রিসেপশানের মেয়েটিকে আমার ছদ্ম-পরিচয় জানিয়ে বললাম যে, আমি একটা টিভি অ্যাড দিতে চাই। আর তাতে মডেল হিসেবে ভারত কসমেটিক্স লিমিটেড-এর ড্রিম ট্যালকাম পাউডারের অ্যাডের মেয়েটিকে চাই।
রিসেপশানের মেয়েটি বোধহয় চাকা-ক্লাগানো চেয়ারে বসেছিল। কারণ, আমার কথা শোনামাত্রই কাউন্টারের একপাশে বসানো কম্পিউটারের কাছে প্রায় ভেসে চলে গেল। ওর সুন্দর আঙুল ব্যস্তভাবে নড়ে উঠল কিবোর্ডে। তারপরই আমার দিকে মুখ তুলে বলল, আপনি ভেতরের ঘরে যান। সেখানে মিস্টার করের সঙ্গে কথা বলুন। ভারত কসমেটিক্স লিমিটেড-এর নাম বলবেন। কম্পিউটারে দেখলাম, ওদের অ্যাডটা মিস্টার কর ডিল করেছিলেন।
আমি ধন্যবাদ জানিয়ে ভেতরের ঘরের দিকে রওনা হতে যাব, ঠিক তখনই আমার মোবাইল ফোন বেজে উঠল।
পকেট থেকে ফোনটা বের করে কথা বললাম। ব্যবসার ফোন। ওরা জানে না, ব্যবসা এখন আমার মাথায় উঠেছে।
ফোনে কথা বলা শেষ করে ভেতরের ঘরে ঢুকলাম।
ঘরটা ছোট কিন্তু চমৎকার। প্রয়োজনের বাইরে বাড়তি কোনও আসবাবপত্র নেই। ধোপদুরস্ত পোশাকে ফিটফাট তিনজন কর্মী–একজন মহিলা, দুজন পুরুষ তিনটে টেবিলে বসে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলেন। আমি ওঁদের একজনের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
ভদ্রলোক আমার দিকে না তাকিয়েই হাতের ইশারায় সামনের একটা চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে কাজ করে চললেন।
চেয়ারটা আধুনিক–মোল্ডেড প্লাস্টিক আর লোহার কায়দাকানুন দিয়ে তৈরি। সাধারণ অবস্থায় এ ধরনের চেয়ারে বসলে এমন আরাম হয় যে, নিতম্ব নিত্যানন্দ হয়ে বারবার ধন্যবাদ জানায়। কিন্তু এখন অবস্থা স্বাভাবিক নয়। তাই পেছনে পিন ফুটতে লাগল? কোথায় দত্তগুপ্তের তৃপ্তি নিকেতনের মানসী? কোথায়? কোথায়?
ভদ্রলোক কাজের ঝোঁক সামান্য কমিয়ে কয়েকটা কাগজের গোছা একপাশে সরিয়ে রেখে এই প্রথম আমার দিকে তাকালেন : বলুন, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর য়ু…।
আমি মিস্টার করের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
মুখে সুন্দর পেশাদারি হাসি ফুটিয়ে ভদ্রলোক বললেন, আমিই সঞ্জিত কর। বলুন, কী হেল্প করতে পারি।
ভারত কসমেটিক্স লিমিটেড-এর ড্রিম ট্যাঙ্ক-এর অ্যাডটা আপনারা করেছেন। রিসেপশানের ম্যাডাম এ-ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কথা বলতে বললেন…।
বলুন, কী বলবেন–। চোখের চশমাটা সামান্য অ্যাডজাস্ট করে কর টেবিলের কাগজপত্রের দিকে তাকালেন। ভাবটা এমন যেন আমি ওঁর কাজের সময় অকারণে নষ্ট করছি।
একটু নার্ভাস হয়ে গেলাম আমি। কিছুটা সময় নিয়ে ইতস্তত করে বললাম, আমার একটা ছোট কোম্পানি আছে, মিস্টার কর। তার একটা টিভি অ্যাড দিতে চাই। আর তাতে মডেল হিসেবে একজনকে আমার পছন্দ–তাকে চাই।
সঞ্জিত কর আমার চাহিদা আঁচ করে বললেন, তার মানে ভারত কসমেটিক্স-এর ড্রিম ট্যাঙ্ক-এর মডেলকে চাই। ও. কে., নো প্রবলেম…।
আমার বুক ঠেলে একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল। আমার তদন্ত তা হলে ঠিক পথেই এগোচ্ছে!
কর গুনগুন করে গানের সুর ভাঁজতে-ভঁজতে বাঁ-দিকে ঘাড় ঘোরালেন। ওঁর টেবিলের পাশেই একটা সুন্দর কাঠের র্যাক ছিল। র্যাকে সার বেঁধে অনেকগুলো ভিডিয়ো ক্যাসেট সাজানো। তাদের লেবেলগুলো খুঁটিয়ে দেখে কর একটা ক্যাসেট টেনে নিলেন। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, আসুন, প্রোজেকশান রুমে একবার ক্যাসেটটা চালিয়ে দেখে নিই।
কর আমাকে একটা অ্যান্টিরুমে নিয়ে গেলেন। সেখানে ভিসিআর, টিভি, প্রোজেক্টার সব তৈরি। আমাকে বসতে বলে ক্যাসেটটা রেডি করে ভিসিআর-এর প্লে বোতাম টিপে দিলেন মিস্টার কর। টিভির পরদায় নানান বিজ্ঞাপনের মেলা শুরু হয়ে গেল।
একটু পরেই দেখতে পেলাম ওঁকে।
সেই বিজ্ঞাপন, সেই মুখ, সেই হাসি।
আমি একটু উত্তেজিতভাবেই করকে বললাম, এই ভদ্রমহিলা–এই মডেল! ওঁর নাম কী?
শর্মিলা বোস–গড়পাড়ে থাকেন–আমরা শর্মিলাদি বলি। আমার দিকে খানিকটা অবাক চোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় কথাগুলো বললেন কর।
ওঁর ডিটেইল্ড অ্যাড্রেসটা আমাকে দিতে পারেন?
কেন বলুন তো? করের কপালে ভাঁজ পড়েছে।
না, মানে, আমার ওই অ্যাডটা নিয়ে একটু ডিসকাস করতাম। আমি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিলাম।
কর হাসলেনঃ যা ডিসকাস করার আমাদের সঙ্গে করতে পারেন। মডেলদের সঙ্গে ক্লায়েন্টদের জেনারালি কথা বলতে দেওয়া হয় না–তাতে কাজের প্রবলেম হয়।
ওঁর সঙ্গে একবার দেখা করা যেতে পারে? জাস্ট একবার? আমি মরিয়া।
মিস্টার কর ভালো করে আমাকে জরিপ করলেন। বোধহয় ভাবতে চাইলেন কেসটা কী ও প্যার কিয়া তো ডরনা কেয়া, নাকি প্রেম-প্রতিজ্ঞা?
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার বলুন তো?
আমি দাগা খাওয়া প্রেমিক সাজার ভান করে মনমরা গলায় বললাম, কিছু মাইন্ড করবেন না। ওঁর সঙ্গে…ওঁর সঙ্গে একসময় আমার…ইয়ে, মানে…একটা অ্যাফেয়ার…মানে, পরিচয় ছিল। একবার দেখা হলে খুব ভালো হত।
কর আমার মুখের দিকে অনেকক্ষণ ভালো করে দেখলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে হেসে ভিসিআর থেকে ক্যাসেটটা বের করে নিয়ে ভিসিআর, টিভি, সব অফ করে দিলেন।
আমি ওঁর উত্তরের অপেক্ষা করছিলাম।
আপনমনেই হাসলেন কর। এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লেন। বিড়বিড় করে নিজেকেই বললেন, বাব্বাঃ, এই বয়েসেও শর্মিলাদিকে ইয়াং বয়ফ্রেন্ড সামাল দিতে হচ্ছে!
