হঠাৎই আমার মনে হল, আমার নাম, মোবাইল নাম্বার সবই দত্তগুপ্তদের কাছে রয়েছে। এই খুনের তদন্ত করতে এসে পুলিশ যদি সেসব খুঁজে পায় তা হলে আমাকেই হয়তো মার্ডারার বলে সন্দেহ করবে। তা ছাড়া বাড়িতে অফিসে সবাই জেনে যাবে আমি এই ফ্ল্যাটে কেন এসেছিলাম। আমার মনের অবস্থাটা কেউ বুঝতে চাইবে না। শুধু অভিযোগের আঙুল তুলেই চেনা-জানা মানুষজন তাদের দায়িত্ব শেষ করবে।
চটপট চলে গেলাম রিসেপশান কাউন্টারের ওপারে। কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কে আমার নাম আর মোবাইল নাম্বার থাকাটা অসম্ভব নয়। মেশিনটা অন করাই ছিল। অভ্যস্ত হাতে হার্ড ডিস্কের সব ফাইল মুছে ফেলার নির্দেশ দিলাম। কম্পিউটার জানতে চাইল আমি সত্যিই সব ফাইল মুছে ফেলতে চাইছি কি না। উত্তরে আমি ওয়াই টিপে এন্টার বোতামটা টিপে দিলাম।
এইভাবে পাগলের মতো একের পর এক ডিরেক্টরি মুছে ফেলতে লাগলাম।
কম্পিউটার যখন মুছে ফেলার কাজ করছিল সেই সময়ে আমি সবকটা ড্রয়ার খুলে কাগজপত্র হাঁটকাতে লাগলাম।
খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎই একটা ডায়েরিগোছের খাতা পেয়ে গেলাম। তাতে অনেক মেয়ের নাম লেখানামের পাশেই লেখা রয়েছে টেলিফোন নাম্বার। আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার নজরে পড়ল। প্রতিটি মেয়ের নামের পাশে ব্র্যাকেটে একটি করে নাম লেখা রয়েছে। যেমন, শ্রীজাতা সরকার (সিমি) : ২৪৩ ৭১১২।
লিস্টটায় দ্রুত নজর বোলাতে গিয়ে মারাত্মক একটা ধাক্কা খেলাম।
বর্ষা দাশগুপ্ত (কঙ্কণা) : ২৪৫ ০৮৬৩।
বর্ষার নাম এখানে কেন! ওর ফোন নাম্বার জানি না, তবে নাম-পদবি দুটোই হুবহু মিলে যাচ্ছে! ওর সঙ্গে দত্তগুপ্তের কি কোনও যোগাযোগ ছিল?
একটা কাগজের টুকরোয় ওর ফোন নাম্বারটা টুকে নিয়ে সেটা বুকপকেটে রাখলাম।
আরও কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও যখন আমার নাম বা ফোন নাম্বার পেলাম না তখন খানিকটা স্বস্তি পেলাম। তা হলে দত্তগুপ্তের যা-কিছু রেকর্ড ছিল সবই ওই হার্ড ডিস্কে!
কম্পিউটারে ফাইল মোছামুছির কাজ শেষ হতেই পকেট থেকে রুমাল বের করলাম। ফ্ল্যাটে ঢোকার পর থেকে যেখানে-যেখানে আমার আঙুলের ছাপ পড়েছে বলে মনে হল সেই সব জায়গা পাগলের মতো মুছতে শুরু করলাম। উত্তেজনায় মাথা ঠিকমতো কাজ করছিল না। কেউ যদি ফ্ল্যাটে এসে এখন আমাকে দেখতে পায় তা হলে সর্বনাশের আর কিছু বাকি থাকবে না।
তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করে খুব সাবধানে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। তারপর রুমাল দিয়ে হাতলটা ধরে পাল্লা টেনে দিতেই নাইটল্যাচ ক্লিক শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। রাস্তায় বেরিয়েই বর্ষাকে একটা ফোন করতে হবে। তখনই বুঝব দত্তগুপ্তের বর্ষা আমার বর্ষা কি না।
কিন্তু ফ্ল্যাটবাড়িটা থেকে বেরিয়ে আসার সময় একটা ছোট্ট ভুল করে বসলাম। মাথা ঠান্ডা থাকলে এই ভুলটা হয়তো হত না।
দোতলার সিঁড়ি দিয়ে যখন একতলায় নামছি তখন একজন মোটাসোটা ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা। মাথায় টাক, চর্বি-থলথলে মুখ, কোলে ভুড়ি। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে হাঁফিয়ে পড়েছেন।
আমাকে দেখে অবাঙালি টানে জিগ্যেস করলেন, দোত্তোগুপ্তাবাবুর ফ্লেটটা কো-তোলায় হোবে বলতে পারেন? ফোনে দোতোলা বোলল না সেকিন্ড ফ্লোর বোলল…।
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, বাংলা তিনতলায়, ইংরেজি সেকেন্ড ফ্লোর। তারপর ওঁর জলহস্তীর মতো চেহারা আর ঘাম-জবজবে মুখ দেখে কেমন যেন মায়া হল। বেচারা কষ্ট করে আরও কতকগুলো সিঁড়ি ভাঙবে! তাই যোগ করলামঃ কিন্তু ওঁর ফ্ল্যাট তো এখন বন্ধ আছে।
বোন্ধ! ইয়ে কেইসন কোম্পনি? এতোটা পোথ দওড় করিয়ে…।
হঠাৎই বুঝলাম ওঁর সঙ্গে কথা বলে ভুল করেছি। কিন্তু এখন তীর হাত থেকে বেরিয়ে গেছে। পুলিশ যদি দত্তগুপ্তের খুনের তদন্ত করতে করতে এই ভদ্রলোকের খোঁজ পায় তা হলে আমার খোঁজ শুরু করতে আর দেরি হবে না।
মাথা নীচু করে তরতরে পায়ে সিঁড়ি নামতে শুরু করলাম। আমার কেমন যেন দম আটকে আসছিল। একটু বাতাসের জন্যে ভীষণ তেষ্টা পাচ্ছিল।
.
০৩.
পার্কসার্কাস ময়দানের কাছে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে বড়-বড় শ্বাস নিলাম। ভেতরের অস্থির ওলটপালট ব্যাপারটা ধীরে-ধীরে স্থির হয়ে এল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে অলস চোখে গাড়ি, বাস, অটো, ট্রাম আর লোকজন দেখতে লাগলাম।
তারপর, মন যখন পুরোপুরি শান্ত হল, তখন পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করলাম। ফোনের সুইচ অন করে বুক পকেট থেকে বর্ষার ফোন নাম্বার লেখা চিরকুটটা বের করে নিলাম। ওর নাম্বারটা ডায়াল করার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমি মনে-মনে ভগবানকে ডাকছিলাম : দত্তগুপ্তের বর্ষা আর আমার অস্কার পুরস্কার বর্ষা যেন এক না হয়।
কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর ও-প্রান্তে ফোন ধরে কেউ হ্যালো বলল। আর সঙ্গে-সঙ্গে আমার চোখের সামনে পার্কসার্কাস অঞ্চলটা বনবন করে লাট খেয়ে আবার কোনওরকমে সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করল, মাতালের মতো টলতে লাগল। কারণ, দুটো বর্ষা এক হয়ে গেছে!
আমি কুলকুল করে ঘামতে শুরু করলাম। কী বলব এখন ওকে?
ও-প্রান্তে বর্ষা হ্যালো হ্যালো বলেই চলেছিল। কয়েক সেকেন্ড এলোমেলো ভাবনার পর আমি খসখসে গলায় বললাম, রীতেনদা বলছি। তোমার সঙ্গে এক্ষুনি খুব জরুরি দরকার আছে।
