উঁহু– সঙ্গে-সঙ্গে জবাব দিল সুচরিতা।
তার মানে আবার তারা আসবে–দৃঢ়স্বরে বললাম আমি, হয় আজ রাতে, নয়তো কাল রাতে, নয় আগামী আর কোনও রাতে। তা হলে শুরু হোক আজ রাত থেকেই।
কী শুরু হবে? চোখ নামিয়ে প্রশ্ন করল সুচরিতা।
যাকগে…পরেই শুনবে–দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর। হ্যাঁ, ভালো কথা–তরুণ সান্যাল কবুতরে আজ থাকছে তো?
হ্যাঁ। কিন্তু ইব্রাহিমের ব্যাপারটার কী হল?
কিস্যু না। যে-অন্ধকারে ছিলাম এখনও সেই অন্ধকারে। ইব্রাহিমের সঙ্গে তেমন কেউ গোপনে দেখা করতে আসত না। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল আমার বুকের পাঁজর থেকে : চলো, ভেতরে যাওয়া যাক। বলে দুজনে কবুতরে ঢুকলাম।
সেখানেই দেখা হল ইন্সপেক্টর ক্রসবির সঙ্গে। আমাকে দেখে হাসলেন, বললেন, শুনেছেন তো, গত রাতে কবুতরে চোর এসেছিল!
হ্যাঁ, জবাব দিলাম আমি।
এতক্ষণ প্রসাদজিকে লক্ষ করিনি। তিনি ইন্সপেক্টরের পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বললেন, মিস্টার মৈত্র, আপনার সব কথাই আমি শুনেছি। আশা করি কবুতরে থাকতে আপনার কোনও অসুবিধে হবে না।
না, না,বাধা দিয়ে বলে উঠলাম আমি, কোনও অসুবিধে হচ্ছে না।
প্রসাদজি চলে গেলেন।
ইন্সপেক্টর আমার দিকে ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, কাঞ্চনবাবু, গতরাতে আপনি কবুতর ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলেন?
আমি সব খুলে বললাম। কিন্তু তিনি সন্তুষ্ট হলেন না বলেই মনে হল।
তিনি কি আমাকেই রাতের আগন্তুক বলে সন্দেহ করছেন নাকি? যাক গে, আমি আর সুচরিতা কোনও কথা না বলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম।
দুপরের খাওয়া-দাওয়ার পর তরুণ আর সুচরিতার সঙ্গে গোপনে আলোচনা করলাম। ঠিক হল, সুচরিতা একটা আলমারির পেছনে লুকিয়ে থাকবে, ঘরে কেউ ঢুকলেই আলো জ্বেলে দেবে। আর আমি থাকব টেবিলের পেছনে। সব শেষে তরুণ থাকবে দরজায় কাছে–যাতে দরজা দিয়ে কেউ পালাতে না পারে। রাত বারোটা থেকে আমরা অপেক্ষা শুরু করব ঠিক করলাম। আমরা ছাড়া আর কেউ যেন কিছু জানতে না পারে, এ-কথা বারবার করে বলে চলে এলাম নিজের ঘরে। সটান গিয়ে শুয়ে পড়লাম বিছানায়।
.
রাত বারোটা বেজে এক মিনিট। অজ্ঞান কবুতরে জেগে আছি শুধু আমরা তিনজন আমি, তরুণ আর সুচরিতা।
পা টিপে টিপে লাইব্রেরিতে ঢুকলাম আমরা। ঘরে জমাট অন্ধকার। আমরা যার-যার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। তরুণ সঙ্গে এনেছে একপাটি নাল লাগানো জুতো। আমার পাঁচ আঙুলে আটকানো একটা নাল ডাস্টার। সারা ঘর অন্ধকার। শুধু তিনটে কাচের জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছিল ভেতরে।
দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছিলাম আমি। আজ হয়তো আমাদের প্রতীক্ষা নিষ্ফল হবে। তবু আশা–। বাঁ হাতের রেডিয়াম ডায়ালে চোখ নামালাম। পৌনে একটা। অদ্ভুত একটা উত্তেজনা উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে সময় কেটে যাচ্ছিল।
এইভাবে কতক্ষণ যে দাঁড়িয়েছিলাম জানি না। হঠাৎই যেন সুরকি-ঢালা পথে কারও সতর্ক পায়ের শব্দ আমার কানে এল। শরীরের সবকটা স্নায়ু যেন নিঃশব্দ চিৎকারে গলা ফাটিয়ে বলতে লাগল, এসেছে। সে এসেছে!
একটু পরেই একটি ছায়ামূর্তিকে দেখা গেল জানলায়। দম বন্ধ করে চরম মুহূর্তের জন্যে অপেক্ষা করে রইলাম। ধীরে-ধীরে জানলা টপকে ঘরের মধ্যে নেমে দাঁড়াল সে। একবার এদিক ওদিক তাকাল। তারপর এক পা এগোতেই আমি কাঁপয়ে পড়লাম তার ওপর।
পরমুহূর্তেই ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিল সুচরিতা। তরুণ এগিয়ে এসে কলার ধরে এক হ্যাঁচকায় তুলে দাঁড় করাল লোকটিকে।
তার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম আমি। একী! এ যে সেই রহস্যময় কালো পোশাক পরা লোকটি।
এগিয়ে গিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, স্যার, নিজের বাড়ি খুঁজতে এসে আপনাকে যে এত বিপদে পড়তে হবে তা বোধহয় ভাবেননি!
লোকটি গম্ভীর মুখে তাকাল আমার দিকে। ইতিমধ্যে লাইব্রেরিতে প্রায় সবাই এসে হাজির হয়েছেন। শ্রী নরসিংহ আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, মিস্টার বোস, হচ্ছে এসব ব্যাপার কী? মাঝরাত্রে যত সব বিড়ম্বনা।
আমি হাসলাম, ওঁকে নকল করে বললাম, বোস নয়, মৈত্র। দেখুন না নিজেই হয়েছে কী। সর্বেশ্বর রায় নামধারী ভদ্রলোক চোরের মতো দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন নৈশ আগন্তুকের দিকে।
সকলের দিকে একপলক দেখে জামাকাপড় ঝেড়ে মুখ খুললেন আমাদের নৈশ অতিথি। আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনাদের সবাইকে জানাই যে, আমার নাম কিষাণ আপ্তে– দ্যাট ইজ, এজেন্ট জেড। সি.বি.আই. থেকে আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছে।
একথায় ঘরের মধ্যে যেন বজ্রপাত হল। বিস্ময়ের অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল সবাইয়ের মুখ দিয়ে।
চারিদিকে চোখ বুলিয়ে মিস্টার আপ্তে বলে চললেন, আমি এখানে এসেছি সমর বর্মনকে গ্রেপ্তার করার জন্যে। নামটা আপনাদের সকলের কাছেই বোধহয় পরিচিত। আমি দুঃখের সঙ্গে জানাতে বাধ্য হচ্ছি যে, কবুতরে যে কজন হাজির আছেন, তাদের মধ্যে একজন অবশ্যই সমর বর্মন। বর্মনের ছদ্মবেশ ধরার ক্ষমতা অবিশ্বাস্য। সে আমার ছদ্মবেশ ধরে হাজির হয়েও আপনাদের ধোঁকা দিতে পারে। এই আশ্চর্য চোর এবং ব্ল্যাকমেলারটিকে ধরা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু এখন যেহেতু সে কবুতরে আছে, তাই আমাদের কাজ একটু সহজ হয়ে পড়েছে।
সমর বর্মন কবুতরে এসেছে সম্ভবত হীরের নেকলেসের জন্যে। গতবছর সিরাজনগরের মন্ত্রী সুরেন্দ্র পালিত একটা মিটিং-এ কবুতরে এসেছিলেন। আমরা খবর পেয়েছি যে, তিনি একটা দামি নেকলেস এখানে লুকিয়ে রেখে যান। সেটার খবর বর্মন জেলে বসেই পায়। আমরা আন্দাজ করেছিলাম যে, ওটা হাতানোর জন্যে সে, কবুতরে আসবেই। তাই এতদিন আমি ছদ্ম পরিচয়ে কবুতরের আশেপাশে ঘুরেছি বলে আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসলেন তিনি। তারপর সুচরিতার দিকে ফিরে বললেন, ম্যাডাম, গত রাতেও আমি এসেছিলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল এই লাইব্রেরিতে লুকিয়ে রাখা হীরের নেকলেসটা উদ্ধার করা। আমি চাইনি যে, সবাই এই ব্যাপারটা জানুক। যা হোক, আগামীকাল আমি ইন্সপেক্টর ক্রসবির সঙ্গে দেখা করছি। এবার আমি বর্মনকে ধরবই। সে আমার চোখকে ফাঁকি দিয়ে পালাতে পারবে না। তার চোখ জ্বলে উঠেই নিভে গেল।
