রীতেনদা! বর্ষা অবাক হয়ে গেলঃ আপনি আমার নাম্বার পেলেন কী করে!
ওসব পরে বলব। এক্ষুনি তোমার সঙ্গে একবার দেখা হওয়া দরকার।
ন-না। বরং কাল অফিসে বলবেন।
বর্ষা, ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। দু-বছর ধরে তোমার সঙ্গে একই সেকশানে কাজ করছি– কোনওদিন তোমার ফোন নাম্বার জানতে চেয়েছি। কিন্তু এখন অ্যাবসলিউট ইমার্জেন্সি। আমাদের এক্ষুনি দেখা হওয়া দরকার–ফোনে এসব কথা বলা যাবে না।
কাল পর্যন্ত ওয়েট করা যায় না…তা হলে অফিসে…।
আমি ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেলাম। একটু রূঢ় গলায় বললাম, পি. দত্তগুপ্ত নামে কোনও ক্লিয়ারিং এজেন্টকে চেনো? পার্কসার্কাসে তিনতলায় ফ্ল্যাট…।
ন-না তো, চিনতে পারছি না তো! কেন, চেনার কথা?
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সিক্রেসি আর প্রাইভেসি ছিল দত্তগুপ্তের ক্যাপিটাল। সোজা আঙুলে দেখছি ঘি উঠবে না!
অতএব আঙুল বাঁকাতে হল।
চিনতে পারছ না! আরে যে-দত্তগুপ্ত তোমার নাম রেখেছে কঙ্কণা। ও-প্রান্তে চমকে উঠে শ্বাস টানল বর্ষা।
আমি আরও বললাম, একটা ভালো খবর আছে। দত্তগুপ্ত ঘণ্টাদেড়েক আগে ওঁর ফ্ল্যাটে মার্ডার হয়েছেন।
কী বলছেন, রীতেনদা! বর্ষা একেবারে আঁতকে উঠল।
হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। এবার নিশ্চয়ই তোমার দেখা করতে কোনও অসুবিধে হবে না!
আরও আধঘণ্টা পর, সাড়ে আটটা নাগাদ, আমি বর্ষার মুখোমুখি বসে কথা বলতে শুরু করলাম।
মৌলালির মোড়ের কাছাকাছি একটা রেস্তরাঁয় আমরা চা আর ওমলেট নিয়ে মুখোমুখি বসেছি। বর্ষা শাড়ি পরে এসেছে। তাতে ওর ধার এতটুকুও কমেনি–অন্তত আমার কাছে। কোনও রেস্তরাঁয় এই প্রথম আমরা একান্তে বসেছি। পরিস্থিতি অন্যরকম হলে প্রথম এভাবে দেখা হওয়ার ব্যাপারটা দারুণ হত।
আমি নীচু গলায় বর্ষাকে সব খুলে বললাম। আমার অন্যায় বন্ধুত্বের আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে গিয়ে ক্ষোভে লজ্জায় গলা জড়িয়ে গেল, চোখে জল আসতে চাইল। বললাম, নিঃসঙ্গতায় পাগলের মতো লাগছিল আমার, মাথার গোলমাল হয়ে গিয়েছিল। আমাকে যেন ও ক্ষমা করে।
ক্ষমা করবে কী, বর্ষা তখন ফ্যাকাসে মুখে পাথর হয়ে বসে আছে–চোখে শূন্য দৃষ্টি।
অনেকক্ষণ পর ও কথা বলল, রীতেনদা, কী হবে এখন!
আমি একটু চিন্তা করে বললাম, চুপ করে বসে থাকা ছাড়া কোনও পথ নেই। তবে পুলিশ হয়তো দু-চারদিনের মধ্যে তোমাকে ফোন করতে পারে।
তখন কী বলব?
প্রশ্নটা অনেকক্ষণ ধরে মনের মধ্যে তোলপাড় করছিল। ভেতরে-ভেতরে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিলাম। কিন্তু বর্ষাকে জিগ্যেস করতে কেমন যেন সঙ্কোচ হচ্ছিল। আর এও মনে হচ্ছিল, ওর উত্তরটা আমাকে ভীষণ কষ্ট দেবে।
পুলিশের প্রশ্নটা যদি আমি তোমাকে জিগ্যেস করি?
বর্ষা মাথা নীচু করে বসে রইল।
দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে তোমার নাম আর ফোন নম্বর পাওয়া গেল কেন?
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল বর্ষা। ওর মুখ নীচু থাকায় মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না।
যখন ও মুখ তুলল তখন ওর চোখে জল।
আমার বুকের ভেতরে ভাঙচুর শুরু হয়ে গেল।
বর্ষা ধীরে-ধীরে ওর কথা বলে গেল। মাঝে-মাঝে নাক টানল, রুমাল দিয়ে চোখ মুছল।
দত্তগুপ্তের ব্যবসা মেয়ে নিয়ে। তবে ওঁর ব্যবসার অনেকগুলো স্তর আছে। তার একেবারে প্রাথমিক স্তরে রয়েছে টেলিফোনে বন্ধুর মতো সুখ-দুঃখের গল্প করা। তারপরের স্তর টেলিফোনে নোংরা রগরগে গল্প। এর পরের ধাপে টেলিফোনে নয়–একেবারে মুখোমুখি গল্প এবং প্রেম। তবে কিছুতেই শরীর ছোঁয়া চলবে না। দত্তগুপ্তের মাল্লম্যানরা সেটা নজর রাখত।
এরপর আসছে বডিলাইন লেভেল। এর প্রথম লেভেলের এলাকা হল চুমু থেকে গভীর শৃঙ্গার পর্যন্ত। আর তার পরের ফাইনাল লেভেল হল ফ্রি-স্টাইল।
নানান ধরনের ক্লায়েন্টের জন্যে দত্তগুপ্তের নানানরকম ব্যবস্থা।
দত্তগুপ্তের কাছে বর্ষা প্রথম লেভেলের চাকরি করত। সপ্তাহে তিনদিন দু-ঘণ্টা করে ওকে নানা ধরনের ক্লায়েন্টের সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করতে হত। এর জন্যে মাসে ও দেড় হাজার টাকা করে পেত। টেলিফোনে ওর ছদ্মনাম ছিল কঙ্কণা।
দত্তগুপ্ত ওকে বহুবারই বলেছেন প্রাথমিক স্তর থেকে ওপরের স্তরগুলোয় উঠতে। তাতে বর্ষা টাকাও পাবে অনেক বেশি। কিন্তু বর্ষা রাজি হয়নি। টাকার প্রয়োজন মেটানোর জন্যে এই কাজ ও করত বটে, তবে তার জন্যে রুচি বিসর্জন দেয়নি।
টেলি-গার্ল হওয়ার চাকরিটা ও পায় ওর এক বান্ধবীর মারফত। তখন ও আমাদের কোম্পানিতে চাকরি পায়নি। খুব অভাবের সময়ে এই চাকরিটা ওকে দারুণ সাহায্য করেছে। তা ছাড়া দত্তগুপ্ত ওর সঙ্গে কখনও খারাপ ব্যবহার করেননি, কখনও কোনও অন্যায় প্রস্তাবও দেননি। এখন চাকরিটা চলে যাওয়াতে ওর একটু অসুবিধেই হবে।
রীতেনদা, আপনি হয়তো আমাকে খারাপ ভাবছেন…কান্না চাপতে-চাপতে বর্ষা কোনওরকমে বলল, কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনাকে যা-যা বললাম সব অক্ষরে-অক্ষরে সত্যি। আমি শুধু টেলিফোনেই গল্প করতাম–তার বেশি কিছু নয়। তবে অনেক সময় অনেক কিছু দেখতাম…সেসব কাউকে বলা যাবে না। মিস্টার দত্তগুপ্ত এই একটা ব্যাপারে বারবার করে ওয়ার্নিং দিয়েছিলেন। ওঁর অনেক বাজে ধরনের লোকজন জানাচেনা ছিল। কেউ বেয়াড়াপনা করলে তাকে ঢিট করার ব্যবস্থা ওই লোকগুলোই করত।
বর্ষা এখনও রুমাল ব্যবহার করে চলেছে। ওর চোখ ফুলে উঠেছে। আমি ওকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম। আজ সকালেই আমরা কত দূরে ছিলাম, আর এখন কত কাছাকাছি চলে এসেছি!
