কথাগুলো বলেই সঞ্জিত কর ভেতরের ঘরের দিকে চলে গেলেন। ভদ্রমহিলা ওঁকে কোনও জবাব দিতে পারেননি। শুধু ঘাড় কাত করে হ্যাঁ বুঝিয়েছেন। কারণ রিসেপশানের সোফায় আমাকে দেখেই ওঁর মুখ সাদা হয়ে গেছে। চোখ পাগলের মতো হয়ে গেছে ভয়ে।
অবশেষে আমি ওঁর দেখা পেলাম। এইবার একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে। দত্তগুপ্তকে কে খুন করেছে আমি জানতে চাই।
শর্মিলা বোসের সঙ্গে রাস্তায় বেরিয়ে আমি একটি কথাও বলিনি। একবার শুধু বলেছি, আমার নাম রীতেন মিত্র। সূর্য সেন স্ট্রিটে থাকি। আপনার সঙ্গে আমার অনেক জরুরি কথা আছে। আর সেটা খুব নিরিবিলি জায়গায় হলে ভালো হয়।
কিছুক্ষণ দোনোমনা করার পর শর্মিলা বোস ছোট্ট করে জিগ্যেস করলেন, আমার বাড়িতে বসে কথা বললে কোনও প্রবলেম আছে?
না। বরং সেটাই ভালো হবে।
কী করে আমার খোঁজ পেলেন?
সংক্ষেপে সব বললাম।
তারপরই ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছ থেকে একটা ট্যাক্সি ধরে আমরা ছুটলাম গড়পাড়ের দিকে।
ট্যাক্সিতে শর্মিলা একবার কথা বলা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ট্যাক্সি ড্রাইভারের দিকে ইশারা করে আমি ওঁকে থামিয়ে দিয়েছি। আমার মনে তখন শয়ে-শয়ে পাগলা ঘোড়া ছুটছে। বহু প্রশ্ন একসঙ্গে ছুটে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ঠোঁটের কাছে। আমি বর্ষার কথা ভেবে মনটাকে শান্ত করছিলাম। অফিসে এখন ও কার সঙ্গে গল্প করছে কে জানে! মংপু কিংবা রেইনম্যান নিশ্চয়ই ওর কাছাকাছি আছে।
গড়পাড়ের একটা পুরোনো বাড়ির একতলায় থাকেন শর্মিলা। দেড়খানা ঘরকে জোড়াতালি দিয়ে ফ্ল্যাটের মতো করে নিয়েছেন। মাসছয়েক হল বিয়ে করেছেন, তবে সিঁথিতে রঙের ছোঁয়া নেই। কারণ, যে-ধরনের কাজ তিনি করেন তাতে অসুবিধে হয়।
একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে আমাকে বসতে বললেন শর্মিলা। নিজে একটা খাটো টুলের ওপরে বসলেন।
ছোট ঘর। অভাব আর চাহিদা দিয়ে সাজানো। বুঝতে পারছিলাম, ওঁর লড়াইটা বেশ কষ্টের। ওঁকে কষ্ট দিতে আমার খুব কষ্ট হবে।
আমার মুখে বোধহয় তেষ্টা আর ক্লান্তির ছাপ ফুটে উঠেছিল। কারণ, পাশের ঘরে গিয়ে আমার জন্যে এক গ্লাস অরেঞ্জ স্কোয়াশের শরবত তৈরি করে নিয়ে এলেন।
কাচের গ্লাসটা হাতে নিয়ে অনুভব করে একটু অবাক হয়ে তাকাতেই শর্মিলা বললেন, সরি, ফ্রিজ নেই।
আমি এক ঢোঁকে গ্লাসটা খালি করে ওঁকে ফেরত দিলাম। হাতের পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে নিয়েই প্রশ্ন করলাম, দত্তগুপ্তকে কে মার্ডার করেছে?
শর্মিলার হাত কেঁপে গেল। গ্লাসটা মেঝেতে একপাশে রাখতে গিয়ে ঠক করে শব্দ হল। তারপর কয়েকসেকেন্ড সময় নিয়ে বললেন, আমি জানি না।
ম্যাডাম, এখন ছেলেমানুষির সময় নয়। পুলিশ যে-কোনও সময় এসে আপনার বাড়ির কড়া নাড়বে। আমার বাড়িতে ইতিমধ্যেই হানা দিয়েছে।
দেখুন, এখন পাঁচটা বাজে। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমার হাজব্যান্ড এসে পড়বে। ও খুব বদরাগি লোক। হয়তো কী-নাকী ভেবে উলটোপালটা কিছু একটা করে বসবে।
আমি কোনও কথা না বলে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করলাম। বললাম, আপনি কি চান আমি এই মুহূর্তে কড়েয়া থানায় ফোন করে আপনার নাম-অ্যাড্রেস বলে দিই! তাতে আমি হয়তো মরব, তবে আপনিও বাঁচবেন না।
শর্মিলা মাথা নীচু করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। অভিনয় কি না কে জানে! তবে কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে ভেজা চোখে তাকালেন আমার দিকে ও আমার অবস্থা ঠিক আপনার মতো। মিস্টার দত্তগুপ্ত সাড়ে ছটা নাগাদ আমাকে দেখা করতে বলেছিলেন। আমি পৌনে সাতটা নাগাদ গিয়ে দেখি উনি বিছানায় মরে পড়ে আছেন। বিশ্বাস করুন, অনেস্ট টু গড।
আপনাকে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দিয়েছিল কে?
শর্মিলা কেমন যেন হকচকিয়ে গেলেন। ইতস্তত করে বললেন, রোগা ফরসা মতন একটি মেয়ে। আমাকে দরজা খুলে দিয়ে সে কোথায় যেন বেরিয়ে গেল…।
আমি হেসে ফেললাম, বললাম, বোধহয় কোল্ড ড্রিস আনতে গিয়েছিল। আবার সেই মেয়েটিকে খোঁজ করে যদি জিগ্যেস করি তা হলে সে-ও নিশ্চয়ই একই গল্প শোনাবে। অন্য আর একটি মেয়ে ওকে দরজা খুলে দিয়েছিল…তারপর ওর জন্যে কোল্ড ড্রিন্স আনতে গিয়েছিল। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম ও মিসেস বোস, ব্যাপারটা অনেকটা মুরগি আগে, না ডিম আগে র মতো হয়ে গেল না! আমি লাস্টবারের মতো আপনাকে বলছি, দিস ইজ নট আ জোক। আমি আপনাকে হেল্প করতেই চাই। ডোন্ট মেক মি চেঞ্জ মাই মাইন্ড। মোবাইল ফোনটা উঁচিয়ে ধরে ওঁকে আবার পুলিশের ভয় দেখালাম।
শর্মিলা মাথা ঝুঁকিয়ে দ্বিতীয়বার কেঁদে ফেললেন। ওঁর পিঠটা ফুলে-ফুলে উঠছিল। ফরসা পিঠে গাঢ় নীল রঙের ব্লাউজটা যেন কেটে বসেছে।
আমি ওঁকে সামলে নেওয়ার সময় দিলাম।
কিছুক্ষণ পরে শর্মিলা যা জানালেন তাতে ব্যাপারটা খুব একটা এগোল না।
শর্মিলা সত্যি-সত্যি পৌনে সাতটা নাগাদ দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখেন ফ্ল্যাটের দরজা খোলা ইঞ্চিখানেক ফাঁক হয়ে আছে। ভেতরে ঢুকে শর্মিলা দরজা বন্ধ করে দেন। কারণ, দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে ওঁর যাতায়াত বহুদিন ধরেই–ফলে কোনও ভয়-টয় ওঁর মনে কাজ করেনি। রিসেপশানে কাউকে না দেখে ওঁর প্রথম খটকা লাগে। তারপর ভেতরে গিয়ে দেখেন দত্তগুপ্ত বিছানায় মরে পড়ে আছেন। ফ্ল্যাটে আর কেউ নেই। তখন ভীষণ ভয় পেয়ে ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরোতে যাবেন ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে ওঠে। শর্মিলা তখন ভয়ে পাগলের মতো হয়ে যান। দিশেহারা অবস্থায় কী করবেন ভেবে উঠতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আমাকে দরজা খোলেন।
