সর্বেশ্বর রায় বললেন, মিস্টার আপ্তে, আমি আগামীকাল কবুতর ছেড়ে যেতে চাই। তা না হলে আমার প্রায় পঞ্চাশহাজার টাকা ক্ষতি হয়ে যাবে।
সেটা আপনি ক্রসবিকেই বলবেন–। জানালেন এজেন্ট জেড।
প্রসাদজি মিস্টার আপ্তের জন্যে ওপরে একটা ঘরের ব্যবস্থা করলেন। সবাই লাইব্রেরি ছেড়ে পা বাড়ালেন নিজের নিজের ঘরের দিকে।
সুচরিতাকে নিয়ে ওপরে ওঠার সময় শুধু শুনলাম, শ্রীনরসিংহ নিজের মনেই বলছেন, খুবই ঘটছে আশ্চর্য এখানে ব্যাপার।
.
পরদিন সকালে উঠে চুল আঁচড়াতে যেতেই সাঙ্ঘাতিক অবাক হলাম আমি। আয়না দিয়েই চোখে পড়ল বান্ডিলটা। তারপর তাকালাম টেবিলের ওপর। এই তো! এই তো সেই চিঠির বান্ডিলটা। সুচরিতা চৌধুরীর নাম লেখা সেই চুরি যাওয়া চিঠিগুলো!
হঠাৎই বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা কথা মনে এল। সুরেন্দ্র পালিতের লেখা পাণ্ডুলিপির হাতের লেখা আর এই চিঠিগুলোর হাতের লেখা একই। তার মানে এই চিঠির লেখক শ্রীযুক্ত পালিতই। হয়তো এই চিঠিগুলোতে কোনও গোপন ইঙ্গিত আছে। এই যে, কবুতর থেকে লেখা চিঠিটা। এটা আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন মনে হলেও, হয়তো এর সাহায্যেই পালিতসাহেব লুকোনো নেকলেসের সন্ধানটা জানাতে চেয়েছেন।
এক দৌড়ে নীচে নেমে গিয়ে কিষাণ আপ্তেকে সবকিছু খুলে বলে আমার সন্দেহের কথা জানালাম।
তিনি প্রসাদজির সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমার কথা শুনে বললেন, মিস্টার মৈত্র, আপনি যা বলেছেন তা খুবই যুক্তিসঙ্গত। আমি এক্ষুনি থানায় যাচ্ছি। এখানকার সাইফার রিডারকে অনুরোধ করব এগুলো ডিসাইফার করার জন্যে। বলেই তিনি হন্তদন্ত হয়ে চিঠিগুলো নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
আমি প্রসাদজির সঙ্গে আলোচনা শুরু করলাম। বললাম, আচ্ছা প্রসাদজি, আপনার বাড়িতে কোনও গুপ্তপথ আছে কি?
না তো। জানালেন প্রসাদজি।
কোনওকালেই ছিল না? গভীর আগ্রহের সঙ্গে প্রশ্ন করলাম আমি।
উত্তরে প্রসাদজি জানালেন যে, অনেক আগে একটা সুড়ঙ্গপথ ছিল ওই লাইব্রেরিতেই। কিন্তু পরে সেটা নষ্ট হয়ে যায়।
আমি আর প্রসাদজি উঠে রওনা হলাম লাইব্রেরির দিকে। মাঝপথেই দেখা হল সুচরিতার সঙ্গে। ওকে সব কথা বললাম। শুনে অবাক হয়ে গেল ও। আমরা তিনজনে গিয়ে হাজির হলাম লাইব্রেরিতে।
প্রসাদজি এগিয়ে গেলেন দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবির দিকে। ছবিটা দেওয়াল থেকে নামিয়ে দেওয়ালের সেই অংশে একটু চাপ দিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে একটা আলমারির পাশ থেকে দেওয়ালের কিছুটা অংশ নিঃশব্দে সরে গেল। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। অতি সাধারণ একটা সুড়ঙ্গপথ। দেখে অনেক পুরোনো বলেই মনে হয়। প্রায় কুড়ি গজ যাওয়ার পর দেখা গেল পথ সম্পূর্ণ বন্ধ। সুড়ঙ্গের দেওয়াল অত্যন্ত জীর্ণ হওয়ায় ইটের গা থেকে চুন-বালি সব খসে-খসে পড়ছে।
মিনিটদশেক পর আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম। প্রসাদজি বললেন, মৈত্রসাব, কিছু ব্যাপারই আমার মাথায় ঢুকছে না। কোত্থেকে কী সব হচ্ছে–
এমন সময় লাইব্রেরির দরজায় হাজির হলেন এজেন্ট জেড। তার মুখ খুশিতে ভরপুর।
আমাদের দেখেই বললেন, সব জেনেছি আমি। আপনি ঠিকই বলেছিলেন, মিস্টার মৈত্র, কবুতরের নাম লেখা চিঠিটাই আসল। সেটা ডিকোড করা গেছে। এই দেখুন– বলে একটা কাগজ আমার দিকে এগিয়ে দিলেন তিনি।
কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলাম। তাতে লেখা–
আট বাঁ–সাতটা ইট-পাশে তিনটে কাগজ।
গজ উপরে
—-সুরেন্দ্র
এ তো জলের মতো স্পষ্ট! বলে উঠলাম আমি, তার মানে সুড়ঙ্গপথ ধরে আট গজ গিয়ে বাঁ দিকের দেওয়ালে দেখতে হবে। মেঝে থেকে সাতটা ইট ওপরে গিয়ে তিনটে ইট পাশে– ব্যস, তা হলেই পাওয়া যাবে।
আমিও ঠিক তাই ভেবেছি। বললেন কিষাণ আপ্তে, চলুন, আর দেরি করে লাভ কী!
শুরু করা যাক।
প্রসাদজি একটা মাপার ফিতে নিয়ে এলেন। মাপজোখ করে কাজ শুরু করলাম আমরা চারজন। সাতটা ইট ওপরে আর তিনটে হঁট পাশে যেতেই একটা আলগা ইট চোখে পড়ল। পকেট থেকে ছোট্ট ছুরি বের করে ইটটাকে বের করে নিলাম।
অন্ধকার একটা খুপরি। আনন্দে উত্তেজনায় দম বন্ধ হয়ে গেল যেন। কিষাণ আপ্তে চটপট হাত ঢুকিয়ে দিলেন খুপরির ভেতরে।
একটু পরেই হাত বের করে নিলেন। তার হাতে একটা কাগজ।
তাহলে কি কেউ আমাদের আগেই এ-জায়গার সন্ধান পেয়েছে! উঁচু গলায় বললাম আমি।
মনে তো হয় না। জানালেন এজেন্ট জেড। কাগজটা মেলে ধরলেন চোখের সামনে। কী আশ্চর্য! তাতে শুধু দেখা যাচ্ছেঃ
গ গ গ গ গ
গ গ গ গ গ
দেখে ভীষণ অবাক হলাম আমি। এরকম তিক্ত রসিকতার অর্থ কী?
কিষাণ আপ্তেকে লক্ষ করে বললাম, মিস্টার আপ্তে, আপনি কি এর অর্থ বুঝতে পারছেন?
উঁহু মাথা কঁকালেন এজেন্ট জেড।
প্রসাদজি বললেন, মিস্টার মৈত্র, চলুন বাইরে যাওয়া যাক।
বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা। প্রসাদজি গুপ্তপথটা বন্ধ করে দিয়ে ছবিটাকে আবার যথাস্থানে টাঙিয়ে রাখলেন।
এমন সময় লাইব্রেরিতে এসে ঢুকলেন কিরণ শর্মা ও ক্রসওয়ার্ড। কিষাণ আপ্তের হাতে চিরকুটটা দেখে এক লাফে এসে দাঁড়ালেন সামনে, বললেন, দেখি, দেখি। বলে আর দেওয়ার অপেক্ষা রাখলেন না। একরকম ছিনিয়েই নিলেন ওটা।
জেড বাধা দিলেন না।
আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম কিরণ শর্মার মুখের দিকে। হঠাৎ লক্ষ করলাম যে, একটা খুশির ঝিলিক লহমার জন্যে ছড়িয়ে পড়ল তার মুখে। তারপর অপেক্ষাকৃত গম্ভীর মুখ করে বলে উঠলেন, ভারি অন্যায়। এরকম রসিকতা করা ভারি অন্যায়।
