ঠিক তখনই আমার মাথায় এল ব্যাপারটা। এই লোকটাই সেই লোকটা নয় তো! নিশ্চয়ই, কোনও সন্দেহই নেই! লোকটার চেহারা মনে করার চেষ্টা করলাম। চোখে সবুজ সানগ্লাস, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, সরু গোঁফ, কপালে বলিরেখা।
চিন্তার জাল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে আবার হাঁটতে শুরু করলাম, কবুতরের দিকে।
সুচরিতাকে বললাম, সু, আজ রাতে আমি বোধহয় কবুতরে থাকতে পারব না।
কেন, কেন? অত্যন্ত ব্যগ্র হয়ে উঠল সুচরিতা।
আমি হাসলাম। সুচরিতা এতই চঞ্চল হয়ে উঠল যে, হাসি চাপতে পারলাম না।
কেন, আবার হাসির কী হল? অবাক হয়ে বলল সুচরিতা।
কিছু না। আমি একবার হোটেল কন্টিনেন্টালে যাব। খোঁজ নেব যে, ইব্রাহিমের সঙ্গে কেউ ওখানে দেখা করতে যেত কি না…।
ও, তা বেশ তো। গম্ভীর গলায় বলল সুচরিতা।
প্লিজ সু, বোঝার চেষ্টা করো। কোনও ভয় নেই। আজ রাতে আর কোনও বিপজ্জনক ঘটনা ঘটবে না–তুমি শুধু-শুধু চিন্তা করছ। তা ছাড়া ইব্রাহিমের ব্যাপারটার একটা খোঁজ নেওয়া দরকার।
একটু থেমে সুচরিতা বলল, কাল কখন ফিরবে?
সকালেই। জোর দিয়ে বললাম আমি।
কবুতরের বাইরের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছিলাম। সুচরিতা কবুতরের বিপরীত দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিল, তাই আমিই লক্ষ করলাম ব্যাপারটা।
দেখলাম, কিরণ শর্মা উত্তেজিতভাবে ক্রসওয়ার্ডকে কী যেন বোঝাচ্ছেন, আর ক্রসওয়ার্ড চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ছেন।
একটু পরে ক্রসওয়ার্ড একাই এগিয়ে এলেন আমাদের দিকে, বললেন, মিস্টার মৈত্র, আমি আপনার সঙ্গে একটু গোপনে আলোচনা করতে চাই।
সঙ্গে-সঙ্গে সুচরিতার মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠল।
আমি ওর দিকে ফিরে হেসে অভয় দিলাম, বললাম, কোনও ভয় নেই, সু, তুমি যাও।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও চলে গেল ও।
মিস্টার মৈত্র, ক্রসওয়ার্ডের কাঠ-খোদাই মুখে কোনও অভিব্যক্তি লক্ষ করা গেল না, আমরা একটা ডেডবডি পেয়েছি। তার পরিচয়ও আমরা জেনেছি। হোটেল কন্টিনেন্টালের বেয়ারা ছিল সে। হোটেলের ম্যানেজারও আমাদের আপনার সেই চিঠি চুরি করার কথা বলেছে। সবই ঠিক আছে, শুধু একটা ব্যাপারে একটু খটকা দেখা দিয়েছে। যেখানে বডিটা পাওয়া গেছে, সেখানকার জনাদুয়েক লোক বলেছে যে, সে-রাতে তারা নাকি ভারি অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ করেছিল। ওরা ড্রিঙ্ক করে ফিরছিল বলে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি…ভেবেছে দেখার ভুল। অর্থপূর্ণভাবে কথা শেষ করলেন ইন্সপেক্টর।
কী, কী দেখেছিল ওরা? আমি জানতে চাইলাম।
আপনাকে একটা গাছ থেকে নামতে দেখেছিল। আমি ওদের আপনার ফটো দেখাতেই ওরা আইডেন্টিফাই করেছে। এরপর সেই গাছে উঠে আমরা এটা পেয়েছি। বলে পকেট থেকে ব্রাউন পেপারে মোড়া ছুরিটা বের করলেন তিনি।
এরপর চুপ করে থাকার মানে হয় না। তাই সব খুলে বললাম ওঁকে। মৃতদেহ গুম করার কারণটাও খুলে বললাম। জানি না তিনি বিশ্বাস করলেন কি না। আমার বলা শেষ হলে ক্রসওয়ার্ড শুধু মুখ দিয়ে একটা শব্দ করলেন, হু–।
তারপর একটু থেমে দ্বিধাগ্রস্তভাবে আমি বললাম, ইন্সপেক্টর, আমাকে আজ রাতে একটা জায়গায় যেতে হবে। কাল দুপুরের মধ্যেই ফিরে আসব।
যাবেন যান, কিন্তু একটা কথা জেনে রাখুন, দিল্লি পুলিশের ডিকশনারিতে ইমপসিব বলে কোনও শব্দ নেই– বলে হনহন করে এগিয়ে গেলেন ক্রসওয়ার্ড।
ওঁর দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বললাম, মিস্টার ক্রসওয়ার্ড, তুমি যদি জানতে, আমি কে, তবে–।
কাঞ্চনবাবু, সুচরিতা চৌধুরী কিন্তু কবুতরে থেকে গেলেন। আপনি তো যাওয়ার আগে বললেন, আজ রাতে কবুতরে আর কিছু হবে না। কিন্তু শুনুন– হা আজ রাতেই একটা ব্যাপার হবে। সম্ভবত মাঝরাতে– সুচরিতাদেবী বিপদে পড়তে পারেন। তবু আপনি যাবেন? থেকে গেলে পারতেন কিন্তু। যাকগে, নিয়তিকে তো আর কেউ রুখতে পারে না! ভীষণ কান্ড হবে একটা সত্যি বলছি সাঙ্ঘাতিক কিছু একটা হবে!
এ রহস্যের শেষ কোথায়? নিজের ঘরে শুয়ে-শুয়ে এ কথা ভাবছিল সুচরিতা। রাত প্রায় দেড়টা। আশ্চর্য! কুমার রণজিৎ খুন হওয়ার রাতে গুলির শব্দ কেউ শুনল না কেন! তবে কি রাতে ওরা যে-ড্রিঙ্কস নিয়েছিল তাতেই কোনও স্লিপিং ড্রাগ মেশানো ছিল। কিন্তু কে মেশাল! হঠাৎ…।
ঠিক সেই মুহূর্তে সুচরিতার কোষে-কোষে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হল। পায়ের শব্দ না! অন্ধকারেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল ও। কোনদিক থেকে শব্দটা আসছে ঠাহর করতে পারল না। তাড়াতাড়ি পা টিপে টিপে ঘর ছেড়ে করিডরে বেরিয়ে এল। করিডর নিঝুম নিস্তব্ধ। কেউ কোথাও নেই।
আবার শব্দ হল একটা। নিশ্চয়ই নীচের লাইব্রেরি-ঘরে। কেউ তা হলে আছে নাকি ওখানে?
পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নেমে লাইব্রেরির সামনে এসে দাঁড়াল সুচরিতা। ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। এগিয়ে এসে চাবির ফুটোয় চোখ রাখল। এ কী!
লাইব্রেরি-ঘরের গভীর অন্ধকারে শুধু একটা টর্চলাইটের আলো ঘুরে-ফিরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ পাশ থেকে কেউ একজন সরে দাঁড়ানোয় চাবির ফুটো দিয়ে আর কিছু দেখা গেল না।
তবে কি লাইব্রেরি-ঘরে চোর ঢুকেছে? কিন্তু ওর পক্ষে তো একা কিছু করা সম্ভব নয়। চিন্তা করে দেখা গেল সাহায্য করার মতো একজনই আছে কবুতরে। সে তরুণ সান্যাল।
অতএব সিঁড়ি দিয়ে উঠে তরুণের ঘরের কাছে এসে দরজায় টোকা দিল সুচরিতা।
তরুণ–।
একটু পরে ঘুম চোখে এসে দরজা খুলল তরুণ সান্যাল। চেঁচিয়ে কী বলতে যাচ্ছিল। ওর মুখে হাত চাপা দিয়ে সুচরিতা বলে উঠল, শ স্। চুপ! নীচের লাইব্রেরিতে মনে হয় চোর ঢুকেছে।
