বর্ষার কাছেই শুনলাম, দত্তগুপ্ত খুব ছোট মাপে ব্যাবসা শুরু করে মাত্র চারবছরেই সেটাকে বিশাল জায়গায় নিয়ে গেছেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ওঁর ক্লোজ কানেকশান ছিল। এসব ব্যবসায় এই টাইপের কানেকশান না থাকাটাই অস্বাভাবিক। তাদেরই কেউ কি দত্তগুপ্তকে খুন করল!
বর্ষাকে আমি নানা প্রশ্ন করলাম। তার মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর ও দিতে পারল। তবে বারবার করে আমাকে বলল, এসব কথা যেন আমাদের দুজনের বাইরে আর কারও কাছে না যায়, রীতেনদা।
তুমি মিস্টার দত্তগুপ্তের কাছে কতদিন ধরে এই পার্টটাইম জবটা করছিলে?
অলমোস্ট দু-বছর।
তোমাকে স্যালারি পেমেন্ট করত কে?
মিস্টার দত্তগুপ্ত নিজে।
তুমি কোথায় বসে টেলিফোনে গল্প করতে?
পার্কসার্কাসের ওই ফ্ল্যাটে বসে কথা বলতাম। ওখানে একটা ঘরে পাঁচটা টেলিফোন রাখা আছে–আমরা পাঁচজন মেয়ে সেখানে বসে একসঙ্গে কাজ করতাম।
ওদের নাম জানো?
না। সবাই ছদ্মনাম ব্যবহার করত। ওরাও আমাকে কঙ্কণা নামে চিনত।
তোমাদের আসল নাম কে কে জানত?
মিস্টার দত্তগুপ্ত জানতেন। আর জানতেন ওঁর পি. এ. মিস রোজি।
মিস রোজিকে কেমন দেখতে?
বর্ষা মিস রোজির চেহারার মোটামুটি একটা বর্ণনা দিল। সেটা আমার দেখা রিসেপশানের ওই মহিলার সঙ্গে মোটেই মিলল না।
তখন আমি রহস্যময়ী সেই মহিলার চেহারা যতটা সম্ভব খুঁটিয়ে বর্ণনা করলাম। তারপর জানতে চাইলাম, এরকম চেহারার কাউকে তুমি ওখানে দেখেছ?
কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করে বর্ষা বলল, ম-ম-না।
যে-পাঁচজন টেলিফোনে কথা বলত তাদের দেখতে কেমন?
না–ওদের চেহারার সঙ্গেও আপনার ওই ভদ্রমহিলার কোনও মিল নেই।
কিছুক্ষণ চিন্তা করে আমি বললাম, ওই মহিলাকে পেলে অনেক কিছু জানা যেত। কে জানে, হয়তো দত্তগুপ্তকে উনিই শেষ করে দিয়েছেন…।
বর্ষা এতক্ষণে নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছে। বেয়ারাকে ডেকে বিল মিটিয়ে আমরা রাস্তায় বেরিয়ে এলাম।
বর্ষা একটু ইতস্তত করে বলল, কাল আমার দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে যাওয়ার কথা ছিল…আমি আর ওখানে যাব না।
না, যেয়ো না। তবে মিস রোজিকে একটা ফোন করে বোলো যে, তোমার শরীর খারাপ। তখন উনি নিশ্চয়ই বলবেন, দত্তগুপ্ত মার্ডার হয়েছেন। ওঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা চালালে তুমি হয়তো অনেক কিছু জানতে পারবে। সেগুলো আমাকে বোলো। দুজনে ডিসকাস করে যা হোক একটা রাস্তা খুঁজে বের করব।
আমরা চুপচাপ থাকি না! আমাদের ঝামেলায় জড়ানোর কী দরকার!
বর্ষার মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বললাম, তোমার হয়তো ঝামেলায় না জড়ালেও চলবে, কিন্তু আমি যে অলরেডি ঝামেলায় জড়িয়ে গেছি। ওই মোটা ভদ্রলোক সিঁড়িতে আমাকে দেখেছেন। ফ্ল্যাটের কোথাও-না-কোথাও হয়তো আমার আঙুলের ছাপ রয়ে গেছে। এমন কী নাম আর মোবাইল নাম্বারও হয়তো কোনও খাতা-টাতা বা ডায়েরিতে লেখা আছে। পুলিশ ইনভেস্টিগেশান শুরু করলে দু-পাঁচ দিনের মধ্যেই আমার কথা জানতে পারবে। তখন আমাকে নির্ঘাত অ্যারেস্ট করবে। মা-ভাই-বোনের কাছে আমি আর মুখ দেখাতে পারব না। চাকরিটাও হয়তো খোয়াতে হবে। একটু থেমে কয়েকবার শ্বাস টানলাম আমি। ভেতরে-ভেতরে একটা গোঁয়ার্তুমি টের পাচ্ছিলাম। সেই সঙ্গে রাগও হচ্ছিল। অন্যায় ইচ্ছে নিয়ে আমি দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম ঠিক, কিন্তু কোনও অন্যায় আমি করিনি। দত্তগুপ্তকে কেনা-কে মার্ডার করেছে, অথচ সেই দায়টা চেপে যাবে আমার ঘাড়ে! বেশ মজার ব্যাপার তো! ওই ভদ্রমহিলাকে সামনে পেলে একবার দেখে নিতাম।
না, বর্ষা–এত সহজে আমি ছেড়ে দেব না। জেদি ঘোড়ার মতো এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লাম আমি ও ওই মিস্টিরিয়াস লেডিকে আমি খুঁজে বের করবই! তুমি আমার সঙ্গে থাকতে পারোনাও থাকতে পারো। আই ডোন্ট মাইন্ড। আই ডোন্ট কেয়ার ইভন। দিস ইজ মাই গেম। শুধু-শুধু তোমাকে বাড়ি থেকে ডেকে এনে ট্রাবল দিলাম…।
ভালোবাসার অস্কার নমিনি হয়ে রাস্তার মাঝে চারপাশের লোকজনের চোখের সামনে আমি বর্ষার পায়ের কাছে হাঁটুগেড়ে বসে পড়তে পারি। কিন্তু আমাকে অন্যায়ভাবে খুনের দায়ে কেউ জড়াতে চাইলে হাঁটুগেড়ে বসার কোনও প্রশ্নই নেই। বর্ষা পাশে না থাকতে চায় না থাক। গ্রীষ্ম তো রইল!
বাসস্টপে দাঁড়িয়ে আমরা গ্রীষ্ম অনুভব করছিলাম। গুমোট চটচটে গরম। গাছের একটি পাতাও নড়ছে না।
বর্ষা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আড়চোখে দেখল আমাকে। তারপর অপরাধী গলায় বলল, সরি, রীতেনদা। আপনি যা ভালো বোঝেন করুন। আমি পাশে আছি। দিস ইজ আওয়ার গেম।
ওর কথাটা শোনামাত্রই এত আনন্দ হল যে, সম্পর্ক অন্যরকম হলে আর পরিবেশ অন্যরকম হলে ওকে একেবারে জাপটে ধরে একটা ইয়ে খেতাম।
বর্ষা আমাকে ওর বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার অনুমতি দিল। আর আমার মোবাইল নাম্বারটাও টুকে নিল।
বাড়ি ফেরার পথে মায়ের ফোন পেলাম। আমার ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে দুশিন্তায় ফোন করেছে।
মায়ের কথায় মনে-মনে হাসি পেল।
আমার দুশ্চিন্তার কথা মা যদি জানত!
.
০৪.
পরদিন খবরের কাগজে তিন নম্বর পৃষ্ঠায় ছোট্ট করে খবরটা ছাপা হল।
দত্তগুপ্তের পুরো নাম পিনাকী দত্তগুপ্ত। বয়েস বাহান্ন। ওঁর বেআইনি ব্যবসা মাপে বেশ বড়। পুলিশের ধারণা বখরার ব্যাপার নিয়ে গোলমাল হওয়ায় অপরাধজগতের কেউ ওঁকে খুন করেছে। মুখে বালিশ চাপা দিয়ে গুলি করার কারণ খুনি গুলির আওয়াজ চাপা দিতে চেষ্টা করেছে। এখনও সন্দেহভাজন কাউকে পাওয়া যায়নি। পুলিশ ব্যাপারটা তদন্ত করে দেখছে।
