কী! চোর! তরুণের ঘুমের ঘোর তখনও কাটেনি।
আস্তে, ফিসফিস করে বলল সুচরিতা, তুমি রেডি হয়ে নাও–আমরা দুজনে ঢুকব ও-ঘরে।
দাঁড়াও। বলে ঘরের কোনা থেকে একপাটি লোহার নাল লাগানো জুতো তুলে নিল তরুণ। বলল, চলো, এই জুতোর এক ঘা খেলে চোরবাবাজিকে আর উঠে দাঁড়াতে হবে না।
নিঃসাড়ে চুপিচুপি ওরা দুজনে এসে দাঁড়াল লাইব্রেরির সামনে।
ভেতরে কজন আছে? ফিসফিস করে জিগ্যেস করল তরুণ।
কে জানে! বোধহয় দু-তিনজন! অবহেলাভরে মৃদুকণ্ঠে জবাব দিল সুচরিতা।
আমি ঘরে ঢোকার সঙ্গে-সঙ্গে তুমি ভেতরে ঢুকে আলোর সুইচটা অন করে দেবে। বলে জুতোটাকে বাগিয়ে ধরে এক ঝটকায় দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল তরুণ।
ভেতরে টর্চের আলো তখনও দেওয়ালের গায়ে ঘুরছিল। দরজা খোলার শব্দে টর্চধারী লোকটি সচকিত হওয়ার আগেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তরুণ। ওদের দুজনের ঝাঁপটিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সুচরিতা–ওই অন্ধকারেই। ঠিক ওই সময়ই কে যেন মনে হল ওর পাশ কাটিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল। আর কিছু ভাববার আগেই তরুণের চিৎকার ভেসে এল : সুচরিতা, আলোটা জ্বালাও শিগগিরই
সুচরিতা সুইচের দিকে পা বাড়াতেই দেখা গেল একটি ছায়ামূর্তি এক ছুটে লাইব্রেরির খোলা ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে লাফিয়ে সুরকি ঢালা রাস্তা দিয়ে দৌড়ে পালাল।
এই দেখে আর আলো না জ্বালিয়ে লোকটির পিছন পিছন ধাওয়া করে বাইরে বেরিয়ে এল সুচরিতা।
দৌড়ে যখন ও কবুতরের গেটে পৌঁছেছে, ঠিক সেই সময় ওর সঙ্গে একজনের ধাক্কা লাগল।
লোকটি পালিয়েছে। গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল কারও।
চোখ তুলে তাকাল সুচরিতা। ওর সামনে টেরিন-টি-শার্ট আর ফুলপ্যান্ট পরে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি শ্রীকিরণ শর্মা।
দারুণ অবাক হয়ে গেল সুচরিতা। এই রাতেও টিপটপ ড্রেস পরে দাঁড়িয়ে আছেন শর্মাসাহেব!
লোকটি পালিয়েছে, মিসেস চৌধুরী, আর ফলো করে লাভ নেই। দ্বিতীয়বার বললেন তিনি।
ও–।
একটা কথা ভাবছিল সুচরিতা। সত্যি যদি তাই হয়! হয়তো অসম্ভব কল্পনা, কিন্তু অসম্ভবও তো সময়ে-সময়ে সম্ভব হয়।
চলুন, শর্মাসাব, কবুতরে ফিরে যাওয়া যাক, বলে দুজনে ফিরে চলল কবুতরের দিকে।
বাড়ির সবাই তখন লাইব্রেরি-ঘরে এসে ভিড় করেছেন–একমাত্র নয়না কল্যাণী ছাড়া। ওঁর নাকি অনিদ্রা রোগ আছে। তাই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোন। বাড়ির ছাদ ভেঙে পড়লেও ঘুম নাকি ওঁর ভাঙে না–মানেকজি জানালেন।
তরুণের কপালে একদিকটায় ছড়ে গেছে। সবাইয়ের ননস্টপ প্রশ্নের উত্তরে সবই খুলে বলল ওরা। কিন্তু কারা, কেন এসেছিল, কিছুই জানা গেল না।
অবসন্ন মনে নিজের ঘরে ফিরে চলল সুচরিতা। লোকটা ঘরের দেওয়ালে আলো ফেলে কী দেখছিল? ইস, কাঞ্চন থাকলে কত ভালো হত!
কবুতরের রহস্য কি এখনও শেষ হয়নি? কে জানে, এরপর কবুতরে কোন অধ্যায় অভিনীত হবে!
.
পরদিন সকালেই ফিরে এলাম আমি। আমাকে দেখেই প্রথমে সুচরিতার মুখে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। ছুটে এগিয়ে এল আমার কাছে। ওর চোখে আতঙ্ক-বিহ্বল দৃষ্টি।
আমি ওকে আশ্বাস দেওয়ার জন্যে কাছে টেনে নিলাম। ওর কানে কানে প্রায় ফিসফিস করে বললাম, কী হয়েছে, সু, কী হয়েছে?
আমার ভয় করছে ভীষণ ভয় করছে। কাঁপা কাঁপা স্বরে জবাব দিল সুচরিতা।
আরে ভয় কী– থেমে-থেমে বললাম আমি, আমি থাকতে তোমার গায়ে যে হাত দেবে তার গায়ের ছাল ছাড়িয়ে নেব। কী হয়েছে?
শেষ দিকে আমার গলা পালটাতে দেখে ও একটু ঘাবড়ে গেল। তারপর ধীরে-ধীরে বলল সব। কীভাবে রাতে চোর ঢুকেছিল লাইব্রেরিতে, তারপর তাড়া করতে গিয়ে কিরণ শর্মার সঙ্গে ধাক্কা ইত্যাদি ইত্যাদি।
সব শোনার পর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম আমি। তারপর বললাম, সু, তোমার পাশ দিয়ে অন্ধকারেই যে কেউ বেরিয়ে গিয়েছিল এ-ব্যাপারে তুমি কি শিয়োর?
তাই তো মনে হয়েছিল আমার…।
হুঁ–। তার মানে বাইরের কারও সঙ্গে ভেতরের কেউ হাত মিলিয়েছে। একটু চিন্তা করে বললাম আমি।
তক্ষুনি সুচরিতা এমন একটা কথা বলল যে, আমি সাঙ্ঘাতিকভাবে চমকে উঠলাম। ও বলল, বাইরের লোক হওয়ার কী দরকার? ভেতরের দুজন হলেও বা আপত্তি কিসের! যদি কিরণ শর্মাই সেই বাইরের লোক হয়?
কিন্তু, এ কী করে সম্ভব!
তুমি না একটা আস্ত বোকা! তোমাকে বললাম না, কিরণ শর্মা একদম ড্রেন্ড-আপ হয়ে ছিলেন। মনে করো কিরণ শর্মা জানলা দিয়ে লাফিয়ে দৌড়লেন। আমি তাড়া করলাম। ধরতে পারলাম না, কিন্তু একটু পরেই তো কবুতরে ওঁর অ্যাবসেন্স ধরা পড়বে, তখন! তাই দৌড়ে কবুতরের গেট পার হয়েই তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। আমার সঙ্গে ধাক্কা লাগল। বললেন যে, লোকটি পালিয়েছে। খুশি-খুশি মুখে চুপ করল সুচরিতা।
জিনিয়াস! সু, তুমি একটা জিনিয়াস। উচ্ছ্বাসে বললাম আমি। কিন্তু পরমুহূর্তেই গলার স্বর খাদে নামিয়ে যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, কিন্তু তোমার পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে কে বেরিয়ে গিয়েছিল?
কী জানি, আমি বুঝতে পারিনি। তবে কী যেন একটা মনে করেও করতে পারছি না…।
কী? কী কথা? আমি জানতে চাইলাম।
ঠিক মনে করতে পারছি না। হয়তো পরে মনে পড়বে।
এইবার আমি মনে-মনে একটা প্ল্যান ছকে ফেললাম। প্রশ্ন করলাম সুকে, আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় যে, যারা এসেছিল, তারা তাদের কাজ গুছিয়ে নিতে পেরেছে?
