আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আমার কথা পুলিশ এখনও জানতে পারেনি। কিন্তু কী করে ওই ভদ্রমহিলাকে খুঁজে পাওয়া যায়? দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটবাড়ির কাছে গিয়ে আমি কি তা হলে নজর রাখব? যদি ওই মহিলাকে হঠাৎ করে দেখতে পেয়ে যাই! নাকি বর্ষা যেমন বলছে, ঝামেলায় না জড়িয়ে চুপচাপ থাকব?
সারাটা দিন এইসব পাগল করা চিন্তা নিয়ে কাটতে লাগল। মা বেশ কয়েকবার জিগ্যেস করল, কী হয়েছে। আমি প্রতিবারই পাশ কাটানো জবাব দিলাম। টের পাচ্ছিলাম, মিলি আর ব্রতীন বেশ দূরত্ব বজায় রেখে অদ্ভুত চোখে আমাকে দেখছে। কারণ, হাজার সমস্যাঁতেও ওরা কখনও আমাকে এরকম বিপর্যন্ত দেখেনি।
সিগারেটের পর সিগারেট পুড়তে লাগল। আচমকা এরকম বিপদে জড়িয়ে পড়ে নিজেকে বেশ অসহায় লাগছিল। তবে এও মনে হচ্ছিল, এরকম ঝামেলায় না জড়ালে বর্ষাকে এতটা কাছাকাছি পেতাম না। এই কাছাকাছির আলাদা কোনও মানে আছে কি না একমাত্র ভবিষ্যই এর উত্তর দিতে পারে।
অফিসে গিয়ে যান্ত্রিকভাবে কাজে বসে পড়লাম। বর্ষা ওর সিটে বসে কাজ করতে করতে বারবারই আমার দিকে দেখছিল। টিফিনের সময় ও আমার কাছে এল। চাপা গলায় বলল, কাগজে নিউজটা দেখেছেন, রীতেনদা?
দেখেছি। বোধহয় আজ সন্ধেবেলা খাস খবর-এ দেখাবে।
আজ মিস্টার দত্তগুপ্তের ওখানে ফোন করতে আমার ভয় করছে।
ভয়ের কী আছে! তুমি তো জাস্ট একটা ফোন করছ। সেরকম হলে ঝপ করে লাইন কেটে দেবে। আর ফোনটা করবে কোনও এস.টি.ডি. বুথ থেকে।
বর্ষা আমার কথা শুনল বটে, তবে তেমন নিশ্চিন্ত হল বলে মনে হল না।
ওকে বললাম, সেরকম জরুরি কোনও খবর থাকলে আমাকে মোবাইলে ফোন করে জানাতে।
এমন সময় মংপু চলে এলেন আমাদের কাছে।
বর্ষা, আই ওয়ান্ট য়ু। কাম টু মাই রুম। চেন্নাইয়ের প্রজেক্টটা নিয়ে একটু ডিসকাশন আছে।
বর্ষা আমার দিকে একটা অসহায় চাউনি ছুঁড়ে দিয়ে মংপুর সঙ্গে ওঁর কাচের কিউবিল এর দিকে চলে গেল।
পুরকায়স্থর বর্ষা, আই ওয়ান্ট য়ু কথাটা অনেকক্ষণ ধরে বেসুরোভাবে আমার কানে বাজতে লাগল। কী চমৎকার! বর্ষা, তোমাকে চাই।
বর্ষার সঙ্গে এর বেশি আর কথা বলার সুযোগ পাইনি। বেশ আনমনাভাবে অফিস থেকে বাড়িতে ফিরে এলাম। তারপর বর্ষার ফোনের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
সন্ধেটা আমার টিভি দেখে কাটছিল।
সামনে চায়ের কাপ, আঙুলের ফাঁকে সিগারেট, আর চোখ টিভির রঙিন পরদায়। কখন ফোন করবে বর্ষা? কখন?
হঠাৎই কেউ যেন চাবুকের বাড়ি মারল আমার পিঠে। একী দেখছি আমি! টিভির পরদায় সেই মুখ! সেই মহিলা! দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে আমাকে বুদু বানিয়ে কেটে পড়েছিল।
একটা ট্যালকম পাউডারের বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছিল। ড্রিম ট্যালকম পাউডার লাগালে আপনার কোনওরকম অসুখ-বিসুখ করবে না, রূপকথার গল্পের মতো আপনি সারাজীবন সুখে-শান্তিতে বাস করতে পারবেন। দাম অত্যন্ত কম, এবং একটা কিনলে আর-একটা ফ্রি।
এরকম একটা স্বপ্নের পাউডারের বিজ্ঞাপনে সেই রহস্যময় মহিলা অভিনয় করছেন! ভদ্রমহিলার পোশাক-আশাক ও মেকাপ অন্যরকম হলেও ওঁকে চিনে নিতে আমার একটুও অসুবিধে হল না।
কিন্তু কী করে এঁকে ধরা যায়!
কিছুক্ষণ ভেবে ঠিক করলাম ওই পাউডার কোম্পানির অফিসে যাব। সেখান থেকেই শুরু করব আমার খোঁজ।
ভদ্রমহিলার হদিস পাওয়ার পর কোথায় আমার টেনশান কমবে, তা নয়, উলটে টেনশান যেন বেড়ে গেল। একটার পর একটা সিগারেট ধরিয়ে চললাম, আর বর্ষার ফোনের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বর্ষার ফোন এল।
মোবাইল ফোনে জিঙ্গল বেল-এর সুর বেজে উঠতেই ফোন তুলে নিলাম আমি।
হ্যালো।
রীতেনদা, বর্ষা বলছি।
বলো, কী খবর?
মিস রোজিকে ফোন করেছিলাম। বডি পোস্টমর্টেমে পাঠিয়ে পুলিশ ফ্ল্যাটটা সিল করে দিয়েছে। সমস্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখছে। ফলে ওই ফ্ল্যাটে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। মিস রোজি ওঁর রেসিডেন্সের ফোন নাম্বার দিয়েছেন। বলেছেন মাঝে-মাঝে ওঁকে ফোন করে খবর নিতে।
গুড। এদিকে আমার কাছে তো দারুণ খবর আছে।
কী খবর?
সেই মিস্টিরিয়াস লেডিকে পেয়ে গেছি। বর্ষাকে ব্যাপারটা খুলে বললাম।
এবার কী করবেন? উত্তেজিত গলায় জানতে চাইল ও।
কাল ওই পাউডারের কোম্পানি দিয়ে শুরু করব। তারপর কপাল যদি গোপালপুরে নিয়ে যায়, তাও যাব। তাই এখন দু-চারদিন অফিস যাওয়াটা আমার আনসার্টেইন। আমি ফোন করে মংপুকে বলে দেব। তুমি হায়েনা আর নেকড়ের পালের মধ্যে সাবধানে থেকো।
এসব ঠাট্টা এখন ভাল্লাগছে না, রীতেনদা। তারপর একটু থেমে? আমি কাল আপনার সঙ্গে যাব।
একটু ভেবে আমি বললাম, না–এখন নয়। সময় হলে আমি বলব। তুমি বরং টাইম পেলে ড্রিম ট্যাঙ্ক-এর অ্যাডটা দেখো। আর দরকার মনে করলেই আমাকে মোবাইলে ফোন কোরো, ও. কে.?
হু একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বর্ষা নিমরাজি হল।
ফোন রেখে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। একটা ঝাটের কাজে পা বাড়ানোর আগে মনটাকে শান্ত করা দরকার।
.
ড্রিম ট্যালক তৈরি করে ভারত কসমেটিক্স লিমিটেড। কয়েকটা বড়সড়ো স্টেশনারি দোকানে ঘোরাঘুরি করে, পাউডারের কৌটোর গায়ে লেখা কোম্পানির ঠিকানা জোগাড় করে, বি.সি.এল.-এর অফিসে পৌঁছতে খুব একটা কষ্ট হল না।
আজ সকাল থেকেই কিছুটা মেঘলা আকাশ, তাই গরমের দাপট কম। তবু বর্ষা এলে ভালো লাগত। দু-বর্ষার কথাই বলছি।
