একে-ওকে জিগ্যেস করে যখন ভারত কসমেটিক্স লিমিটেড-এ পৌঁছলাম, তখন বেলা প্রায় দুটো।
চিৎপুরের এক ঘিঞ্জি রাস্তায় একটা বাড়ির দোতলায় ওদের অফিস। তবে অফিস-বাড়িটার যা চেহারা তাতে মনে হতেই পারে ওরা ট্যালকম পাউডার নয়, টুথ পাউডার তৈরি করে। নোনা ধরা জীর্ণ বাড়ির একতলায় নানারকম কারখানা ছাপাখানা, খাঁটিয়া তৈরির কারখানা, কোথাও বই বাঁধাই হচ্ছে, টিনের কৌটো তৈরি করছে কেউ। দু-তিনটে রেডিয়োর গান কানে আসছে। আর গোটা একতলাটা বিড়ি আর বাথরুমের গন্ধে ম-ম করছে।
নাকে রুমাল চাপা দিয়ে দোতলার সিঁড়ি বেড়ে উঠলাম। সিঁড়ির যা ছিরি তাতে মনে হচ্ছিল তেনজিং নোরগে বোধহয় এই সিঁড়িতেই ট্রেকিং-এ হাতেখড়ি দিয়েছিলেন।
বি.সি.এল.-এর অফিসের বাইরে প্লাস্টিকের ছোট সাইনবোর্ড। তার পাশের কাচের দরজায় কোম্পানির তিনরকম প্রোডাক্টের রঙিন স্টিকার।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। কাচক্যাচ শব্দ হল। সামনের টেবিলে বসা পাকা-চুল ভদ্রলোক একটা লেজার থেকে মুখ তুলে তাকালেন। তার চোয়াল নড়ছিল। ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক চ্যানেলের ট্রাইব সিরিয়ালে বোধহয় এ-মুখ আমি দেখেছি। এ-মুখ দেখে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ডারউইনসাহেব ঠিকই বলেছিলেন : বানর থেকে মানুষ। যার গাছে থাকার কথা সে একটা চেয়ারে বসে আছে। অবশ্য চেয়ার আর গাছ–দুটোই বেসিক্যালি কাঠ।
কী চাই? পাউডার, সাবান, না ক্রিম? কাক যদি মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারত, তা হলে বোধহয় এরকমটাই শোনাত।
ঘরের মাপ বড়জোর ছফুট বাই আট ফুট। মাথায় কাঠের সিলিং। আর আসবাব বলতে একটা পোস্টাল ফ্যান, দুটো টেবিল, দুটো চেয়ার, আর একটা টুল। টেবিল-চেয়ারের যা রং-চটা দুর্দশা তাতে স্পষ্টই বোঝা যায় এদের ফাঁক ফোকরে ছারপোকার দল ওনারশিপ ফ্ল্যাট কিনে স্থায়ী আস্তানা গেড়েছে। তবে অফিসের যা চেহারা তাতে মনে হয় না লোকজন এখানে খুব একটা আসে, আর ছারপোকাগুলো রেগুলার ব্লাড সাপ্লাই পায়।
অফিসে আর কেউ নেই। সুতরাং যা বলার এই বৃদ্ধ মানুষটিকে বলা যাক।
আপনারা সিসিসিএন চ্যানেলে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছেন…।
ওই অ্যাডভেটাইজে অ্যাকশন হয়েছে তা হলে! একগাল হাসলেন বৃদ্ধ। হাসি তো নয়, যেন দাঁতের বিজ্ঞাপন–যদিও এদিক-ওদিক কয়েকটা পিস মিসিং।
না, মানে…আমার একটা কসমেটিক্স কোম্পানি আছে…।
ভদ্রলোকের ভুরু কুঁচকে গেল, ঘোলাটে চোখে সন্দেহ দেখা দিল। আমার দিকে তীব্র নজর মেলে চুপচাপ কিছু একটা চিবোনোর কাজ করে চললেন।
অনেকক্ষণ পর জিগ্যেস করলেন, কী তৈরি করা হয়? আমরা অনেক প্রোডাক্ট সাব-কন্ট্রাক্ট এ তৈরি করি। লেবেল আমাদের থাকে।
ভদ্রলোক আমাকে এখনও বসতে বলেননি। তাই মনে-মনে বেশ রাগ হচ্ছিল। কিন্তু দরকারটা আমার–তাই দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছিলাম। এখন ওঁর লোভ চকচকে চোখ দেখে মনে হল লোভটাকে একটু উসকে দিই।
আমরা এখন ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের একটা ঘামাচির পাউডার তৈরি করছি…।
ঘামাচির পাউডার!
আজ্ঞে হ্যাঁ। জাপানের সুঘামাচি কর্পোরেশনের সঙ্গে আমরা টেকনিক্যাল কোলাবোরেশান করেছি।
তা হলে তো ফরেন গুডস! খুশিতে বিকশিত হলেন বৃদ্ধ। ওঁর দাঁতে সূর্যমুখী দেখা গেল। বললেন, দারুণ! দারুণ! ওই অ্যাডভেটাইজে এই টাইপের অ্যাকশন পাব ভাবিনি।
আমার টোটাল প্রোডাকশন আপনাদের হাতে আমি তুলে দেব। কথা দিলাম। তবে তার আগে একটা ছোট্ট খবর চাই। আপনাদের ওই দারুণ অ্যাডটা কোন এজেন্সিকে দিয়ে করিয়েছেন? আমি ওদের দিয়ে কয়েকটা অ্যাড করাতে চাই। তাতে আপনাদের নামও দেব।
আরে, বসুন, বসুন। হাতের ইশারায় আমাকে বসতে বলে বৃদ্ধ একটা পুরোনো ডায়েরির পাতা হাঁটকাতে লাগলেন।
অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজি এবং চোয়াল নাড়ার পর এজেন্সির নাম-ঠিকানাটা আমাকে দিলেন। গলার স্বর যথাসম্ভব মিষ্টি করার চেষ্টা করে অনেক বড়-বড় লাভের লোভ দেখালেন আমাকে। ওঁর কথার চেয়ে গলায় স্বর আমাকে বেশি আগ্রহী করে তুলছিল। কারণ, কাক যখন কোকিলের গলায় কথা বলার চেষ্টা করে তখন ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায় সেটা জানার কৌতূহল আমার বহুদিনের।
কাজ শেষ করে পুরোনো বাড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে দেখি রাগি সূর্যকে সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে মেঘ কখন যেন পিঠটান দিয়েছে। গনগনে রোদে ভাজা-ভাজা রাস্তায় যখন হাঁটতে শুরু করলাম তখনও কসমেটিক্স কোম্পানির বাড়িটার বিড়ি আর বাথরুমের গন্ধ আমার নাকে লেগে রয়েছে।
রাস্তার ধারের একটা দোকানে বসে টিফিন করলাম। একটা ঠান্ডা কোক গলায় ঢালোম। খানিকটা জিরিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম অভিযানে।
এখন যেতে হবে ওয়েলিংটন স্কোয়ার অঞ্চলে, স্পেকট্রাম অ্যাড-এর অফিসে।
বাসস্টপে একা-একা দাঁড়িয়ে যখন দরদর করে ঘামছি তখন আর-একবার মনে হল বর্ষা এলে ভালো হত। এবারও দু-বর্ষার কথাই বলছি।
.
স্পেকট্রাম অ্যাড-এর অফিসটা বি.সি.এল.-এর ঠিক উলটো। ইন্ডিয়ান মিরার স্ট্রিটে ওদের ছোট্ট অফিস। কাচ আর প্লাস্টিক দিয়ে দারুণ মড স্টাইলে সাজানো। রিসেপশান কাউন্টারে বসে আছে ফরসা স্লিম একটি অল্পবয়েসি মেয়ে। পরনে হলুদ চুড়িদার। ওর কপালে চুলের ঝালর নেমে এসেছে। তার নীচেই টানা-টানা চোখ। মুখে একটা এসো এসো ভাব।
এসি থাকায় ভীষণ আরাম লাগছিল। আমেজে চোখ বুজে আসতে চাইছিল। কিন্তু এখন চোখ বুজলে চলবে না। চোখ খোলা রাখতে হবে। নইলে হয়তো একেবারে বুজতে হবে– দত্তগুপ্তের মতো।
