁটে লিপস্টিক। ঢল নামা চুলে মুখের অর্ধেকটাই প্রায় ঢাকা।
প্রথমে ভালো করে দেখলাম। সর্বেশ্বর রায়ের সুটকেশটা তার পায়ের কাছে ভোলা অবস্থায় পড়ে আছে, আর তার মধ্যে উঁকি মারছে একটা সুদৃশ্য কালো অটোমেটিক। সর্বেশ্বর রায় চেঁচাচ্ছিলেন, আমি তো বলেছি, আমি জানি না। আমার ব্যাগে কেউ যদি রিভলবার লুকিয়ে রাখে, তবে আমি কী করতে পারি?
কিষাণ আপ্তে বললেন, ঠিক আছে মিস্টার রায়, আপনি যেখানে যাচ্ছেন যান। আমরা পরে এ-ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করব।
বেশ রাগ-রাগ ভাব দেখিয়েই চলে গেলেন সর্বেশ্বর রায়।
ক্রসওয়ার্ড সুটকেশ থেকে রিভলবারটি বের করে নিয়েছিলেন। সেটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, হু, এটাই কাজে লাগানো হয়েছিল বলে মনে হয়। আপনার কী মনে হয়, মিস্টার আপ্তে?
পয়েন্ট থ্রি এইট বলেই মনে হচ্ছে। ভালো করে সেটাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বললেন জেড।
আচ্ছা, আপনারা এবার যার-যার ঘরে ফিরে যান– ক্রসওয়ার্ড হাতে তালি দিয়ে বললেন, এখানে দয়া করে আর ভিড় করবেন না।
মানেকজি, প্রসাদজি আর আমি ছাড়া সবাই চলে গেলেন। নয়না কল্যাণী চলে যাওয়ার আগে মানেকজির সঙ্গে চাপা গলায় কীসব কথা বলে গেলেন।
মানেকজি অস্থিরতাকে আর চাপতে পারছিলেন না। বলে উঠলেন, ক্রসবি, কী সব ফ্যানটাস্টিক ব্যাপার হচ্ছে এখানে? সর্বেশ্বর রায় আমার পরিচিত। তুমি শিগগিরই এর একটা হেস্তনেস্ত করো। ফানি!
মানেকজি ও প্রসাদজি চলে গেলেন।
আমি এবার ক্রসওয়ার্ডকে বললাম, ইন্সপেক্টর, দেখুন, রিভলভারটায় কোনও ফিঙ্গারপ্রিন্ট পান কি না।
আশা খুবই কম, বললেন এজেন্ট জেড। তারপর চিন্তিত মনে তিনজনই ফিরে এলাম কবুতরে।
একটু পরে ছুটতে ছুটতে আমার ঘরে এল সুচরিতা। বলল, কাঞ্চন, মনে পড়েছে। মনে পড়েছে।
কী? কী মনে পড়েছে? অবাক হয়ে জানতে চাইলাম আমি।
সেই রাতে কেউ আমাকে পাশ কাটিয়ে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। এ-ব্যাপারে আমি শিয়োর। দৃঢ়স্বরে বলল সুচরিতা।
কেন! কী হয়েছে?
আমি একটা গন্ধ পেয়েছিলাম, বলল সুচরিতা, কিসের গন্ধ তা ঠিক বলতে পারব না, কিন্তু আজ আবার আমি গন্ধটা পেয়েছি। আজ, একটু আগে, সবাই যখন গেটের কাছে ভিড় করেছিল তখন!
তার মানে সে-রাতে কেউ একজন লাইব্রেরিতে লুকিয়ে ছিল। মিস্টার আপ্তে তা জানতে পারেননি। অথচ আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম, ঘরে দু-চারজন লোক ছিল।
