একটা সম্ভাবনার কথা মনে হওয়ায় আমি বললাম, ইন্সপেক্টর, হয়তো মার্ডারার কোনও কেমিক্যাল দিয়ে রাতে সবাইকে ড্রাগ করেছিল।
হতে পারে, বললেন ক্রসওয়ার্ড, আমি এবার বাড়ির সবাইকে ডেকে একটা রিকোয়েস্ট করতে চাই। তা হল, কেউ যেন আপাতত, অন্তত দিনসাতেকের জন্যে, কবুতর ছেড়ে কোথাও না যান।
ঠিক আছে, আমি সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছি কথাটা। মনে হয় কেউ এতে অরাজি হবেন না। বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মানেকজি। বললেন, ওয়াডি, যেমন করে হোক এই পলিটিক্যাল স্ক্যান্ডালের শেষ চাই আমি। কারণ, ভুরু তুলে তাকালেন মানেকজি ও ..এর সঙ্গে আমার আর প্রসাদজির মানসম্মান জড়িয়ে আছে। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন মানেকজি।
মানেকজি চলে যাওয়ার পর আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ইন্সপেক্টর, আমি আজ কবুতর ছেড়ে যেতে চাই। কথা দিচ্ছি, কাল বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসব।
ক্রসওয়ার্ড হাসলেন : যাবেন যান। কিন্তু মাইন্ড ওয়ান থিং–আমাদের যেন বডি ওয়ারেন্ট বের করতে না হয়।
উত্তরে আমি স্যালুট করার ভঙ্গি করে সুচরিতার হাত ধরে বললাম, এসো, সুচরিতা।
বাইরে এসে বললাম, সু, আমি এখন সাইরেন ইন্টারন্যাশনালে যাব। নয়না কল্যাণী সম্পর্কে খোঁজ নিতে। কাল আবার দেখা হবে। তুমি কিরণ শর্মার ওপর নজর রেখ। আমার জন্যে ভেব না। আর হ্যাঁ–তোমার গাড়িটা আমি নিয়ে যাচ্ছি।
আর দেরি না করে সুচরিতার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ি চড়ে রওনা দিলাম। উদ্দেশ্য, সাইরেন ইন্টারন্যাশনাল।
গাড়িতে যেতে-যেতে ভাবছিলাম। আলোটা জ্বলেছিল কার ঘরে? কিরণ শর্মা না নয়না কল্যাণী? কী করছিলেন তিনি ওই সময়? গুলির শব্দ শুনে কি ঘুম ভেঙেছিল ওঁর? কিন্তু আর কারও ঘুম ভাঙল না কেন? আর নয়না কল্যাণীর যদি কোনও গোপন ব্যাপার থাকে, তবে আমি নিশ্চিত যে, সাইরেন ইন্টারন্যাশনালে গিয়ে শুনব নয়না কল্যাণী নামে কেউই ওখানে কাজ করত না। দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়!
.
শেষ পর্যন্ত সাইরেন ইন্টারন্যাশনালে।
রিসেপশনের ঘুমে ঢুলে পড়া হ্যাংলা মেয়েটিকে বললাম, ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
একটু পরেই একটি লোক এসে আমাকে নিয়ে গেল ম্যানেজারের ঘরে। ঘরের দরজায় লেখা প্রাইভেট।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম।
চেয়ারে বসে একজন প্রৌঢ়। মাথাজোড়া টাক। পাইপ টানছেন। তাকে বললাম, আমি নয়না নামে একটি মেয়ের খোঁজ জানতে এসেছি। সে আপনার হোটেলে কাজ করত।
হ্যাঁ, রিসেন্টলি ও চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। কোথায় ওর এক কীরকম ভাই না কে থাকে, তার কাছে যাবে বলছিল।
জবাব শুনে একেবারেই দমে গেলাম আমি। এরকমটা ঠিক আশা করিনি। তা হলে কি কিরণ শর্মা…?
থ্যাংক ইউ, ম্যানেজারসাহেব, বলে নড় করে বেরিয়ে এলাম আমি। তার মানে নয়না কল্যাণী মানেকজির সত্যিকারের রিলেটিভ!
হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে এসে গাড়ি স্টার্ট করলাম। সুচরিতাকে সব খুলে বলতে হবে। একবার ভালো করে আলোচনা করা দরকার। ঘড়ি দেখলাম, রাত তিনটে।
কবুতরে পৌঁছেই দেখি সুচরিতা গেটের বাইরে উৎকণ্ঠিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থামিয়ে বাইরে বেরোতেই দৌড়ে এল ও। বলল, কাঞ্চন, সর্বনাশ হয়েছে! বলে ও আমাকে হাত ধরে নিরিবিলি গাছ-গাছালির দিকটায় টেনে নিয়ে চলল। ভোরের হালকা আলো তখন ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীতে।
কিছুদূর গিয়ে আমি বললাম, কী হয়েছে?
হাঁফাতে-হাঁফাতে বলতে শুরু করল সুচরিতা, ইব্রাহিমকে খুঁজে পেয়েছে ওরা!
তাই নাকি? মুখে একথা বললেও মনে-মনে রেলগাড়ি ছুটিয়ে চিন্তা করছিলাম, এরপর কী করা উচিত।
হ্যাঁ, ইন্সপেক্টর ক্রসবি খোঁজ করেছিলেন যে, তুমি এসেছ কি না, বলে চলল সুচরিতা, আর কিরণ শর্মাকে দেখলাম লাইব্রেরি-ঘরের বইপত্তর ঘেঁটে-ঘেঁটে দেখছেন। আমি ঢুকতেই মৃদু কাষ্ঠহাসি হেসে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
হঠাৎ যেন সংবিৎ ফিরে পেল সুচরিতা, বলল, ওহ্ হো, আমি তো জিগ্যেস করতেই ভুলে গেছি। ওদিকের খবর কী?
বিষণ্ণ হাসি হেসে বললাম, শিকে ছেড়েনি। একদম বাজে খবর। নয়না কল্যাণী সত্যি কথাই বলেছেন, সাইরেনেই কাজ করতেন উনি। এখন আমার মনে হচ্ছে যে, সে-রাতে আলো বোধহয় কিরণ শর্মার ঘরে জ্বলছিল। কথা বলতে বলতেই একটা দেবদারু গাছের দিকে চোখ গেল আমার। তখনই দেখলাম গাছের গুঁড়ির ওদিক থেকে কারও জামার একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই সেই লোকটা।
পা টিপে টিপে এগোলাম। সুচরিতা কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকাল আমার দিকে। আমি মুখে আঙুল তুলে ওকে ইশারায় জানালাম চুপ করে থাকতে। তারপর গিয়ে আচমকা গাছের ওপিঠে হাজির হলাম।
গাছের আড়ালে যে লোকটি নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়েছিল, সে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। হাসবার চেষ্টা করল।
আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারছি না, ঠান্ডা স্বরে বললাম আমি, দয়া করে নিজের পরিচয়টা যদি দেন…।
আমি–আমি এখানে নতুন এসেছি, কর্কশ স্বরে থেমে-থেমে সে বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না কোন দিকে পড়বে বাড়িটা…।
আমি সুচরিতার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালাম। তারপর লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বললাম, আসুন আমার সঙ্গে। কোথায় বাড়ি আপনার?
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল লোকটি। তারপর বলল, ওই দিকটায়– বলে একটা দিক দেখাল সে।
আমি তার এই এলোমেলো কথায় ক্রমশ অবাক হচ্ছিলাম। হয়তো কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু হঠাৎ লোকটি থ্যাংক ইউ অ্যান্ড গুড বাই বলে হনহন করে হেঁটে অদৃশ্য হয়ে গেল।
