একটা করে বই রঘুপতি যাদব আর অশোকচন্দ্র গুপ্তকে দিয়ে রূপেন মজুমদার হেসে বললেন, পড়ে দেখবেন, একেবারে ওরিজিন্যাল। অন্য রাইটারদের মতো সাহেব বলিয়াছেন এরকম কোনও ব্যাপার নেই।
বই হাতে নিয়ে লিফটে করে নামতে নামতে এসিজি ভাবলেন, মানুষ সত্যি কতরকম হয়! মানুষ তাকে সবসময়ই অবাক করে–রংবেরঙের পাখির মতো।
রঘুপতি যাদব হাতঘড়িতে চোখ রাখলঃ রাত দশটা বেজে গেছে।
মার্ডার ডট কম
মাউসে ডাবল ক্লিক করতেই মনিটরে রঙিন ছবিটা পালটে গেল। আর ঠিক তখনই পারফিউমের গন্ধ নাকে এল আমার। সুতরাং কিবোর্ডে আঙুল চালানো থামিয়ে মনিটরের দিক থেকে চোখ সরালাম।
বর্ষা আমার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
কী দারুণ দেখাচ্ছে ওকে! গাঢ় নীলের ওপরে সাদা-ফুল চুড়িদার। গলায় সাদা ওড়না। কপালে টিপ, চোখে কাজল। নাকে সরষের দানার মতো নাকছাবি।
অফিসের কাজ ছাড়া আমার কাছে ও খুব একটা আসে না। আর যদিও বা হঠাৎ করে আসে, তো দু-পাঁচ মিনিটের বেশি দাঁড়ায় না। আমিই বরং এই প্রোগ্রামটা কেমন যেন ট্রাবল দিচ্ছে, অমুক ফ্লপিটা কি তোমার কাছে আছে?, ম্যানেজারসাহেব ডিপার্টমেন্ট ছেড়ে কোথায় গেলেন বলো তো!–এই সব ছলছুতোয় ওর সিটের কাছে যাই। সেখানে আশাবাদী দু-চারজন পুরুষের ভিড় সবসময়েই লেগে আছে। তাই আমার কেমন যেন লজ্জা করে। অথচ ওর কাছে না গিয়েও পারি না। ভেতর থেকে কে যেন আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়।
বর্ষার টেবিলের কাছে গেলেই আমার অস্কার পুরস্কারের কথা মনে পড়ে। দ্য নমিনিজ আর… বলেই চার-পাঁচটি নাম। আর তারপরই .অ্যান্ড দ্য অ্যাওয়ার্ড গোজ টু…। এই অফিসের চার পাঁচজন সেই অস্কার নমিনির মতোই ওর চারপাশে ঘুরঘুর করছে তার মধ্যে আমিও আছি। অ্যাওয়ার্ড শেষ পর্যন্ত কে পাবে জানি না।
রীতেনদা, একটা হেল্প করবেন?
এরকম মিষ্টি অনুরোধে সমরখন্দ-বোখারাও দিয়ে দেওয়া যায়। তাই বললাম, তোমাকে হেল্প করার জন্যে আমি আপাদমস্তক তৈরি। বলো, কী করতে পারি। ইট উইল বি মাই প্লেশার।
বর্ষা আমার পাশের একটা খালি চেয়ারে বসে পড়ল। তারপর মুখে একটা ছেলেমানুষি কাঁচুমাচু ভাব ফুটিয়ে আবদারের গলায় বলল, আপনার মোবাইল ফোনটা একটু ইউজ করতে দেবেন?
আমি বুক পকেট থেকে নোকিয়া সিক্স-ওয়ান-ওয়ান-জিরোটা বের করে ওর হাতে দিলাম। বললাম, ইচ্ছে হলে সারাদিন রাখতেও পারো।
না, না–জাস্ট একটা ফোন করব। হাসল ও ও অফিসের ফোন থেকে কিছুতেই লাইন পাচ্ছি না।
বর্ষা আমার সামনে বসেই বোতাম টিপতে শুরু করল।
আমি কি সিট ছেড়ে উঠে যাব?
না, না, আপনি থাকতে পারেন। প্রাইভেট কিছু নয়…দিদির সঙ্গে একটু কথা বলব।
আমি কম্পিউটারে কাজ বন্ধ রেখে বর্ষাকে অনুভব করতে লাগলাম।
আমাদের অফিসটা এয়ার কন্ডিশন্ড, কিন্তু কাচের জানলা দিয়ে বাইরের গনগনে রোদ্দুর দেখা যাচ্ছে। একইসঙ্গে শীত-গ্রীষ্ম এবং বর্ষা..দারুণ!
ফোন শেষ করে হ্যান্ডসেটটা আমাকে ফিরিয়ে দিতে দিতে বর্ষা বলল, অনেক চার্জ উঠল, না?
আমি হেসে বললাম, হ্যাঁ, সাংঘাতিক। কাল থেকে আমাকে টোল-পড়া অ্যালুমিনিয়ামের বাটি নিয়ে নীচে গণেশ অ্যাভিনিউয়ের ফুটপাথে ঘুরতে হবে।
বর্ষা হাসল। ওর গালে টোল পড়ল।
তোমাকে কিন্তু দারুণ দেখাচ্ছে। আজকের দিনটা সাবধানে থেকো।
কেন!
আমাদের অফিসে নেকড়ে আর হায়েনা তো কিছু কম নেই!
বর্ষা এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যে, মনে হল আমাকে ও তার মধ্যে ধরবে কি ধরবে না ভাবছে।
এমন সময় প্রকাশ রায়চৌধুরী এগিয়ে এল আমাদের কাছে।
ফরসা, লম্বা-চওড়া, মাথায় কঁকড়া চুল, গলায় সোনার চেন, একটু ওভারস্মার্ট। ও একজন অস্কার নমিনি। তাই বর্ষাকে আমার কাছে পাঁচমিনিটের বেশি বসতে দেখে সাঙ্ঘাতিকরকম উতলা হয়ে পড়েছে।
আমার দিকে আড়চোখে একপলক দেখে বর্ষার দিকে মনোযোগ দিল প্রকাশ : হাই রেইন, আমার কম্পিতে কিছু ডেটা ঢোকানোর ব্যবস্থা করো। মাই মেশিন ইজ স্টার্ভিং।
বর্ষাকে প্রকাশ রেইন বলে। তাই আমি ওকে মনে-মনে বলি রেইনম্যান।
আমার হাতের মোবাইল ফোনটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল প্রকাশ ও মোবাইল ফোনটা নেওয়ার পর রীতেনদার স্ট্যাটাস কিন্তু হেভি বেড়ে গেছে। আগে রীতেনদাকে কেউ পাত্তা দিত না–এখন থোড়া-থোড়া দিচ্ছে।
প্রকাশ বর্ষাকে আর-একবার ডেটার তাগাদা দিয়ে চলে গেল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার মুখ আর কান বেশ লাল হয়েছে।
বর্ষা নরম গলায় বলল, প্রকাশদার কথায় কিছু মাইন্ড করবেন না।
না, মাইন্ড করিনি। ব্যাপারটা খুব স্পষ্টঃ নেকড়ে হায়েনাকে কামড় বসিয়ে গেল।
খিলখিল করে হেসে উঠল বর্ষা। আমার বুকের ভেতরে পাগলা হাওয়া নেচে উঠল।
হঠাৎ দেখি আমাদের ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি ম্যানেজার মঙ্গল পুরকায়স্থ আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। আড়ালে ওঁকে আমরা মংপু বলে ডাকি।
মংপুও একজন অস্কার নমিনি। যদিও ওঁর বয়েস পঞ্চান্ন–একটি ছেলে, একটি মেয়ে, এবং একটি হস্তিনী স্ত্রী আছে।
আমি চাপা গলায় বর্ষাকে বললাম, আর-একটা গোদা নেকড়ে আসছে। তুমি সিটে ফিরে যাও। আমি আর কামড় খেতে চাই না। বরং বিকেলের দিকে দশমিনিট গল্প করতে যাব।
বর্ষা ও. কে. বলে চটপটে পায়ে নিজের সিটের দিকে রওনা দিল।
আর কী আশ্চর্য! মংপুও কম্পাসের অনুগত কাটার মতো গতিপথ পালটে বর্ষার পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করল।
