একটা কাঠের দরজা ঠেলে মহিলা ফ্ল্যাটের ভেতরের দিকে চলে গেলেন। আমি দুরুদুরু বুকে অন্যায় অভিযানের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
মিনিটখানেক পরেই ভদ্রমহিলা ফিরে এলেন। ছোট্ট করে হেসে বললেন, আপনি বসুন, উনি এখুনি আসছেন। আমি আপনার জন্যে কোল্ড ড্রিঙ্কস নিয়ে আসছি।
কথাটা বলেই মহিলা ফ্ল্যাটের সদর দরজা খুলে ব্যস্ত পায়ে চলে গেলেন। আমি অপেক্ষা করার জন্যে তৈরি হয়ে টেনশান কাটাতে একটা সিগারেট ধরালাম।
প্রায় মিনিট পনেরো কেটে যাওয়ার পর আমার ধৈর্যে টান পড়ল। দত্তগুপ্তের হল কী! সিগারেট কখন শেষ হয়ে গেছে! ঘড়ির কাঁটা সাড়ে সাতটার ঘরে পৌঁছে গেছে। নাঃ, এবার একটু খোঁজ করা দরকার।
সোফা ছেড়ে উঠে পড়লাম। এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে তারপর ফ্ল্যাটের ভেতরে যাওয়ার দরজাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। কান পেতে কথাবার্তার শব্দ শোনার চেষ্টা করলাম।, কোনও শব্দ নেই। এই ফ্ল্যাটটা বোধহয় শুধুই যোগাযোগের অফিস। সুইট লেডিজরা থাকে অন্য কোথাও হয়তো নিজের নিজের আস্তানায়।
দরজায় চাপ দিতেই পাল্লা খুলে গেল।
সামনেই খানিকটা ফাঁকা জায়গা। পুরোনো আমলে বারান্দা ছিল, এখন ডাইনিং স্পেস। আলো নেভানো থাকায় আবছা আঁধার ছড়িয়ে রয়েছে। তার ডানদিকে দুটো ঘর। দুটো ঘরের দরজাই হাট করে খোলা। একটা অন্ধকার, অন্যটায় আলো জ্বলছে।
চুরুটের হালকা গন্ধ নাকে আসছিল। মিস্টার দত্তগুপ্ত কি চুরুট খাচ্ছেন?
হঠাৎই ফোন বাজতে শুরু করল।
ভীষণভাবে চমকে উঠলাম। যেন চুরি করতে এসে ধরা পড়ে গেছি। তারপরই বুঝলাম, পকেটে আমার সেলফোন বাজছে।
ফোনটা পকেট থেকে বের করে অফ করে দিলাম। সুরেলা বাজনা থেমে যেতেই ফ্ল্যাটটা আগের চেয়ে দ্বিগুণ নিস্তব্ধ মনে হল।
যে-ঘরটায় আলো জ্বলছিল, পা টিপেটিপে সেই ঘরটার দিকে এগোলাম।
ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়েই দৃশ্যটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমি। এবং রাজধানী এক্সপ্রেস যেন দুরন্ত গতিতে ছুটে এসে আমার হৃৎপিণ্ডে ধাক্কা মারল। বুকের ভেতরে ধুকপুকুনি থমকে গেল। কয়েক লহমার জন্যে। তারপরই তাড়া খাওয়া কাঠবেড়ালির মতো ছুটতে শুরু করল ধকধক…ধকধক…।
ঘরের ধবধবে বিছানায় চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে প্যান্ট-শার্ট পরা একজন মানুষ। তার হাত পা অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। মুখটা দেখা যাচ্ছে না কারণ, মুখের ওপরে একটা বালিশ চাপা দেওয়া রয়েছে।
ইনিই কি মিস্টার পি. দত্তগুপ্ত? কে জানে!
কৌতূহল আমাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল।
ঘরের সর্বত্র বিলাসিতার সিলমোহর। আসবাবপত্র, বিছানা, লাইট, ফ্যান সবই প্রিমিয়াম কোয়ালিটির। তবে ঘরে পাগলের মতো অনুসন্ধান চালিয়ে কেউ সাজানো-গোছানো ঘরটাকে ছন্নছাড়া করে তুলেছে। বেশ কয়েকটা ড্রয়ার খোলা। আলমারির পাল্লা খোলা। জামাকাপড়, কাগজপত্র সব মেঝেতে ছড়ানো।
ঘরের এক কোণে বিদেশি রঙিন টিভিতে বিবিসি-র খবর চলছে। কিন্তু ভলিয়ুম কমানো থাকায় কোনও শব্দ হচ্ছে না। আর হলেও বিছানায় বিচিত্র ঢঙে শুয়ে থাকা ভদ্রলোকের কানে সে আওয়াজ নিশ্চয়ই ঢুকত না।
বিছানার খুব কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতেই বালিশের গায়ে পোড়া গর্তটা আমার নজরে পড়ল। বালিশটা একটানে সরাতেই দত্তগুপ্তকে কিংবা বলা ভালো, দত্তগুপ্তের পাস্ট টেন্সকে–দেখা গেল। ওঁর ধ্বংস হয়ে যাওয়া মুখটা আসলে কেমন ছিল সেটা বুঝতে হলে প্রত্নতত্ত্ববিদের প্রয়োজন। ওঁর মাথার নীচের বালিশটা লাল। কখনও যে ওটা সাদা ছিল সেটা বেশ কষ্ট করে বুঝতে হয়।
হাতুড়ে অভিজ্ঞতা দিয়ে আমি দত্তগুপ্তের পালস দেখার চেষ্টা করলাম। অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। তবে ওঁর শরীরটা এখনও গরম আছে। মানে, যে-ই ওঁকে খুন করে থাকুক– ব্যাপারটা খুব বেশি আগে হয়নি। এদিক-ওদিক তাকিয়ে রিভলভারটা চোখে পড়ল না।
কে খুন করল দত্তগুপ্তকে? ওই মহিলা নয় তো! ওঁর আচরণ কেমন অদ্ভুত মনে হয়েছিল আমার। কিন্তু মেয়েরা কি এরকম নৃশংসভাবে রিভলভার ব্যবহার করে?
আমি যখন এই ফ্ল্যাটে আসি তখন দত্তগুপ্ত নিশ্চয়ই ওপারে চলে গেছেন। কারণ, যতই মুখে বালিশ চাপা দিয়ে আওয়াজ বন্ধ করার চেষ্টা হোক না কেন একটা ভোতা শব্দ নিশ্চয়ই আমার কানে আসত। এমনও তো হতে পারে, দত্তগুপ্তকে খুন-টুন করে ভদ্রমহিলা যখন ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যাওয়ার মতলব আঁটছিলেন ঠিক তখনই আমি এসে হাজির হয়েছি।
হতে পারে অনেক কিছুই। এখন ওই ভদ্রমহিলার খোঁজ করা দরকার। উনি যদি খুনি নাও হন, উনি নিশ্চয়ই কিছু-না-কিছু জানবেন। কোল্ড ড্রিঙ্কস আনার নাম করে উনি গেলেন কোথায়! চম্পট দেননি তো!
এই প্রথম কৌতূহলকে ছাপিয়ে ভয় আমার মনে জায়গা করে নিল। ঠান্ডা ঘাম তৈরি হল বুকে-পিঠে। তারপর ধীরে-ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে নামতে লাগল।
একটা নির্জন ফ্ল্যাটে আমি আর একটা ডেডবডি! এখন যদি কেউ আসে তা হলে কী ভাববে? যদি পুলিশ আসে!
প্রায় দৌড়ে রিসেপশানে চলে এলাম। আমাকে চমকে দিয়ে রিসেপশানের টেলিফোনটা বাজতে শুরু করল।
নিস্তব্ধ ফ্ল্যাটে টেলিফোনের আওয়াজ আমার বুকের ভেতরে হাতুড়ি পিটছিল। তাই রিসিভারটা তুলে কাউন্টারের ওপরে নামিয়ে রাখলাম। ফোনে একটা পুরুষকণ্ঠ হ্যালো হ্যালো বলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিল।
