আমি সৌজন্য দেখালাম। তারপর প্রথম প্রশ্নের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ইন্সপেক্টর সেন টেবিলে রাখা ফাইলটা হাতে তুলে নিলেন। সেটা ওলটাতে-ওলটাতে একটা পৃষ্ঠায় গিয়ে থামলেন।
ফাইলের দিকে চোখ রেখেই প্রথম প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন তিনিঃ আপনার মোবাইল নাম্বার ৯৮৩০০-৪৩২৮১?
হ্যাঁ–।
আপনি গণেশ অ্যাভিনিউর সক্ট কর্পোরেশন-এ প্রোগ্রামারের চাকরি করেন?
হ্যাঁ। ওরা বাড়ির কাজ বেশ গুছিয়ে শেষ করে তারপর পরীক্ষা দিতে সরি, নিতে– এসেছে দেখছি। কিন্তু আমার মোবাইল নাম্বার ওরা কী করে পেল? অফিসের হদিস, বাড়ির ঠিকানা? তা হলে কি কম্পিউটার ছাড়াও অন্য কোথাও আমার মোবাইল নাম্বার আর নাম-টামের হার্ড কপি ছিল?
আমার বুকের ভেতরে এমন জোরে গুমগুম শব্দ শুরু হল যে, আমার ভয় হচ্ছিল পুলিশ অফিসাররা সেই শব্দ শুনতে পাবেন।
পিনাকী দত্তগুপ্তকে আপনি চিনতেন?
না। এই প্রথম নাম শুনছি।
পার্কসার্কাসে ওঁর ফ্ল্যাটে আপনি কখনও যাননি?
অসংখ্য মিথ্যে বলার জন্যে মনে-মনে তৈরি হয়ে উত্তর দিলাম, যার নাম কখনও শুনিনি তার ফ্ল্যাটে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে কী করে!
দ্বিজেন বিশ্বাস গলাখাঁকারি দিয়ে নড়েচড়ে বসলেন, বললেন, সত্যিই আপনি মিস্টার দত্তগুপ্তকে চেনেন না? ওঁর ফ্ল্যাটে কখনও যাননি? কোশ্চেনটা খুব ইমপর্ট্যান্ট–উত্তরটাও।
কেন, ওঁকে আমার চেনার কথা? একটু খোঁচা মেরেই প্রশ্নটা করলাম।
বিশ্বাস হাসলেন, বললেন, চেনার তো কথা–নইলে মিস্টার দত্তগুপ্তের ফোন থেকে আপনার মোবাইল ফোনে মেসেজ আসবে কেন!
প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেলাম। ঠিক কতটা জানে ওরা?
ধাক্কাটা সামলে নেওয়ার সময় চাই। তাই প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা, ব্যাপারটা কী বলুন তো? পিনাকী দত্তগুপ্তকে নিয়ে এত কোশ্চেন করছেন কেন?
এবারে সেন উত্তর দিলেন। ঠান্ডা গলায় বললেন, পিনাকী দত্তগুপ্ত ওঁর ফ্ল্যাটে মার্ডার হয়েছেন। কেসটা আমরা ইনভেস্টিগেট করছি। দত্তগুপ্ত একটা টেলিফোন-মধুচক্র চালাতেন। তবে আমাদের কাছে খবর আছে ব্যাপারটা এত ইনোসেন্ট ছিল না। ওঁর রোরিং বিজনেস ছিল। ক্লায়েন্টের লিস্ট ছিল কয়েক মাইল লম্বা…।
আর সেই লিস্টেই আমরা আপনার নাম পেয়েছি। হেসে বললেন দ্বিজেন বিশ্বাস।
ওঁদের ভদ্রলোকের মতো সাফাই দেওয়া দরকার। তাই একটা লম্বা শ্বাস ফেলে মাথা নীচু করে দত্তগুপ্তের কোম্পানির মেসেজ পাঠানোর কথা বললাম। তারপর এও বললাম যে, আমি ওঁদের ওখানে কখনও ফোনও করিনি, যাইওনি।
বিশ্বাস করুন। আমার মাথার ওপরে অনেক ফ্যামিলি বার্ডেন ইনকামও তেমন নয়। এসব বিলাসিতা আমাদের মতো লোকের কাছে স্বপ্ন। অনেস্টলি বলছি। গলায় বেশ খানিকটা আবেগ জড়িয়ে কথা শেষ করলাম।
অফিসার দুজন কয়েক লহমা আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বোধহয় বুঝতে চাইলেন আমার অনেস্টিতে শতকরা জলের পরিমাণ কত।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ইন্সপেক্টর সেন বললেন, ও.কে., মিস্টার মিত্র। আজ আমরা উঠি। আপনি আমাদের না জানিয়ে কলকাতা ছেড়ে যাবেন না। উই হোপ য়ু আর টেলিং দ্য ট্রুথ।
ওঁরা চলে যেতেই মা পরদার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। আমাকে প্রায় জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তারপর কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা গলায় বলল, রতু, রতু…আমার বড় ভয় করছে রে…।
আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম, কোনও ভয় নেই, মা, কোনও ভয় নেই। আমি এমন কিছু করিনি যাতে পুলিশ আমার কিছু করতে পারে।
আমার দু-হাতের বাঁধনে মায়ের ক্ষীণজীবী রোগা শরীরটা ভেজা পাখির ছানার মতো থরথর করে কাঁপছিল।
মায়ের আশঙ্কা অনুভব করে আমার চোখে জল এসে গেল।
.
পরদিন আবার গেলাম স্পেকট্রাম অ্যাড-এর অফিসে।
গতকালের হলুদ চুড়িদার মেয়েটি আজ গোলাপি চুড়িদার পরে আছে। কপালে সেই চুলের ঝালর, তার নীচে টানা-টানা চোখ।
আমাকে দেখামাত্রই সৌজন্যের হাসি হাসল। সোফায় দিকে চোখের ইশারা করল।
সোফায় বসে আমি মেয়েটিকে শর্মিলা বোসের কথা জিগ্যেস করলাম। উত্তরে মেয়েটি বলল যে, শর্মিলা বোস এখনও আসেননি–তবে ওঁর আসার সময় এখনও পেরিয়ে যায়নি। আমি চাইলে অপেক্ষা করতে পারি।
চাইলে মানে! শর্মিলা বোসকে আমার চাই-ই চাই! গতকালের পুলিশি হানার পর আমি রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠেছি। মা, ব্রতীন, মিলি যদি একবার জানতে পারে যে, দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে আমি কীসের লোভে গিয়েছিলাম, তা হলে আমাকে হয়তো সুইসাইড করতে হবে।
কী একটা কাজে সঞ্জিত কর অফিসের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। রিসেপশানের মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে আবার ভেতরে চলে যাচ্ছিলেন, আচমকাই আমাকে দেখতে পেলেন।
আরে, আপনি এসে গেছেন! চওড়া করে হাসলেন সঞ্জিত কর।
আমি কাচুমাচু মুখ করে মাথা নাড়লাম–যার অর্থ হল, না এসে উপায় কী!
একটু ওয়েট করুন। শর্মিলাাদি আজ হয়তো আসবেন।
সঞ্জিত করের কথা শেষ হতে-না-হতেই বাইরে থেকে কাচের দরজা ঠেলে একজন ভদ্রমহিলা ভেতরে এসে ঢুকলেন। ফরসা গোলগাল চেহারা, কোঁকড়ানো চুল, চোখে সানগ্লাস। ম্যাচ করা শাড়ি ব্লাউজ দিব্যি মানিয়েছে।
ওঁকে চিনে নিতে অসুবিধে হল না।
মিস্টার করকে দেখে খুশির হাসি হেসে ভদ্রমহিলা বললেন, হাই সঞ্জিত, কোনও ভালো খবর আছে?
সঞ্জিত কর বড় করে হাসলেন। তারপর আমার দিকে ইশারা করে বললেন, দারুণ গুড নিউজ আছে। ইওর ওল্ড ফ্রেন্ড ইজ ব্যাক। আপনি কথা বলুন। আজ আপনার সঙ্গে আমার কোনও কাজ নেই। নেক্সট মানডে বিকেলের দিকে একবার আসবেন।
