তারপর আমাকে ইশারা করে অ্যান্টিরুমের বাইরে আসতে বললেন। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করলেন, শর্মিলাদি আমাদের অফিসে প্রায়ই আসেন নতুন কাজের খোঁজ নিতে। আজও হয়তো আসবেন। সময় হয়ে গেছে।
আমার বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ শব্দ শুরু হয়ে গেল।
আপনার ওই অ্যাড-ফ্যাডের ব্যাপারটা তা হলে বোগাস! শুধু-শুধু আমার টাইম নষ্ট করলেন। করের মন্তব্যে হতাশা আর বিরক্তি ছিল।
তাই নিজের মান বাঁচাতে বললাম, না, না! সত্যিই একটা অ্যাড আমি তৈরি করতে চাই। ইচ্ছে হলে অ্যাডভান্স নিতে পারেন। তবে বড় অ্যাড নয় দশ সেকেন্ডের কুইকি।
ঠিক আছে। বলে আমাকে রিসেপশানের কাছে নিয়ে এলেন করঃ আপনি এখানে ওয়েট করুন–শর্মিলাদি হয়তো এসে যাবেন।
রিসেপশানের সোফায় বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম, আর শর্মিলা বোসের কথা ভাবতে লাগলাম।
কী কুক্ষণে যে কৌতূহলের তাড়নায় দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। এখন এই ঘোলাজলের ঘূর্ণি থেকে কী করে উদ্ধার পাব কে জানে! তবে লাভের মধ্যে এই হয়েছে যে, আমি আর বর্ষা দুজনেই একই বিপদে জড়িয়ে পড়েছি। এর ফলে আমরা কাছাকাছি এসে পড়েছি। কিন্তু বর্ষা সত্যিই আমাকে সব কথা খুলে বলেছে তো! এরকম বিপদে পড়লে মাথার ঠিক থাকে না। তখন যাকে-তাকে সন্দেহ হয়। আমার অবস্থাটাও বোধহয় তাই। নইলে বর্ষাকে সন্দেহ করব কেন?
একটা সিগারেট ধরাতে যেতেই রিসেপশানের মেয়েটি এক্সকিউজ মি, স্যার বলে আমার দিকে তাকাল। তারপর ইশারা করল একটা স্টিকারের দিকে থ্যাংক য়ু ফর নট স্মোকিং।
সিগারেট আবার পকেটের প্যাকেটে ঢুকে গেল। সিগারেট ছাড়া সময় কাটানো মুশকিল। চোখ তন্দ্রায় জড়িয়ে আসতে চাইছে।
অফিসের দরজা ঠেলে যখনই কেউ ঢুকছে তখনই আমি চোখ থেকে ঘুম তাড়িয়ে তাকাচ্ছি। নাঃ, শর্মিলা বোস নয়।
সত্যিই, কী অদ্ভুত ব্যাপার! শর্মিলা বোসের বদলে অনেক তরুণী এবং অনেক সুন্দরী মেয়েরা স্পেকট্রাম অ্যাড-এর অফিসে ঢুকলেও ওরা আমাকে একচুলও টানতে পারছে না। আমার কাছে। ওরা স্রেফ নন-ম্যাগনেটিক মেটিরিয়াল। এখন, এই মুহূর্তে, শর্মিলা বোসই আমার একমাত্র মহান চুম্বক।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে উঠে পড়তে হল। সাড়ে তিন ঘণ্টা মতো অপেক্ষা করেও শর্মিলা বোসের দেখা পেলাম না। তখন সোফা ছেড়ে উঠে পড়লাম। ঢুকে পড়লাম অফিসের ভেতরে।
সঞ্জিত করের কাছে গিয়ে কিন্তু-কিন্তু ভাব নিয়ে দাঁড়ালাম।
তিনি ঠোঁট উলটে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, কী আর করবেন…দরকার মনে হলে কাল একবার আসুন…।
আচ্ছা, ওঁর অ্যাড্রেসটা আমাকে দেওয়া যায় না? কিংবা ফোন নাম্বার?
উঁহু-ট্রেড সিক্রেট।
ওঁর সঙ্গে দেখা করাটা ভীষণ জরুরি…।
সঞ্জিত কর ভুরু কুঁচকে সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকালেন। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর বললেন, ইচ্ছে হলে আপনি কাল আর-একবার আসতে পারেন, চান্স নিতে পারেন। দ্য চয়েস ইজ ইওরস। নাউ, ক্যান উই ফিনিশ দিস ডায়ালগ?
অপমানে গা চড়চড় করছিল, কিন্তু উপায় নেই। আমার ঘাড়ের ওপর দত্তগুপ্তের ডেডবডি ঠান্ডা নিশ্বাস ফেলছে।
সুতরাং স্পেকট্রাম অ্যাড-এর অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম। আসার সময় রিসেপশানের মেয়েটিকে বলে এলাম যে, আমি আবার কাল আসব।
হতাশ মন নিয়ে যখন বাড়ির দিকে রওনা হলাম, তখনও জানি না আর-এক বিপদ সেখানে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
.
০৫.
দরজার কড়া নাড়তেই মিলি দরজা খুলে দিল।
মিলি খুব ফরসা। কিন্তু পড়ন্ত বিকেলের ম্লান আলোয় ওকে ভীষণ ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল।
ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ সরু হয়ে এল।
মিলি ফিসফিস করে বলল, দাদা, থানা থেকে পুলিশ এসেছে। তোর জন্যে অপেক্ষা করছে।
পুলিশ!
আমার মুখের রক্ত বোধহয় কেউ ব্লটিং পেপার দিয়ে শুষে নিল, কারণ মিলির মুখে ভয়ের ছাপ পড়ল। ও অস্পষ্ট গলায় বলল, প্রায় একঘণ্টার ওপর ওরা বসে আছে।
পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখে, ঘাড়ে, গলায় ঝুলিয়ে নিলাম। ওঁদের প্রশ্নগুলো মনে মনে কল্পনা করে উত্তরগুলো ঝালিয়ে নিতে লাগলাম।
কী ব্যাপার, দাদা! পুলিশ তোর খোঁজ করছে কেন? মা ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। কাঁদছে।
আমি আপনমনেই একবার মাথা নাড়লাম। তারপর মিলিকে পাশ কাটিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। কেমন যেন দম আটকে আসছিল। একগাদা শুকনো ছাতু মুখের মধ্যে কেউ যেন জোর করে গুঁজে দিয়েছে।
বাইরের ঘরটাতেই ওঁরা দুজনে বসেছিলেন। সামনের টেবিলে দুটো খালি চায়ের কাপ আর প্লেট। তার পাশে একটা হলদে রঙের ফ্ল্যাট ফাইল।
ওঁদের একজন গাঁট্টাগোট্টা। পরনে ইউনিফর্ম। আপাদমস্তক পুলিশ-পুলিশ ভাব। আর-একজন সিঁড়িঙ্গে চেহারার। গায়ে সাদা পোশাক। গালে, কপালে অসংখ্য ভাঁজ। মাথায় টাক। ঠোঁটের কোণে একটা মজার হাসি সবসময় লেগে রয়েছে।
আমি ঘরে ঢুকেই ওঁদের আলতো নমস্কার জানিয়ে বললাম, আমার নাম রীতেন মিত্র।
হু বসুন। গাঁট্টাগোট্টা চেহারার ভদ্রলোক বললেন, আপনার জন্যেই এতক্ষণ ওয়েট করছি।
আমি একটা চেয়ারে বসে পড়লাম।
মিলি আমার পাশ দিয়ে বাড়ির ভেতরের দিকে চলে গেল। ও চলে যাওয়ার সময় দরজার পরদাটা কেঁপে গেল। তখনই পরদার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মা-কে দেখতে পেলাম।
আমি ইন্সপেক্টর সেন–মুচিপাড়া থানায় আছি। প্রথমজন বললেন। তারপর সঙ্গীর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, আর ইনি কড়েয়া থানার অফিসার দ্বিজেন বিশ্বাস…।
