তারপর তো আপনি সবই জানেন…। ধরা গলায় বললেন শর্মিলা, আপনাকে চিনি না, জানি না ঠিক কীভাবে কথা বলব বুঝতে পারছিলাম না।…আপনি সেদিন মিস্টার দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে কেন গিয়েছিলেন?
ভেতরের দ্বিধা কাটিয়ে সত্যি কথাই বললাম ওঁকে। তারপর জানতে চাইলাম, আপনি কেন গিয়েছিলেন?
পাশের ঘর থেকে ফোন বেজে ওঠার শব্দ শোনা গেল। শর্মিলা তড়িঘড়ি উঠে ফোন ধরতে চলে গেলেন।
একটু পরেই ফিরে এসে বললেন, এমন প্রফেশনে আছি যে, ফোন না থাকলে চলে না। তবে খুব দরকার ছাড়া ফোন করি না। সবসময় ভয় হয়–এই বোধহয় দেড়শো ফ্রি কল পেরিয়ে গেল।
আপনি ওখানে কেন গিয়েছিলেন? ঠান্ডা গলায় আবার প্রশ্ন করলাম।
শর্মিলা দুবার ঢোঁক গিললেন, তারপর বললেন, মিস্টার দত্তগুপ্তের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া ছিল।
কীসের বোঝাপড়া?
শর্মিলা উদাস চোখে আমার দিকে তাকালেন। ঘরের জানলা দিয়ে পাশের বাড়ির রং-চটা দেওয়াল দেখা যাচ্ছিল। দেওয়ালে বিকেলের রোদ ঠিকরে পড়ে শর্মিলার ঠিকানায় খানিকটা আলো পাঠিয়ে দিচ্ছিল। সেই আলোয় শর্মিলার ফরসা গোলগাল মুখ ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছিল। আর ওর কোকড়ানো চুলে অসংখ্য হাইলাইটের কুচি চিকচিক করছিল।
রীতেনবাবু, আমার জীবনটা ছোটবেলা থেকেই নানান ঝড়ঝাপটায় কেটেছে। সেসব কাহিনি আপনাকে শুনিয়ে আর লাভ নেই। পিনাকী দত্তগুপ্তের ওখানে আমি প্রায় শুরু থেকেই ছিলাম। ওঁর ব্যবসা মেয়েদের নিয়ে–তবে তার নানারকম লেভেল আছে…।
আমি ছোট্ট করে বললাম, জানি।
কী করে জানলেন! শর্মিলা অবাক হয়ে গেলেন? জানেন, লাস্ট লেভেলে কী ধরনের কাজ করতে হয়?
জানি। এই তিন-দিনে আমি প্রচুর খবর জোগাড় করেছি, ম্যাডাম। পুলিশ আমাকে অ্যারেস্ট করতে এলে আমাকে তো আগে বাঁচতে হবে! সে যাকগে–আপনি যা বলছিলেন বলুন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শর্মিলা তেতো গলায় বলতে শুরু করলেন, আমি ওঁর কাছে সব লেভেলেরই কাজ করেছি : টেলিফোনে খোশগল্প করা থেকে শুরু করে একেবারে শেষ পর্যন্ত। পরের দিকে শুধু লাস্ট লেভেলের কাজই করতাম। প্রথম প্রথম অভাবের জন্যে…শেষ দিকে হয়তো স্বভাবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল…কে জানে! শর্মিলা কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর বললেন, এই করতে করতে সময় গড়িয়ে গেল, বয়েস গড়িয়ে গেল। কিন্তু কী আশ্চর্য দেখুন, যখন জীবনটা একেবারে হোপলেস জায়গায় চলে গেছে বলে ধরে নিয়েছি, যখন সব ফুল ঝরে গেছে, তখনই আনএক্সপেক্টেড একটা ঘটনা ঘটল…।
কী?
মরা গাছে ফুল ফুটল। আই ফেল ইন লাভ। জনির প্রেমে পড়ে গেলাম। বিষণ্ণ হাসলেন শর্মিলা : কখনও ভাবিনি এরকম বয়েস-পেরোনো বয়েসে আমি প্রেমে পড়ে যাব–তাও আবার আমার চেয়ে কমবয়েসি কোনও পুরুষের সঙ্গে…।
শর্মিলার মুখে ঠিকরে পড়া আলোটা ক্রমেই কনে-দেখা-আলো হয়ে যাচ্ছিল। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। এক অদ্ভুত ঘোরের ভেতর থেকে শর্মিলা কথা বলে চললেন।
জনির সঙ্গে কাছাকাছি আসার পর আমার সবকিছু বদলে যেতে চাইল। ওর সঙ্গে আমার মেলামেশায় কোনও ফাঁক ছিল না। কিন্তু কোথায় ও ফুর্তি-টুর্তি করে কেটে পড়বে, তা না, আমাকে বিয়ে করার বায়না ধরল। আমার মনটাও কেমন যেন হয়ে গেল…রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু বিয়ের পর আমি কাজ বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলতেই দত্তগুপ্ত খেপে গেলেন। জনি একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে সিকিওরিটি অফিসারের চাকরি করে। আর টুকটাক মডেলিং করে আমিও দু-পয়সা আয় করি। ফলে সংসার চালাতে কোনও প্রবলেম হওয়ার কথা নয়। সেইজন্যেই ওসব কাজ ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দত্তগুপ্ত পরিষ্কার আমাকে বললেন, একটা কেন, দশটা বিয়ে করো– তবে লাইন ছাড়তে পারবে না। আমার বিজনেসের ক্ষতি হবে।
দত্তগুপ্ত এমনিতে ভালো লোক ছিলেন কিন্তু বিজনেসের এক ইঞ্চি ক্ষতি হলেই রাগে পাগল হয়ে যেতেন। আমাকে তো ঘরে ডেকে নিয়ে যা-তা বললেন। যখন দেখলেন আমি সেই এক গোঁ ধরে আছি, তখন বিচ্ছিরিভাবে হেসে একটা বড় খাম বের করলেন। খামের ভেতরে ছইঞ্চি বাই আট ইঞ্চি মাপের অনেকগুলো কালার ফটোগ্রাফ ছিল। নানান ধরনের কাস্টমারের সঙ্গে আমার ছবি–সবই বেডরুমের…একটাতেও গায়ে সুতো নেই।
আমি তাতে ভয় পাইনি। কারণ, জনি আমার এই লাইফের কথা জানত। সব জেনেই ও আমাকে বিয়ে করেছে। তাই জোর গলায় দত্তগুপ্তের হুমকির প্রতিবাদ করি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুঃখের হাসি হাসলেন শর্মিলা। ছোট করে মাথা নাড়লেন এপাশ-ওপাশ। তারপর বললেন, দত্তগুপ্তকে চিনতে আমি ভুল করেছিলাম। উনি আমার কথায় দমে না গিয়ে হেসে বললেন, শর্মিলা, তুমি বড় ছেলেমানুষ। প্রেম-টেমের ব্যাপারগুলো আমি বুঝি। এই ছবিগুলো আমি তোমার হাজব্যান্ডের কাছে পাঠাব না। ছাপিয়ে বই করে পর্নোগ্রাফির মার্কেটে বিক্রি করব। এত কম দামে বেচব যাতে কয়েকমাসে লক্ষ-লক্ষ কপি উবে যায়। তাতে ছবির সঙ্গে-সঙ্গে তোমার নাম-ঠিকানাও ছাপা থাকবে। কনট্যাক্ট ফোন নাম্বার, আর পার-নাইট রেটও ছাপা থাকবে। তোমার সোসাল লাইফ বলে কিছু থাকবে না। শুধু থাকবে অ্যান্টিসোসাল লাইফ।
এরপর দত্তগুপ্ত প্রাণ খুলে হেসেছিলেন। ভয়ে আমি কাঠ হয়ে গিয়েছিলাম। কাঁদতে কাঁদতে ওঁর ফ্ল্যাট থেকে ফিরে এসেছিলাম। তার পরে বহুবার ওঁকে রিকোয়েস্ট করেছি কিন্তু ওঁকে নড়াতে পারিনি। তখন বাধ্য হয়ে আমি নানাভাইয়ের কাছে যাই…।
