গত চার-পাঁচ বছরে যে-কটা সফ্টওয়্যার কোম্পানি নাম করেছে তার মধ্যে আমাদের কোম্পানি সফট কর্পোরেশন বেশ এগিয়ে রয়েছে। এখানে প্রোগ্রামার হিসেবে মাইনে আমি খারাপ পাই না। কিন্তু ফ্যামিলি বার্ডেন থাকায় অর্ডার সাপ্লাইয়ের ছোটখাটো একটা ব্যবসাও চালাই। ব্যবসার খাতিরেই মাসদুয়েক হল মোবাইল ফোনটা নিয়েছি। আমার ছোটভাই ব্রতীন বি.এস-সি. পাশ করেছে। গত বছর। তারপর ব্যবসার আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে বেশ খানিকটা হাঁফ ছাড়তে পারছি।
হঠাৎই বিপ-বিপ করে দুবার শব্দ হল।
চমকে উঠলাম। প্রথমে মনে হল আমার ফোনের ব্যাটারি হয়তো কাবু হয়ে পড়েছে। কারণ, ব্যাটারি লো হলেই বিপ শব্দ হয়। কিন্তু সে তো একটা শব্দ–দুবার তো নয়! তখনই খেয়াল হল, সেলফোনে কেউ কোনও মেসেজ পাঠালে দুবার বিপ-বিপ শব্দ হয়। দিনসাতেক আগে হ্যান্ডসেট রিপেয়ার করার একজন টেকনিশিয়ানের মেসেজ পেয়েছিলাম সঙ্গে তার মোবাইল নাম্বার।
পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে দেখি তার এল সি ডি প্যানেলে একটা মেসেজ ফুটে উঠেছে। মেসেজটা ভারী অদ্ভুত?
সেক্সি ফ্রেন্ডশিপ উইথ সুইট লেডিজ! সিক্রেসি গ্যারান্টিড।
কল ৯৮৩০০ ০১২৩৪।
তার মানে! মিষ্টি মেয়েদের সঙ্গে অন্যায় বন্ধুত্ব! কেউ জানতে পারবে না!
মিনিটখানেকের জন্যে আমার মনটা চঞ্চল হয়ে উঠল। কোনও মেয়ের সঙ্গে আমার কখনও সেরকম ঘনিষ্ঠতা হয়নি। সেরকম কোনও সুযোগও আসেনি।
আমার পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই বাপি চলে গেছেন। একমাত্র বোন মিলি আর ওর পরের ভাই ব্রতীন তখন বেশ ছোট। মা ক্রনিক আলসারের রুগি। কী করে যে দিনের পর দিন লড়াই চালিয়েছি সে আমিই জানি! আজ মায়ের বয়েস আরও বেড়েছে, আরও অসুস্থ হয়েছে। মিলির এখনও বিয়ে দেওয়া হয়নি। মা সবসময় সেই চিন্তা করে। আমি মায়ের কাছে আরও দুটো বছর সময় চেয়েছি। বলেছি, আমি আর ব্রতীন মিলে ব্যবসা দাঁড় করিয়ে মিলিকে ভালোভাবে পাত্রস্থ করব। কিন্তু মাঝে-মাঝে নিজেরই মনে হয়, শেষ পর্যন্ত কথা রাখতে পারব তো! বাপি চলে গিয়ে আমাকে বড় অসহায় করে গেছেন।
নিজেকে নিয়ে আমি বেশ ভাবি। বয়েস তিরিশ পেরিয়ে গেল। একজন সুপুরুষ যুবকের জীবনে যেসব সুন্দর-সুন্দর ঘটনা ঘটে তার কিছুই আমার কপালে জুটল না। বন্ধুবান্ধবের মুখে কত রোমান্টিক অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শুনি। শুনে রাতে কত উলটোপালটা কল্পনা করি। বর্ষাকে কত আদর করি। মাধুরী দীক্ষিত কিংবা জুলিয়া রবার্টসও আমার ভালোবাসাবাসির ছায়া-যুদ্ধ থেকে। বাদ যায় না। আমার মধ্যে যে একটা প্রেমিক মন আছে সেটা এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলতে পারি না।
হয়তো সেইজন্যেই মোবাইল ফোনের মেসেজটা আমার মনে দাগ কাটল। ফোন-নম্বরটা মুখস্থ হয়ে গেল সহজেই। তারপর ভাবলাম, এ আবার সেই পার্টি লাইন বা টেলি-ফ্রেন্ড-এর মতো নয়তো! যত ভালোবাসা শুধু টেলিফোনে! সেও তো আর-একরকম ছায়া-যুদ্ধ!
না, ওসব টেলিফোন-ঠেলিফোন নয়। আসল ব্যাপারটা আমার একবার চেখে দেখতে ইচ্ছে করছে।
তা হলে ওই নম্বরে পরে একটা ফোন করে দেখলে কেমন হয়!
আমার সফ্টওয়্যার ডেভেলাপমেন্টের কাজে বারবার ভুল হয়ে যেতে লাগল। যতই ছুটির সময় কাছে এগিয়ে আসতে লাগল ততই ভেতরে-ভেতরে চঞ্চল হয়ে উঠলাম।
সাড়ে পাঁচটা নাগাদ টেবিল ছেড়ে বর্ষার কাছে গেলাম।
ও একমনে কম্পিউটারে কাজ করছিল। অস্কার নমিনিরা কেউ ধারে কাছে নেই–শুধু আমি ছাড়া।
ঘাড় বেঁকিয়ে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল ও। ডান হাতের সুন্দর আঙুলগুলো মাউস আঁকড়ে রয়েছে। মাউসটা আমার হাত হতে পারত।
বলুন, রীতেনদা–।
আমি চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। প্লাস্টিক আর কাচের পার্টিশন দিয়ে তৈরি ছোট-ছোট কিউবি। যে-যার সিটে বসে কাজ করছে। শুধু এয়ারকুলারের ভোমরার ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।
কখন বেরোবে অফিস থেকে? আমি আলতো করে জিগ্যেস করলাম।
হাতের কাজটা কমপ্লিট হলেই বেরোব। একটু দিদির বাড়ি যেতে হবে।
বর্ষার বাড়ি শুনেছি এন্টালির দিকে। আর আমার সূর্য সেন স্ট্রিটে। তবুও অনেক সময় ওর সঙ্গে বাস স্টপ পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ হয়। তবে একা নয়–আরও দু-একজন নমিনি সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকে। কোনও-কোনও দিন মঙ্গল পুরকায়স্থ বর্ষাকে লিফ্ট দেন। বর্ষার কাছেই শুনেছি, মাঝে-মাঝেই নাকি উনি বর্ষাকে লাঞ্চ কিংবা ডিনারের প্রস্তাব দিতে ছাড়েন না।
সাহস করে বলতে পারলাম না, ঠিক আছে, দুজনে একসঙ্গে বেরোব। তার বদলে মুখ ফসকে অস্কার পুরস্কারের ব্যাপারটা ওকে বলে ফেললাম। শুনে ও তো হেসেই অস্থির।
আমি ওর হাসি দেখছিলাম। আর এদিক-ওদিক থেকে চার-পাঁচ জোড়া চোখ আমাদের দেখছিল।
ওর হাসির ঝিলিক কমলে পর বললাম, দ্যাখো, স্পষ্ট কথা বলাই ভালো। আমি কিন্তু সাধুপুরুষ নই–আমিও একজন অস্কার নমিনি।
আবার খিলখিল হাসি। তারপরঃ আপনি দারুণ জোক করতে পারেন। অস্কার অ্যাওয়ার্ড..অস্কার নমিনি…মাই গুডনেস! হাসির চোটে ওর চোখের কোণে জল এসে গিয়েছিল। আঙুল বুলিয়ে সেই জল মুছে নিল বর্ষা।
বর্ষার কাছে এলে আমার কী যে হয়! মনের সব কথা উজাড় করে বলতে ইচ্ছে করে। মোবাইল ফোনে আসা মেসেজটাও ওকে বলতে ইচ্ছে করল। তাই ভয় পেয়ে নিজের সিটে ফিরে এলাম।
