আসার পথে লক্ষ করলাম, প্রকাশ রায়চৌধুরী দূর থেকে আমাকে দেখছে।
.
সেদিন রাতে, আটটা নাগাদ, মেসেজটা আর-একবার এল।
আমি পাড়ার চায়ের দোকানে বসে এক কাপ চা সামনে নিয়ে বর্ষার কথা ভাবছিলাম। মন টন ভীষণ খারাপ। তখনই বিপ-বিপ শব্দটা হল।
হঠাৎই মাথার মধ্যে কী যে হল, উচ্ছৃঙ্খল হতে খুব সাধ জাগল। বর্ষার ওপর অনেকটা অভিমান নিয়েই চায়ের কাপ ফেলে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। কাছাকাছি একটা ফোন বুথে ঢুকে পড়ে বোতাম টিপলাম : ৯৮৩০০ ০১২৩৪।
একটু পরেই ও-প্রান্তে একজন মহিলার মিষ্টি গলা পেলাম।
হ্যালো।
আপনারা আমার মোবাইল ফোনে একটু আগে একটা…একটা মেসেজ পাঠিয়েছেন। সকালেও মেসেজটা একবার পেয়েছিলাম।
আপনার মোবাইল নাম্বারটা কাইন্ডলি বলবেন?
নাম্বার বললাম।
কিছুক্ষণ পর ভদ্রমহিলা বললেন, আপনি মিস্টার রীতেন মিত্র?
হ্যাঁ। আমার গলাটা হঠাৎই কেমন শুকিয়ে গেল। ওরা আমার নাম জানল কেমন করে! তা হলে কি সবার মোবাইল নাম্বার আর নামের লিস্ট তৈরি করে তারপরই ওরা মেসেজ পাঠাতে শুরু করেছে।
আপনারা…মানে আমার নাম..ইয়ে…।
রিল্যাক্স, মিস্টার মিত্র। আপনি ফর নাথিং নার্ভাস হচ্ছেন। আমাদের বিজনেসের ক্যাপিটালই হল সিক্রেসি আর প্রাইভেসি। মহিলা আমাকে আশ্বাস দিলেন : আপনি কাল সন্ধে সাতটায় আমাদের অফিসে চলে আসুন। আমাদের এনরোলমেন্ট ফি দুশো টাকা। আর তারপর সার্ভিস অনুযায়ী চার্জ। ঠিক সাতটায় আসবেন কিন্তু!
এরপর তিনি পার্কসার্কাস অঞ্চলের একটি ঠিকানা বললেন। কীভাবে সেখানে পৌঁছতে হবে সেটা পাখি-পড়া করে বুঝিয়ে দিলেন। তারপর হেসে বললেন, ঘাবড়াবার কোনও কারণ নেই। এখানে এলে আপনার ভালো লাগবে। তবে মনে রাখবেন, তিনতলার ফ্ল্যাট ফ্ল্যাটের দরজায় নেমপ্লেটে লেখা আছে মিস্টার পি. দত্তগুপ্ত, ক্লিয়ারিং এজেন্ট। ওখানে লোক থাকবে। তাকে দুশো টাকা দিয়ে দেবেন ক্যাশ। তারপর আমরা আপনাকে খুশি করার জন্যে যা-যা করা দরকার করব। গুডনাইট।
কেমন একটা অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেলাম আমি। মনে-মনে বেশ কৌতূহল হচ্ছিল। দুশো টাকা খুব একটা বেশি নয়। তারপর কত–তিনশো, পাঁচশো, হাজার? একবার, মাত্র একটিবার, ব্যাপারটা চেখে দেখতে ক্ষতি কী! মা, মিলি, ব্রতীন, বর্ষা–কেউ কিছু টেরই পাবে না।
সুতরাং পরদিন কাঁটায়-কাঁটায় সন্ধে সাতটায় দত্তগুপ্তের ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির হলাম।
.
০২.
পালিশ করা বিশাল কাঠের দরজা। তাতে ম্যাজিক আই লাগানো। দরজার ডানদিকের ফ্রেমে কলিংবেলের বোতাম।
নেমপ্লেটের লেখাটা আর-একবার পড়ে নিয়ে কলিংবেলের বোতাম টিপলাম।
দত্তগুপ্তদের ফ্ল্যাটবাড়িটা বেশ পুরোনো ধাঁচের। এক-একটা তলার হাইট প্রায় পনেরো-ষোলো ফুট হবে। বাড়ির বাইরের চেহারাটা জব চার্নক হলেও ভেতরটা ঋত্বিক রোশন। অভিজাত পয়সাওয়ালা মানুষজনই এইসব ফ্ল্যাটে থাকে।
বাড়িতে ঢুকেই প্রথম যে-ব্যাপারটা আমার নজর কেড়েছে সেটা নির্জনতা। সিঁড়ি আর অলিন্দ দেখে মনে হয় না কেউ এখানে থাকে।
শব্দ করে দরজা খুলে গেল।
দরজা খুলতেই পারফিউমের উগ্র গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল।
দারুণ সাজগোজ করা একজন মহিলা ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে। ফরসা, গোলগাল চেহারা, কোঁকড়ানো চুল। বয়েসটা এমন জায়গায় চলে গেছে যে, মেকাপের কথা আর শুনছে না।
মহিলা বড় বড় শ্বাস ফেলছিলেন। ওঁর ভারী বুক ওঠা-নামা করছিল।
আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। বুকের ভেতরটা টিপটিপ করছিল অকারণেই। বেশ টের পাচ্ছিলাম, কপালের পাশ দিয়ে ঘামের রেখা গড়িয়ে নামছে।
রুমাল বের করে ঘাম মুছে নিয়ে আমি বললাম, আমার…আমার নাম রীতেন মিত্র। সাতটায় আমার আসার কথা ছিল।
ভদ্রমহিলা হাসলেন। সঙ্গে-সঙ্গে ওঁর মুখটা মিষ্টি হয়ে গেল।
আসুন, ভেতরে আসুন। ওঁর গলাও দারুণ মিষ্টি।
আমি ভেতরে ঢুকতেই মহিলা দরজাটা আবার বন্ধ করে দিলেন।
সামনের ঘরটা রিসেপশান কিউবিলের ঢঙে সাজানো। বাঁদিকে ঝকঝকে কাউন্টার–তার ওপরে টেলিফোন আর কম্পিউটার। পাশেই রাখা নোটপ্যাড আর পেন।
ডান দিকের কোণে একটা সুদৃশ্য টুলে রাখা আছে একটা চিনেমাটির ফুলদানি–তাতে রংবেরঙের ফুলের তোড়া বসানো। তার পাশ ঘেঁষে লম্বা একটা সোফা। সোফার ঠিক ওপরে দেওয়ালে টাঙানো একটা রঙিন ছবি। ছবিতে কয়েকটি মেয়ে লোভনীয় ঢঙে দাঁড়িয়ে। ওদের শরীরের ওপরে লেবেল সাঁটার মতো করে একটা ইংরেজি ক্যাপশান লেখা? সে হ্যালো টু এভরিবডি। তার পাশেই একটা ক্যালেন্ডার আর একটা ফুটফুটে বাচ্চার ছবি ঝুলছে। অন্যায় খেলার ছিটেফেঁটাও নেই কোথাও।
ফ্ল্যাটটা কেমন নিঝুম আর ফঁকা-ফঁকা। তাতে আমার একটু অবাক লাগছিল। কিন্তু ওরাই তো ফোনে বলেছে, সিক্রেসি আর প্রাইভেসি ওদের ক্যাপিটাল! তাই হয়তো এ-সময়টায় আর কাউকে আসতে বলেনি।
ভদ্রমহিলা কেমন যেন এলোমেলো ব্যস্ততা দেখাচ্ছিলেন। নার্ভাসভাবে বারবার শাড়ি ঠিক করছিলেন। আমাকে সোফায় বসতে বলে কাউন্টারের ওপাশে গিয়ে এদিক-ওদিক হাঁটকাতে লাগলেন।
আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে ঢোঁক গিলে বললাম, আমার…দুশো টাকা দেওয়ার কথা ছিল। টাকাটা পকেট থেকে বের করে ওঁর দিকে এগিয়ে দিলাম।
কাঁপা হাতে টাকাটা নিয়ে রিসেপশান কাউন্টারের একটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলেন। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, আপনি একটু বসুন। আমি মিস্টার দত্তগুপ্তকে খবর দিচ্ছি।
